কর্মবান্ধব প্রবৃদ্ধি বনাম কর্মসংস্থান

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৪:২৪

বিগত এক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি একই অঙ্কের কাছাকাছি থাকলেও সেই অনুপাতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। মূলত দেশে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও ব্যক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যর্থতা, অকৃষি খাতে অধিক প্রাধান্য না দেওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দুরবস্থা, দেশে বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে অপ্রতুলতা, বিনিয়োগের বিপরীতে অধিক ঝুঁকির আশঙ্কা, অতিমাত্রায় ব্যাংক সুদ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রায় সকলপ্রকার কাজে অধিক দলীয়করণ, দুর্নীতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জায়গা ও অবকাঠামোগত সমস্যাসহ আর্থিক বিশৃঙ্খলতার কারণে আমাদের দেশে বিনিয়োগ দিন দিন কমতে শুরু করেছে। ফলে ক্রমাগত হারে সঙ্কুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থান। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে অধিক ঝুঁকি থাকায় তা ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হচ্ছে। এতে বৈদেশিক সাহায্য ও বিদেশি বিনিয়োগ কমে আসছে। ফলে প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় দেশে বাড়ছে মানব পাচারের মতো নিকৃষ্ট ঘটনা। ক্ষুধা ও অনাহারি মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জোরজুলুম, মাদক বিক্রি, পতিতা-ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। এটি বর্তমান সরকারের ঘোষিত আগামী ভিশন রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায় বলে মনে করি।

আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের বড় একটি জায়গা দখল করে আছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও বেসরকারি খাত। যদিও এই খাত সব সময় অনিশ্চিত কর্মস্থল, নিম্নমানের আয় ও নানা রকম ঝুঁকিতে পূর্ণ থাকে, তারপরও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উক্ত খাতটি বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বেসরকারি খাতের প্রতি সংশ্লিষ্টদের চরম উদাসীনতা, দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের প্রতি অধিক বৈষম্য, বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে চাহিদানুযায়ী ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, ঋণের বিপরীতে দুই অঙ্কের সুদ, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও জায়গার স্বল্পতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্য, আমদানি-রপ্তানি নীতিতে অধিক বৈষম্য, ঘুষ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং অবকাঠামোগত দুবর্লতাসহ নানাবিদ কারণে প্রতিনিয়ত বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে কমে যাচ্ছে বিনিয়োগ। এছাড়াও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনের প্রতি অধিক আস্থাহীনতা, ভয়ভীতিসহ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ইত্যাদি নানাবিদ কারণেও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তথা বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে প্রয়োজনীয় শিল্পকারাখানা গড়ে না ওঠার কারণে দেশে চাহিদানুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটা বড় অংশই এখন বেকার। পড়াশোনা শেষ করে বছরের পর বছর চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের জন্য শ্রমবাজার আরো কঠিন হয়েছে। ‘দ্য গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ট্রেন্ডস ফর ইয়ুথ’ বা ‘বিশ্ব জুড়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রবণতা ২০২২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে আইএলও বলেছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশি তরুণদের বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, যদিও জাতীয় পর্যায়ের বেকারত্বের হার মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় তরুণদের বেকারত্ব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সম্প্রতি একশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে যুবগোষ্ঠীর বড় অংশ আর্থসামাজিক ঝুঁকির মধ্যে আছে। বৈষম্য আর গুণগত শিক্ষার অভাবে ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, পড়াশোনা করে তারা চাকরি পাবেন না, গরিব শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৯০ শতাংশ। চাকরি, পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণে নেই ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ।

এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে দেশে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সময় থাকতেই সংশ্লিষ্টদের কার্যকরী পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করতে হবে। সরকারের ঘোষিত রূপকল্প বাস্তবায়নে দেশে অপারসম্ভাবনার বিশাল মানবসম্পদকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের উপযুক্ত কাজে লাগাতে হবে। বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রদানে নানামুখী জটিলতা ও সুদের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রতি এখন এদেশের বিনিয়োগকারীরা অধিক ঝুঁকছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি খাতে দ্রুত গতিতে বাড়ছে বিদেশি ঋণ। এতে ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ বিরাট অঙ্কের টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। যা দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য অশুভ বলে মনে করি। অনেক বিনিয়োগকারী দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ায় তারা বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করছে। ফলে দেশে বিনিয়োগের বিপরীতে অধিক পরিমাণ টাকা বিদেশের মাটিতে প্রেরণ করা হচ্ছে। ফলে দেশে অর্থ বিনিয়োগ না করায়  দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও জনগণ কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৃষ্টি হলেও তা দেশ ও জাতির কল্যাণে তেমন কাজে আসছে না, যা দুঃখজনক।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঝুঁকির কারণে ব্যক্তি খাতে এখন অনেক বিনিয়োগকারী দেশে শিল্পকারখানা তৈরির বিপরীতে জমি ক্রয়, স্বর্ণ ও সুদের ব্যবসায় অধিক মনোনিবেশ করছে। দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প ঘিরে চলছে নানামুখী সংকট এবং দেশীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। যা দেশে কর্মবান্ধব প্রবৃদ্ধি অর্জন তথা অধিক কর্মসংস্থান তৈরির পথকে করছে বাধাগ্রস্ত। যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামোগত সকলপ্রকার সুযোগ-সুবিধাসহ উল্লেখিত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তবে দেশে যেমন বিনিয়োগ বাড়বে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দারিদ্র্য দূর হবে, ভোগ ব্যয় বাড়বে এবং পূর্ণবিনিয়োগ হবে, যা ইতিবাচক বলে মনে করি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক প্রধান, পিআরডি, বিইউএফটি

 

ইত্তেফাক/ইআ