বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ আসিবেই

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ১০:২৭

বিশ্বের উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল কোনো রাষ্ট্রই চাহে না, তাহার নাগরিকদের জীবনমান ক্রমশ নিচের দিকে নামিতে থাকুক; কিন্তু পরিস্থিতির খারাপ অবস্থা সকলের হাতে থাকে না। আমরা দেখিতে পাইতেছি, উন্নত বিশ্বের কিছু পরাশক্তির ঠান্ডা লড়াই, গরম লড়াইসহ বিভিন্ন লড়াই ও প্রতিযোগিতার জন্য বিশ্ব নূতন করিয়া এক ভয়ানক অস্থিরতা ও দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত হইতেছে। কতিপয় মানুষের ঝগড়াফ্যাসাদের জন্য বিশ্বের আজ এই ত্রাহি অবস্থা।

বলা যায়, মহা আর্থিক সংকটে সমগ্র বিশ্ব। অর্থনীতিবিদরা বলিতেছেন, নূতন কর্মসংস্থান তো সৃষ্টি হইবেই না, উলটা চাকরিচ্যুতির ঘটনা বাড়িতে থাকিবে। বিশ্বের সকল দেশেরই মুদ্রার বিনিময় মান ক্রমশ নিচের দিকে নামিতেছে। একমাত্র শক্তিশালী হইতেছে মার্কিন ডলার। যেই কারণে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষাবলম্বনে চীন এখন চুপচাপ সরিয়া পড়িতেছে বলিয়া মনে করিতেছেন অনেকে। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠক অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ছিল। অনেক বিষয়েই যৌথ কর্মসম্পাদন দল গঠনে তাহারা একমত হইয়াছেন। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য বিশ্বের যেই বিপর্যয়কর অবস্থা, সেইখানে পুতিনের পাশে সরবে না নীরবে যাহারা ছিলেন—তাহারা ক্রমশ সরিয়া পড়িতেছেন বলিয়া মনে করা হইতেছে। অর্থনীতি বড় মাথাব্যথা। তাহা ভূরাজনীতির উপরও বড় প্রভাব ফেলিয়া থাকে। আসলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় মান চীনসহ বিশ্বের সকল দেশেই ক্রমশ কমিতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা শক্তিশালী হইলেও সেই দেশেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিতেছে। দেশটির ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত ব্যয় কমিয়া গিয়াছে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে পরিবারগুলির সঞ্চয়ের হার বাড়িয়াছে ৩৩ শতাংশ—যাহা ৪৫ বত্সরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতির হার গত অক্টোবরে ছিল ৪১ বত্সরের মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশটির বাসিন্দারা জীবনযাত্রার ব্যয় কমাইতে সরকারের নিকট আরজি জানাইয়াছে। এই দিকে গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট নূতন ট্যাক্স ও ব্যয় পরিকল্পনা প্রকাশ করিয়াছেন। দেখা যাইতেছে—ব্রিটেনে ২০২৩ সালে জিডিপি ১ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হইবে। ব্রিটেন গতকাল স্বীকার করিয়াছে যে, মন্দা আসিতেছে।

এই যখন বিশ্ব বাস্তবতা, ইচ্ছায় হউক কিংবা অনিচ্ছায় হউক—এই অতিরিক্ত বোঝা, এই কষ্ট আমাদের বহন করিতে হইবে। পোশাক-কারখানার অবস্থা খারাপ, ব্যাংকের চাপ বাড়িতেছে। সার্বিকভাবে চাপ বাড়িতেছে অর্থনীতির উপর। এই চাপটা সকলে মিলিয়া ভাগাভাগি করিয়া লইতে হইবে। এই ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে নিজেদের পারিবারিক পর্যায়ে দৃষ্টি দিতে হইবে। সেইখানে ব্যয় সংকোচন করিতে হইবে, বাজেট পুনর্বিন্যাস করিতে হইবে। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বের সমস্যাগুলি অনেক অধিক গুরুতর হয়, যাহার সমাধান উন্নত বিশ্বের মতো পরিকল্পিতভাবে হয় না। এই অবস্থায় রাজনৈতিক নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হইয়া থাকে। এই অবস্থায় যাহারা রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় থাকেন, তাহাদের অনেক অধিক ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়। নচেত্ উন্নয়শীল বিশ্বে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য আসিবে নিশ্চিতভাবেই। প্রশ্ন হইল, রাজনৈতিক নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া যদি এই সমস্যার সমাধান আসিত, তাহা হইলে সেই নৈরাজ্যই মানিয়া লওয়া যাইত; কিন্তু রাজনৈতিক নৈরাজ্য কি সমাধান দিতে পারিবে? নাকি দুর্ভোগকে আরো দীর্ঘায়িত করিবে?

আমরা ৪৩-এর মন্বন্তরের কথা শুনিয়াছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতা ও দুর্ভোগের কথা শুনিয়াছি, ত্রিশের মহামন্দার কথা শুনিয়াছি; কিন্তু দেখি নাই। সুতরাং এখন যাহা হইতে যাইতেছে তাহা আমাদের নিকট সম্পূর্ণ নূতন অভিজ্ঞতা। মনে রাখিতে হইবে, মহান আল্লাহতালাহ যাহাকে খুশি তাহাকে সম্পদ দান করেন। আবার যে কাহারো নিকট হইতে সম্পদ কাড়িয়া লইতে পারেন। আবার সংকুচিতও করিতে পারেন। তিনিই মানুষকে সম্মানিত করেন আবার তিনিই কাড়িয়া লহেন। আসলে মহারব মানুষকে নানাভাবে পরীক্ষায় ফালান। এই অবস্থায় আমাদের উচিত হইবে, ধৈর্য ধারণ করা। কারণ, সৃষ্টিকর্তা ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। যাহারা ধৈর্যশীল তাহাদের জন্য সুসংবাদ আসিবেই।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন