বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এবার সরকার আর্থিক খাতের সংস্কারে মনোযোগী হবে কি?

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০৭:০৬

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৪২ মাসে সাত কিস্তিতে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে বাংলাদেশকে। তার মধ্যে প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে কোনো শর্ত ছাড়া। প্রথম কিস্তির ৪৫ কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ডলার বাংলাদেশ পাবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে পরের কিস্তিগুলো পেতে হলে সংস্থাটির দেওয়া শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। শর্তের মধ্যে অন্যতম আর্থিক খাতের সংস্কার। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক খাত ও রাজস্ব খাত। সম্ভাব্য শর্তগুলো পূরণ না করলে কিস্তির অর্থ দিতে দেরি, এমনকি আটকেও দিতে পারে আইএমএফ। 

আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধীন দল এরই মধ্যে দুই সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক সফর শেষ করেছে। বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে আইএমএফ ইতিবাচক। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করতেও তারা নারাজ। বাংলাদেশের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচিটি সফলভাবে করতে যাচ্ছে বলে আইএমএফ দল খুশি। সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফের দল যা যা পেয়েছে, তা প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরবে ওয়াশিংটনে আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদের কাছে। এর পর বাংলাদেশকে দেওয়া শর্তগুলো সংস্থাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করবে। গত কয়েক দিন বেশ আলোচনা হচ্ছে, সেটা হলো এই ঋণের জন্য অনেক শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। 

আইএমএফ যেসব শর্তের কথা বলেছে, সেগুলো কিন্তু একটাও নতুন নয়। এই প্রত্যেকটা কথা আইএমএফ অনেক দিন ধরেই বলে আসছে। এগুলোকে শর্ত বলা যায় না; পরামর্শ বলা যায়। দেশের ভালোর জন্য, মঙ্গলের জন্যই ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা সংস্কার নিয়ে সচেতন নাগরিক মহলসহ অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞরা নানা ধরনের বুদ্ধি-পরামর্শ, সুপারিশ করলেও সরকার তাতে মোটে ভ্রুক্ষেপ করেনি। কোনোভাবেই গা করেনি। একধরনের অবজ্ঞা, অবহেলা করে এসেছে। নিজের দেশের লোকেরা এত দিন সংস্কারের কথা বলে এলেও সরকার তা কানে নেয়নি। তবে আইএমএফের কথা শুনে এখন সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। ভালো হলো যে, এখন অন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশের জন্য ঋণ অনুমোদন করতে তেমন সমীক্ষা করতে হবে না। কারণ, মৌলিক কাজগুলো আইএমএফ করে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির যে স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে, তা মোকাবিলায় অর্থ দিচ্ছে আইএমএফ। এই অর্থ অপচয় করা যাবে না। করলে ঋণটা বোঝা হয়ে যাবে। আর আর্থিক খাত সংস্কারে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, অন্য সংস্থাগুলোকেও ভূমিকা পালন করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া সংস্কার অসম্ভব। প্রতিটি কিস্তি দেওয়ার আগে আইএমএফের একটি মিশন আসবে ঢাকায়। এটাই তাদের নিয়ম। কিস্তি ছাড়ের আগে সফরে এসে তারা দেখবে শর্তগুলো ঠিকঠাকভাবে পূরণ হচ্ছে কি না। ফিরে গিয়ে আইএমএফের পর্ষদে আবার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে মিশনের পক্ষ থেকে। শর্ত পূরণ না হলে তখন পরের কিস্তির অর্থ আটকেও দিতে পারে আইএমএফ। তাদের শর্ত পূরণ সরকারের জন্য তেমন কঠিন হবে না। কারণ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইন সংশোধনের কিছু কাজ এমনিতেই করা হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের হার যে কম, তা অস্বীকার করার কিছু নেই। আইএমএফ তাগিদ দিচ্ছে রাজস্ব-জিডিপি হার বাড়াতে। সরকার নিজেও তা চায় এবং এজন্য কাজও চলছে। রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় সংসদে যেসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন, এগুলো প্যাকেজ আকারে আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হবে। আইএমএফও সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কারের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে রাখা, রিজার্ভের হিসাবপদ্ধতি সংশোধন করা, বছরে চারবার মুদ্রানীতি করা ইত্যাদি কাজ করতে আপাতত সম্মত হয়েছে সরকার।

আইএমএফ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়া যাবে চার বছরে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে, তার আগে ঐ কিস্তির দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ রিজার্ভ কমে যাবে। রিজার্ভ ভালো অবস্থায় নেই, ক্রমশ কমছে। গত ছয় মাসের প্রবণতা হচ্ছে, প্রতি মাসেই ১০০ কোটি ডলার করে রিজার্ভ কমছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে যদি রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়, তাহলে আমরা সংকটে পড়ে যেতে পারি। তাই ঋণের ওপর পুরো ভরসা না করে বা ঋণ পাওয়া যাচ্ছে বলে স্বস্তিতে না থেকে অপ্রয়োজনীয় কিছু প্রকল্প থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অর্থ আসতে সময় লাগবে। সেই পর্যন্ত রিজার্ভ কমতে দেওয়া যাবে না।

গত বছর আমদানিতে বিশাল প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর বিপরীতে সে হারে রপ্তানি হয়নি। যে কারণে ডলার-সংকটে পড়ে অনেক ব্যাংক এখন এলসির দায় নিষ্পত্তি করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ঢালাওভাবে বিদেশি ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। আইএমএফ তা ধরেই হয়তো হিসাব করেছে ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের সমস্যা হবে না। আবার এলসি কমতে শুরু করেছে। এসব ধরেই আইএমএফ খুব কম শর্ত দিয়ে বাংলাদেশের ঋণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বেশি মূল্য দেখিয়ে এলসি খোলা হয়েছে। যে কারণে তার বিপরীতে বৈদেশিক মদ্রা আয় হচ্ছে না। ডলার সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ এসব। দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে, অর্থ পাচার বন্ধ না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। অনেকেই কর্মসংস্থান হারাবে।

আন্তর্জাতিক মদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পেতে বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে হচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার কাঠামো। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পর্যবেক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে নিজস্ব প্রতিনিধি রাখছে আইএমএফ। ব্যাংক পরিচালনায়ও আসবে পরির্বতন। আর এসব কারণেই ব্যাংক ব্যবস্থাপনার চিত্র পালটাবে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে সংস্কারের কথা অনেক আগে থেকে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদরা। এখন সেটা আইএমএফের শর্তের মধ্যে পড়েছে। তারা বলেছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে, খেলাপি ঋণ কমাতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। তবে দেরিতে হলেও এসব করতে আশ্বাস দিয়েছে সরকার। এটি একটি নতুন সূচনা। আইএমএফ ঋণ পাওয়ায় অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দেওয়া সহজ হবে। সরকারকে এই ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তারা বলেছেন, এখন বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অন্যরাও ঋণ নিয়ে এগিয়ে আসবে; সংকট কেটে যাবে।

আইএমএফ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হবে। অর্থ পাচারকারীদের নাম ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। আয়কর বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। বেসরকারি কোনো ব্যাংকে এক পরিবারের দুই জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারবে না। টানা ছয় বছরের বেশি পরিচালক থাকতে পারবে না কেউ। বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকবে আইএমএফের পর্যবেক্ষক। সুদের হারের সীমা তুলে দিতে হবে। রিজার্ভের প্রকৃত পরিমাণ দেখাতে হবে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টের সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ঋণ পেতে হলে পর্যায়ক্রমে এসব শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। এ সময় তাৎক্ষণিক তিনটি শর্ত মানতে রাজি হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিছু শর্ত পর্যায়ক্রমে মানার কথাও জানানো হয়। তবে কয়েকটি শর্ত মানার বিষয়ে কোনো ধরনের আশ্বাস দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেগুলো হলো, ঋণের সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়া, অভিন্ন এক্সচেঞ্জ রেট, খেলাপি ঋণ কমানো, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি কমিয়ে আনা, ব্যাংক পর্ষদ গঠনের আইনের সংস্কার, ব্যাংকের আইটি খাতের সংস্কার, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা, খাতভিত্তিক আর্থিক ইন্ডিকেটরস, বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়মের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, ১০টি দুর্বল ব্যাংকের জন্য নেওয়া উদ্যোগ, ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট (এফএসএসপি) বাস্তবায়ন, ব্যাংক সুপারভিশন, ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১, ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন (সংশোধন) আইনসহ পাঁচটি অন্যতম আইনের সংস্কার। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল কিছুটা হলেও সেই চাপ থেকে সরকার স্বস্তি পাবে। বর্তমানে সরকার সাহস পাবে, দেশের বিভিন্ন সংকট সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। এখন সরকারের কাজ হবে আইএমএফ ঠিক যে কারণে ঋণটা দিচ্ছে, সেটার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

লেখক : কলাম লেখক, অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন