সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাঙালির উৎসব হেমন্তের নতুন ধান

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৫৩

এখন চলছে হেমন্তকাল (কার্তিক-অগ্রহায়ণ)। যখন দুপুরে রোদের তেজ কমে ধীরপায়ে বিকেলের পথ ধরে সন্ধ্যা নামে, তখন আমাদের শৈশবে গ্রামবাংলায় আমরা দেখেছি উত্তর থেকে ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে আসছে। কাকভোরে এবং বিকেলের পর বাতাসে দেখা যায় হিম হিম ভাব, সন্ধ্যার পরেই একটা নির্জীব ছায়ার মতো রং ঘিরে ফেলে, পাতায় জমা ধুলোর মতো চারপাশটা মলিন ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়, ভেজা একটা কুয়াশার চাদর, প্রকৃতি ও মনকে জড়িয়ে ধরে নিবিড়ভাবে।

প্রকৃতিতে বিষণ্ন সুন্দরের একটি রূপ দৃশ্যমান হয় হেমন্তের শুরুতে, যেন কিছুটা নিবিড় অরণ্যের ভেতর অন্ধকার হয়ে আসা ভালো লাগার একটি পরিবেশ। একসময় মরা কার্তিকে এসে কৃষকের গোলা শূন্য হয়ে যেত, সবাই তখন তাকিয়ে থাকত অগ্রহায়ণের দিকে। তবে যতদিন গেছে, ততই বদলে গেছে হিসাবনিকাশ, কার্তিক আর আগের মতো নেই। এ মাসেও পাওয়া যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ ধান। বস্তুত শস্যের বহুমুখীকরণের ফলে এখন মোটামুটি সারা বছরই ব্যস্ত থাকেন কৃষক আর বিভিন্ন ফসল ফলান তারা, আয়-রোজগারও ভালো। কার্তিক মাসে হূষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে আগাম আমন ধানের শিষ, পাকা ধান কাটা শুরু হয়ে যায়।

নবান্ন উৎসব হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব। একেবারে অনাদিকাল ধরে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে একই রীতি মেনে। এবার ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নাগরিক নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে এবং দিনব্যাপী আয়োজনে লোকায়ত জীবন ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জয়গান করা হয়েছে, যার সঙ্গে আহ্বান জানানো হয় উৎপাদন বাড়ানোর। মঞ্চসজ্জায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে লোকচেতনাকে, সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে গ্রামীণ নানা অনুষঙ্গ, উৎসব মঞ্চ থেকে নাচ-গান-কবিতা ও কথায় নবান্ন-উৎসবের ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। ফসলকেন্দ্রিক অর্থনীতির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, জয়গান করা হয়েছে কৃষকের। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ অথচ ভয়ংকরভাবে আমদানি-নির্ভরতা বেড়েছে, ফসলের জমি নষ্ট করে অট্টালিকা হচ্ছে, দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে উৎপাদন। বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎসব মঞ্চ থেকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আজকের প্রজন্ম আমাদের মৌলিক সংস্কৃতি ও ফসলকেন্দ্রিক উৎসবগুলো সম্পর্কে জানে না। জানানোর দায় থেকেও এবারও নবান্ন-উৎসবের আয়োজন তাৎপর্যপূর্ণ।

বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্যসংকট চলছে। এ অবস্থায় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই এবং উৎপাদন বাড়ানোর দৃঢ়প্রত্যয়ে এবার উদযাপিত হচ্ছে নবান্ন উৎসব ১৪২৯। অগ্রহায়ণ মানেই আমন ধান কাটার মাস, ফলন ও উৎপাদনে আমন বোরোর চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও প্রতি বছর এর উৎপাদন বাড়ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, ২০২০ সালে আমনের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ টন, যা মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ। এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে বিধায় নবান্ন-উৎসব তাই যথারীতি আনন্দঘন হচ্ছে, যা ফলন বাড়িয়ে আনন্দকে আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করা হবে বলেও প্রত্যাশা।

নবান্ন মানে নতুন অন্ন। অর্থাৎ নতুন চালের রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত উৎসবই নবান্ন-উৎসব নামে পরিচিত। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর অন্যতম। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব শুরু হয়। হাজার হাজার বছর আগে কৃষি প্রথা যখন চালু হয়েছিল, অনুমান করা হয়, তখন থেকে নবান্ন-উৎসব উদযাপন হয়ে আসছে। ঘরে ফসল তোলার আনন্দে এ উৎসবের আয়োজন করা হতো, ফসল কাটার আগে কৃষকরা বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালে বেঁধে রাখতেন, বাকি ধান থেকে চাল করে, সে চালে পায়েস করা হতো। এছাড়াও নবান্ন-উৎসবের দিন গৃহস্থবাড়িতে নানা পদ রান্না হতো, যেমন :শাক, ভর্তা, ভাজিসহ কুড়ি থেকে চল্লিশ পদের তরকারি রান্না করা হতো কোনো কোনো বাড়িতে। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, নবান্ন-উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতাও যোগ হয়। হিন্দুরা নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করেন, পার্বণবিধি অনুযায়ী হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়, কে চায় অমন পাপ করতে! অমুসলিম রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন, নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা বিশেষ লৌকিক প্রথা।

রাজধানী শহর ঢাকায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। বেশ ঘটা করে বর্ণিল এ উৎসবের আয়োজন করা হয়, শহুরে শেকড়সন্ধানী সংস্কৃতিকর্মীরা লোক-আঙ্গিকের গান-নাচ ইত্যাদি পরিবেশনের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করেন, চলে খই-মুড়ি-পিঠা-পুলির আয়োজনও। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ নানাভাবে নবান্নের মাস হেমন্তকে কবিতার ফ্রেমে প্রতিবিম্বিত করেছেন এক অনন্য রূপকল্প আর স্বপ্ন ও বাস্তব জগতের বিচিত্র বর্ণের রূপে। কবিতার মাধ্যমে জীবনানন্দ যে ছবি এঁকেছেন সে ছবি বাঙালি হৃদয়ে নবরূপে আবেগ, অনুভূতি এবং আবেদন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। একটি বিষয় ভেবে অবাক হই, গণমানুষের কবি, মানুষে মানুষে বৈষম্য দেখে যিনি কাতর হতেন, সেই কিশোর কবি সুকান্তও হেমন্তের মোহে আবিষ্ট হয়েছিলেন। তার ‘এই নবান্নে’ পড়ে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। আসুন, আমরা সবাই মিলে বাংলার আবহমান সংস্কৃতিকে রক্ষা করে একটি অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ে তুলি, যা হবে বঙ্গবন্ধুর আসল সোনার বাংলা এবং নবান্নের উৎসবে, সেটাই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।

লেখক : গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন