আসুন, গুজব ছড়াই

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২২, ০৫:১৮

গুজব জিনিসটা অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশ মুখরোচক। বিশেষ করে বাঙালি আবার গুজবপ্রিয়। চানাচুরের মতো কুড়মুড়িয়ে গুজব খায়। অন্যের দিকে একমুঠো এগিয়ে দিতেও কার্পণ্য করে না। এখনো মাঝেমধ্যে কোথাও না কোথাও আশ্চর্য কেরামতি জানা পাগল-ফকির-দরবেশ বাবার ‘আবির্ভাব’ ঘটে। লোক কাতারে কাতারে ছুটে যায়। পথে মেলা বসে। সেলামির ভাণ্ড উপচে পড়ে।

আমাদের দেশকে আগে বলা হতো হুজুগের দেশ। এখন সেটা বিবর্তিত হয়ে গুজবের দেশে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু তৈরির সময় গুজব রটে যে, পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করতে ১ হাজার বাচ্চার মাথা লাগবে। এই গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর ‘পদ্মা সেতুর জন্য কোনো বাচ্চার মাথা লাগবে না’—এই মর্মে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে বিবৃতি দিতে হয়। এই গুজবের ভিত্তিতে অপরিচিত লোক বাড়ির কাছে ঘুরঘুর করতে দেখলে পদ্মা সেতুর আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজিত জনতা মাথা সংগ্রহকারী ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে অন্তত ১০ জনকে পিটিয়ে হত্যা এবং ২২ জনকে আহত করে।

যমুনা সেতু নির্মাণের সময়ও গুজব ছিল যে, মানুষের মাথা লাগবে। নরবলি দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জামায়াত নেতা সাঈদীকে দণ্ড দেওয়ার পরও গুজব রটানো হয় যে, তাকে চাঁদে দেখা গেছে। এই নিয়ে দেশব্যাপী তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। 

গুজবের সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। সম্ক্রতি নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের মুখে গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে, ব্যাংকের কাছে কোনো নগদ টাকা নেই। এ অবস্থায় অচিরেই সব ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে। যার যেটুকু সঞ্চয় আছে, তা দ্রুত তুলে নেওয়া উচিত। না হলে সব টাকা গায়েব হয়ে যাবে। আমছালা সব যাবে। এই গুজবের ঢেউ এতটাই প্রবল যে, বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন যে, দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা তারল্য রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতেও কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আমানতের টাকা নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যদি কোনো ব্যাংক আমানতের টাকা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গুজব হিমবাহের মতো। তার শুরুটা হয় সাধারণভাবে। তার পরে ক্রমে তা শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে যেতে থাকে। সুপারসনিক বিমানের চেয়েও দ্রুত গতিতে সে এগিয়ে যায়। আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী রবার্ট হ্যাম্কডেন ন্যাপ গুজব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি জানান, গুজব ব্যবহার করে মানুষের ভাবাবেগকেই। সমাজের ভাবাবেগকে প্রকাশ ও তুষ্ট করার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে গুজবের। তিনি গুজবকে প্রধানত, তিন ভাগে ভাগ করেন। প্রথমত, অবাস্তব স্বপ্নপূরণের গুজব। যেমন :দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের দেশগুলিতে গুজব রটেছিল যে, জাপান বেশি দিন যুদ্ধ করতে পারবে না। কারণ, তাদের তেলের সঞ্চয় ছয় মাসেই শেষ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, ভীতিসঞ্চারি গুজব। যেমন, ছেলেধরার গুজব। তৃতীয়ত, বিভেদ সৃষ্টিকারী গুজব। আমাদের দেশে এমন গুজব প্রায়ই রটে, যা সম্ক্রদায় বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। গুজব সমাজের শান্তি-স্থিতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ার গুজব যদি এখনই ঠেকানো না যায়, তাহলে আর্থিক সংকট আরো চরম আকার ধারণ করতে পারে। 

আমাদের দেশে করোনা কিংবা ডেঙ্গুর চেয়েও ভয়াবহ রোগের নাম হচ্ছে গুজব। এখন এর উত্কৃষ্ট জায়গা হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ‘গুজব’ বায়বীয়। শোনা যায়, দেখা যায় না। গুজবকে ভিত্তি দেয় একদল মানুষ। যারা স্বাভাবিক উপায়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে না, তারাই গুজব রটিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করে। কাউকে জব্দ করতে হবে কিংবা কারো কাছ থেকে কাজটা উদ্ধার করতে হবে, কিন্তু পারছে না। দাও ওর বিরুদ্ধে গুজব রটিয়ে। ভালো কোনো কিছু ভণ্ডুল করতে হবে, দাও ঐ উদ্যোগের নামে গুজব রটিয়ে। এভাবে গুজব রটিয়ে, আগুন ধরিয়ে দিয়ে অনেকেই ‘আলুপোড়া’ খায়। অনেকের এতে সর্বনাশ হয় বটে; কিন্তু স্বার্থান্বেষীরা লাভের আশায় এমন কাজ সুযোগ পেলেই করে! আমাদের সমাজে গুজব এমনই দাওয়াইহীন এক রোগে পরিণত হয়েছে।

‘এই মাত্র আমার পাশের বাসার দুই জনের কান চিলে নিয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত, আপনার কানও চিলে নিয়ে যাবে। এই মেসেজটি এক্ষুনি ভাইরাল করুন।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবগুলোর ধরন অনেকটা এই রকম। এ ধরনের গুজব ছড়ানোর জন্য একশ্রেণির মানুষ যেন সারাক্ষণ তৈরি হয়ে থাকে। আমি পেয়েছি। আপনিও পেয়েছেন। যদি না পেয়ে থাকেন, মুঠোয় ধরা স্মার্টফোনের ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ভাইবার বা হোয়াটসঅ্যাপ খুলে একবার ভালো করে চোখ বোলান। কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই পেয়ে যাবেন তাদের।

মিথ্যে তথ্য দিয়ে, বানানো ছবি-ভিডিও দিয়ে ওরা আপনাকে জানাবে, কোথায়, কোন গলিতে এমন অবাক করা ঘটনা ঘটেছে। কখনো বলবে অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে, কখনো জানাবে কাউকে পিটিয়ে মেরেছে। আপনি জানতে পারবেন, হিংস্রতার সবিস্তার বিবরণ। তারা কী অত্যাচারই না করছে! পিটিয়ে মারছে জোয়ান ছেলেটাকে! মাথা কেটে নিচ্ছে। দরদর করে রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে। আপনার চোখের সামনে ভিডিও ক্লিপিংগুলিতে নড়াচড়া করবে এ ধরনের নৃশংসতার দৃশ্য। দুষ্কর্মকারীদের পোশাক-আশাক, দাড়ি-গোঁফ আপনার কাছে ভীষণ চেনা মনে হবে।

এসব দেখে যদি আপনার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে, রাগে-ক্ষোভে আপনার ভেতর থেকে তেজ বিকীর্ণ হতে থাকে, আপনি উত্তেজিত হয়ে ফেসবুকে গোটাকয়েক স্ট্যাটাস দেন—‘এই অপশক্তিকে এখনই ধ্বংস করা উচিত’, তবেই তাদের ‘ধান্দা’ সফল। ওরা বড়শিতে আপনাকে গেঁথে ফেলেছে। এবার আপনি যদি ক্রোধান্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন, জ্বালাও-পোড়াও করতে পারেন, ভীতি সৃষ্টি করতে পারেন—তবেই ষোলআনা উসুল। আমাদের মনের গভীর অন্ধকারে ওত পেতে থাকা অপশক্তি সেটাই চায়!

আর যদি আপনি তা না পারেন, তবে ঘরে বসেই ঐসব ফেসবুক, মেসেঞ্জারে এ ধরনের ছবি ও লেখা আরো অনেককে শেয়ার করে উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালতে পারেন। হ্যাঁ, এভাবেই চলছে গুজবের আমদানি-রপ্তানি। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত শব্দ এবং ছবির শক্তি বড় ভয়ংকর। পেছনের খেলোয়াড়রা জেনেবুঝেই এই আগুন নিয়ে খেলছেন।

পাশের বিল্ডিংয়ে ছাদ-ঢালাইয়ের কাজ হচ্ছে। সেখান থেকে ইটের একটা টুকরো লেগে একজনের কপাল কেটে গেল, রক্ত চুইয়ে চোখ ভিজে গেল। তার কোনো শুভার্থী হয়তো রুমাল বের করে চোখটা ঢেকে দিয়ে তাকে নিয়ে কোনো একটা হাসপাতাল-ক্লিনিকের উদ্দেশে ছুটলেন। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা উত্সাহী কেউ এই দৃশ্যের একটা ভিডিও করে ছড়িয়ে দিলেন ফেসবুকে, লিখলেন : এইমাত্র আমার চোখের সামনে একজনের চোখ তুলে ফেলা হলো। এমন দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? আসুন, আমরা নিজের চোখ তুলে ফেলি, না হলে সেই বাচ্চার চোখ তুলে ফেলি! ব্যস, কম্ম কাবার! এরপর আপনার দায়িত্ব কেবল এই জিনিসটা শেয়ার করা, ফরোয়ার্ড করা। এক ঘণ্টায় কয়েক হাজার শেয়ার হয়ে যাবে। এর সঙ্গে আপনি যদি অপছন্দের রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে ঐ তথাকথিত চোখ উত্পাটনকারীকে চিহ্নিত করতে পারেন, তাহলে প্রতিপক্ষের লোকেরা মনের সুখে শেয়ার দিয়ে যাবে! এটা ভাইরাল হয়ে যাবে।

গুজব জিনিসটা অবশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশ মুখরোচক। বিশেষ করে বাঙালি আবার গুজবপ্রিয়। চানাচুরের মতো কুড়মুড়িয়ে গুজব খায়। অন্যের দিকে একমুঠো এগিয়ে দিতেও কার্পণ্য করে না। এখনো মাঝেমধ্যে কোথাও না কোথাও আশ্চর্য কেরামতি জানা পাগল-ফকির-দরবেশ বাবার ‘আবির্ভাব’ ঘটে। লোক কাতারে কাতারে ছুটে যায়। পথে মেলা বসে। সেলামির ভাণ্ড উপচে পড়ে।

আগে আমরা জিন-পরি-দেও-দেবতাদের নিয়ে নানা গুজব শুনতাম। ভূতে ধরা, জিনে আছর করা, পেতনি ছুঁয়ে দেওয়া, দেবতা ভর করা—এসব গুজব আমরা বাল্যকালে প্রচুর শুনেছি। গ্রামবাংলায় প্রচলিত এসবের উত্স গুজব হলেও শেষ পর্যন্ত এগুলি সবই বিশ্বাসে পরিণত হয়। যুক্তি, বুদ্ধি, বিজ্ঞান সব সেখানে তুচ্ছ এবং অপ্রাসঙ্গিক। ভক্তি-স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তখন প্রায় অসম্ভব। তবু বলতেই হবে, এসব গুজব আপাতভাবে নির্বিষ। এতে সমাজ-সংসার-দেশ-দশের জীবন বিপন্ন হয় না। অন্য কারো বেঁচে থাকার অধিকারে টান পড়ে না। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা ভয়ানক। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে তা বিষ-ইনজেকশনের মতো আমাদের রক্তে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনার বিরুদ্ধে আমি, আমার বিরুদ্ধে অন্য কেউ লাঠি, কাটারি, ছুরি, বন্দুক উঁচিয়ে তেড়ে যাচ্ছি, যেন খ্যাপা ষাঁড়। কৌশল একই। গুজবকে বিশ্বাসে পরিণত করা।

এখন অবশ্য গুজব সৃষ্টি করা হয় রাজনৈতিক মতলব থেকে। কেউ কেউ সত্যিকার ঘটনা ঘটিয়ে সেটাকে গুজব বলে চালায়। আবার আরেক দল আছে, যারা ফায়দা হাসিল করার জন্য অপছন্দের ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠীকে বেকায়দায় ফেলার জন্য মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে গুজব ছড়ায়। গুজব আসলে যা নয়, তাকে ‘হয়’ বলে চালানোর নোংরা রাজনীতি। ঘটনাচক্রে সোশ্যাল মিডিয়া সেই চক্রান্তের বাহক। আমাদের শুভবুদ্ধি যেখানে তমসাচ্ছন্ন, চারপাশে মতলববাজদের গোপন কুমন্ত্রণা, সেখানে কে কাকে লাগাম পরাবে?

অতএব আসুন, আমরা ভরসা রাখি গুজবে। যুক্তিবুদ্ধি যাচাই করে দেখার মনটাকে কবর দিয়ে বিশ্বাসে-কুসংস্কারের নর্দমায় ভেসে যাই। গুজবে বিশ্বাস রেখে আমরা তা অকাতরে ছড়িয়ে যাই। গুজবে গুজবে সয়লাব হোক দেশ। এই গুজবের ভিড়ে আসল-নকল হারিয়ে যাক। গুজব ছড়িয়ে, সমস্যাকে সংকটে পরিণত করে ছারখার করে ফেলি দেশ! ভালো কিছু না হোক, দেশের জন্য আমরা খারাপটা তো অন্তত আমরা অনায়াসেই করতে পারি!

লেখক : রম্যরচয়িতা

 

 

ইত্তেফাক/ইআ