বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নীল গ্রহটি কোনো একক গোষ্ঠীর নয়

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ১০:১২

১৫ নভেম্বর পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ৮০০ কোটির ঘরে পৌঁছে গেল! আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ লাখ, যা আমাদের আজকের ঢাকা শহরের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটি। দ্বিতীয় শতকে এসে দ্বিগুণ হয়েছে; অর্থাৎ ২০ কোটি।

ধারণা করা হয়, ১৮০৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রথম বারের মতো ১০০ কোটিতে পৌঁছেছিল। এরপর ১২৩ বছর, অর্থাৎ ১৯২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০০ কোটির ঘরে পৌঁছাতে। তারপর মাত্র ৩৩ বছরের মাথায় ১৯৬০ সালে মানুষের সংখ্যা হয় ৩০০ কোটি! সেই থেকে খুব দ্রুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

সময়ের সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ২০১১ সালে ৭০০ কোটি থেকে মাত্র ১১ বছরের মাথায় পৃথিবীকে বহন করতে হচ্ছে আরো ১০০ কোটি বেশি মানুষের ভার! আর ২১০০ সালের আগেই মানুষের সংখ্যা ১ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে! মনে আছে, একটা টিভি প্রোগ্রামে এক বাইসনের বাচ্চার জন্ম নেওয়া দেখছিলাম। বাইসনটি মাঠে ঘাস খাচ্ছিল। এমন সময় তার বাচ্চা জন্ম নিল। সে ঘাস খেয়ে চলেছে, আর তার বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে। বাচ্চা দেহের বাইরে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু মায়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বাচ্চা নিজের চেষ্টায় দেহের বাকি অংশকেও মাতৃদেহ থেকে মুক্ত করল, হাঁচড়পাঁচড় করে বেরিয়ে এসে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর সে নিজের চেষ্টায় দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পড়ে গেল। আবার চেষ্টা করল, আবারও পড়ে গেল। এভাবে কয়েক বারের চেষ্টায় পাগুলো শরীর থেকে দূরে কোনাকুনি স্থাপন করে ব্যালেন্স রেখে সে দাঁড়াতে সক্ষম হলো। তারপর ঐভাবেই এঁকেবেঁকে হেঁটে মায়ের বুকের কাছে গিয়ে এক ঢুঁ মারল। তার বক্তব্য, ‘কি গো, আমি জন্মালাম, আর তুমি আমাকে পাত্তা দিচ্ছ না কেন?’

মা ফিরে তাকাল, ‘ও তুই? কখন জন্মালি? আমি তো খেয়ালই করিনি।’ মা বাচ্চাকে খুব করে চাটতে লাগল। দেখলাম প্রাণিজগতে সন্তানের জন্মদান কোনো কষ্টদায়ক ব্যাপার নয়।

কিন্তু মানুষের সন্তান যখন জন্মায়, তখন তা এমন ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়ায় কেন? প্রসবযন্ত্রণায় কাতর স্ত্রীলোকের চিত্কার কেউ শুনেছেন কি? শুনে কি মনে হয় না দশটা ডাকাত তার ওপর প্রাণঘাতী হামলা করছে? এর কিছু কারণ আছে। প্রথমত বিবর্তনের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের আকৃতি অনেক বেড়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মস্তকের আকৃতিও বেড়েছে। এই বিরাট আকৃতির মস্তক যখন মাতৃগর্ভ থেকে বেরোয়, তখন মাকে বিশ্বরূপ দেখিয়ে ছাড়ে। দ্বিতীয়ত, স্তন্যপায়ী প্রাণিগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র মানুষই দুই পায়ে চলে। দুই পায়ে চলার ফলে মায়ের প্রসবপথটি অনেক সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এর ফলে মা যেমন প্রসবের যন্ত্রণা পান, সন্তানও কিন্তু জন্মের সময় কষ্ট পায়।

তৃতীয়ত, মানুষ সভ্য হওয়ার পর থেকেই প্রচুর সন্তানের জন্ম দিয়ে চলেছে। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা আজ ৮০০ কোটি। পিঁপড়াজাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণীর কথা ছেড়ে দিলে মানুষের সমান আকার আয়তনবিশিষ্ট প্রাণীর সংখ্যা এর ধারেকাছেও আসে না। মানুষ যত বেশি ‘সভ্য’ হয়েছে, যত বেশি আরামদায়ক জীবনে অভ্যস্ত হয়েছে, তত বেশি যৌনক্রিয়া করেছে, তত বেশি সন্তান উত্পাদন করেছে। এর ফলে স্ত্রীলোকের শরীরে কিছু দুর্বলতা এসেছে, তার রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেম দুর্বল হয়েছে, (পুরুষেরও) এর ফলে সন্তান উত্পাদন ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক হয়েছে। এমনকি সদ্যোজাত শিশুও শারীরিকভাবে নড়াচড়ায় সক্ষম থাকে না। যতটা শারীরিক সক্ষমতা সে এক বছরে অর্জন করে, ততটা সক্ষমতা পশুশাবকদের জন্মের সময়েই থাকে। তবে শিশুর মস্তিষ্ক খুবই সক্রিয় ও সক্ষম থাকে, যা পশুদের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

প্রসবযন্ত্রণার মধ্যে প্রকৃতির একটা নির্দেশ কাজ করছে, তা হলো বেশি সন্তানের জন্ম দিও না। প্রকৃতি সবার জন্য, শুধু মানুষ আর মানুষ সর্বত্র থিক থিক করবে, এটা প্রকৃতির কাম্য হতে পারে না। আমরা শিখেছি কীভাবে হাঁটতে হয়, শিখেছি কীভাবে বলতে হয়, পোশাক পরতে হয়, বেঁচে কাটাতে হয় জীবন। আমরা শিখেছি আগুন জ্বালানো, যোগাযোগ করা—আর হ্যাঁ, আমরা তো ভালোবাসতেও শিখেছি। আমরা অনেক কিছু শিখেছি, শিখে চলেছি এখনো। তবে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, এই শিক্ষণকালে আমরা এমনও কিছু শিখেছি, যা কোনো দিনও না শিখলেই ভালো হতো। মনে সুখস্বপ্ন জাগে—আহা, এটুকু যদি আমরা না শিখতাম! আমি বলছিলাম দুনিয়া ধ্বংস করার যে ‘শৈল্পিক’ কায়দাখানা আমরা আয়ত্ত করেছি, তা নিয়ে। আমাদের একমাত্র বাসস্থান, আমাদের একমাত্র পৃথিবীকে আমরা দক্ষভাবে চুরমার করে দিচ্ছি এবং যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুততম গতিতে।

আবার মানুষ যখন থেকে জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিতে শিখল, তখন থেকেই মানবসভ্যতায় বিরাট এক আপদের সূচনা হলো। তার আগে ভৌগোলিকভাবে আলাদা মানুষের সমাজগুলোর রোগবালাই ভিন্ন ভিন্ন ছিল। যেমন—ইউরোপের রোগবালাই ছিল এক রকম, আবার আমেরিকা মহাদেশের রোগের ধরন ছিল ভিন্ন রকম।

১৪৯৩ সালে আমেরিকা মহাদেশে প্রথম সোয়াইন ফ্লু বা শূকরবাহিত সর্দিজ্বর মহামারি রূপে দেখা দেয়, তা দখলদার কলম্বাসের জাহাজে করে যেই শূকরেরা আমেরিকায় এসেছিল, সেখান থেকেই এই মহামারির সূচনা হয়, যা ইতিহাসে নিউ ওয়ার্ল্ড মহামারি বলে পরিচিত। আবার ১৫১৮ সালে আরাওয়াক ও হিস্পানিওয়ালার প্রায় অর্ধেক মানুষ সাফ হয়ে যায় দখলদারদের আগমনের সঙ্গে গুটিবসন্ত চলে আসায়।

ভিনদেশি রোগের সংক্রমণের কারণে আজকের দক্ষিণ আমেরিকাকেও চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। স্পেনীয় দখলদার কর্তেসের মাধ্যমে গুটিবসন্ত মেক্সিকোতে ছড়ায় ১৫২১ সালে। সঙ্গে করে গুটিবসন্ত নিয়ে আসায় সেই সভ্যতার ৩ লাখ মানুষ মারা যায়। এরপর একে একে আসে সর্দিজ্বর, হাম ও টাইফাস জ্বরের মহামারি। অনেক বছর পরে মেক্সিকো ও আন্দিজ কিছুটা সামলে নিলেও ব্রাজিলের জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। ফলে ভয়াবহ জনসংখ্যার অভাব দেখা দেয়। জনসংখ্যার এই ঘাটতি পূরণে স্পেনীয় ও পর্তুগিজরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ধরে নিয়ে আসে দাস। এই দাসরা তাদের সঙ্গে করে আমেরিকায় নিয়ে আসে ম্যালেরিয়া ও পীতজ্বর।

কলম্বাস যখন আমেরিকা থেকে ইউরোপে ফিরে গেল, তখন সঙ্গে করে নিয়ে গেল এক ভয়াবহ রোগ। ১৪৯৩-৯৪ সালে ফরাসি-স্পেনীয় যুদ্ধে নেপলসে ছড়ায় এই বীভত্স রোগ। সেখান থেকে ছড়ায় সারা ইউরোপে। এ রোগে প্রথমে যৌনাঙ্গে ঘা দিয়ে উপসর্গ দেখা দেয়। তারপর শরীরে বীজকুড়ি আসে এবং পচে যেতে শুরু করে, শেষ হয় একেবারে হাড়ের ক্ষয় দিয়ে। রোগটির নাম সিফিলিস। ইউরোপের লাখ লাখ মানুষ এই বীভত্স রোগে ভুগে মরেছে কলম্বাসের কারণে।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফরাসি সৈন্যদল যখন ১৮১২ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরে রাশিয়া আক্রমণে মস্কো পর্যন্তই চলে গিয়েছিল, তখন নেপোলিয়ন দেখতে পান যে, পুরো মস্কো শহর পরিত্যজ্য নগরী। কোনো জনমানব নেই, পুরো শহর শুধু খাঁখাঁ করছে। পরের পাঁচ সপ্তাহে ফরাসি সৈন্যরা টাইফাস রোগের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ৬ লাখ সৈন্যের প্রায় সবাই মারা পড়ে সেই মহামারিতে।

রাশিয়ার টাইফাস মহামারির ১০০ বছর পর ১৯১৮ সালের শেষের দিকে ভয়ংকর এক মহামারি সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, যার নাম স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৫ কোটিরও বেশি মানুষের। এই সংখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার চাইতেও বেশি। সে সময় সারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরই মৃত্যু হয়েছিল এই ভাইরাসে।

স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির ১০০ বছর পর করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বের একের পর এক শহর। এই মহামারি সামলাতে বড় বড় উন্নত দেশও খুবই হিমশিম খেয়েছে। এই ভাইরাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, জড়বাদী, ভোগবাদী আর বিলাসের সমাজই আমরা তৈরি করেছি। সংকটময় মুহূর্তে বোঝা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বাড়ি, গাড়ি একজন মানুষকে বাঁচাতে পারে না। যেমন পারে—ওষুধ, খাবার আর পানি।

একদল বিশেষজ্ঞ মানবজাতি বিলুপ্ত হতে চলেছে বলে ক্ষান্ত হচ্ছেন না। তারা ‘লাল কার্ড’ বের করে মহাবিপত্সংকেত দিতেও দ্বিধা করছেন না। তাদের কথা হলো, ২০৫০ সাল থেকে ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৫১টি দেশের জন্মহার হ্রাস পেতে শুরু করবে। প্রায় ৩ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষ হোমো সেপিয়েন্সের নিদর্শন পাওয়া যায়। অসংখ্য প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতাকে সুনিপুণ দক্ষতায় অতিক্রম করে মানুষ নামক উন্নত প্রজাতির প্রাণীটি আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। পৃথিবী একটাই। চমত্কার এই নীল গ্রহ কোনো একক জাতির বা গোষ্ঠীর নয়, শুধু ৮০০ কোটি মানুষেরও নয়। সহস্র হাজার বছর ধরে আণুবীক্ষণিক জীব, লতাপাতা, জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে থাকা ৮০০ কোটি মানুষের। মানুষ কি পারবে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে? মানুষ কি পারবে একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলতে? মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে?

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন