মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফুলের ব্যবসা ও কিছু কথা

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ০০:১০

সামনে শীতকাল, চারদিকে নানা ধরনের ফুল। এই সময় বিয়ে-শাদিও তুলনামূলক অধিক হয়ে থাকে। বস্তুত ফুল হলো হৃদয়ের অনুভূতির অভিব্যক্তি বা বহিঃপ্রকাশ। আসলে কাগজের টাকার ন্যায় এর অন্তর্নিহিত ভ্যালুস না থাকলেও সৌন্দর্য ও সুরভির কভারে এর বহির্ভ্যালু অনন্যসাধারণ। ফুল অনেক ক্ষেত্রে মাধবীক্ষণ নির্দেশ করে থাকে। এই সূত্র ধরে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের সেই বিখ্যাত গানের কলি মনে পড়ে যায়, ‘বসন্তে বাতাসে সইগো, বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে...’। 

যা-হোক, সাধারণত চাহিদা এবং সরবরাহের মাধ্যমে সব পণ্যের দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে। আর অধিকাংশ পণ্যদ্রব্য জাগতিক চাহিদা মেটানোর জন্য চলমান। কিন্তু আমরা একটি কথা বেমালুম ভুলে যাই, মনের যে চাহিদা তার সীমা কতদূর। আর ভাবলেও অনেক সময় তার তেমন গুরুত্ব দিই না। মোটের ওপর, সুন্দরের মধ্যে মনের সত্যিকার শক্ত শেকড় গ্রথিত। মনের সেই চাহিদার সারথি ধরে প্রথম যে পণ্যদ্রব্যের ওপর গুরুত্ব দিই, সেটা হলো এই দৃষ্টিনন্দন ফুল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে, কতিপয় ফুল ব্যতীত প্রায় ফুল কমবেশি সুগন্ধি বিধায় আমরা জোর গলায় বলতে পারি যে, ফুল একসঙ্গে দৃষ্টিনন্দন ও সুরভিযুক্ত।

পাশ্চাত্য ও উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। তাছাড়া আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ফুলের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে। সে কারণেই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল উৎপাদনের যাত্রা শুরুর স্মরণীয় বছর হলো ১৯৮৩ সাল। এ ক্ষেত্রে কিষান পরিবারে যে টগবগে উদ্যোগী যুবক এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন পুষ্পানুরাগী শের আলী। তিনি ঐ বছর যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলাধীন পানিসারা গ্রামে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ ডেসিম্যাল জমিতে ফুল চাষ আরম্ভ করেন। মজার ব্যাপার হলো যে, সেই শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ ডেসিম্যাল থেকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ফুল চাষের দিক দিয়ে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং যেখানে পুরোদমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ হচ্ছে এবং দিনে দিনে তা বেড়েই চলছে। এদিকে ফুল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত আছেন প্রায় ১৫ হাজার কৃষক এবং যুগপৎ উৎপাদন ও বিপণন বা ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট আছেন প্রায় দেড় লাখ খেটে খাওয়া মানুষ। 

সত্যি কথা বলতে কি, বর্তমান এটি একটি পটেনশিয়াল সেক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই সেক্টরকে প্রায় ৭ লাখ মানুষ জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। একদিকে সামাজিক চাহিদা এবং অন্যদিকে ফুলশিল্পের সম্প্রসারণের ফলে আজকাল ফুলের ব্যবহারও আনুপাতিক হারে অনেক বেড়ে গিয়েছে। বর্তমানে বিয়েশাদি তো আছেই। তাছাড়া অন্যান্য সামাজিক ও জাতীয় অনুষ্ঠান, যেমন বিজয় দিবস, ভ্যালেনটাইনস ডে, পহেলা ফাল্গুন, স্বাধীনতা দিবস, মাতৃভাষা দিবসসহ জাতীয় ও সামাজিক জীবনের অনেক জনগুরুত্বের ক্ষেত্রবিশেষে বিয়েবার্ষিকী, জন্মদিন, পূজা, পার্বণ, জয়ন্তী, কুশলাদি ইত্যাদিতে ফুল ব্যবহারের ব্যাপারে দ্রুত মোড় নেওয়ার দিকটি বেশ লক্ষ্যণীয়। মজার ব্যাপার হলো যে, ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগী ব্যক্তি পাশ্চাত্য বিশ্বের শীতকালীন ফুল চাষের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এই সূত্র ধরে উদাহরণ হিসেবে গদাখালীতে কিছু বাগানে টিউলিপ ফুল শোভা পাচ্ছে। তাছাড়া উদ্যোগী মনোভাবের কারণে আরো অনেকে বিদেশি ফুল বেসরকারি পর্যায়ে এদেশে চাষ করার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। 

সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশ ফুল উৎপাদন এবং যুগপৎ বিপণনে টেক অব স্টেজে আছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক আবহাওয়া অনুকূলে আছে বিধায় শত শত প্রজাতির ফুল জন্মে থাকে। কিন্তু এর মধ্যে যে ফুলগুলো সমহিমায় জায়গা জুড়ে নিয়েছে, তার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে আছে গ্লাডিওয়ালস, যা মোট উৎপাদনের ৩১ শতাংশ। একই সঙ্গে গোলাপ, রজনীগন্ধা এবং ম্যারিগোল্ড যথাক্রমে ২৪ শতাংশ, ১৭ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ। অবশিষ্ট অন্যান্য ফুল ২০ শতাংশ। আর তৃতীয় বিশ্বের সমস্যাসংকুল ছোট এই দেশে ফুলব্যবসা করে হাজার হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে, যা কম কথা নয়! 

এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, এই ফুল পরিণত হওয়ার পরেই পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর হাত হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। আর বিপণনের দিক দিয়ে কাটা ফুলের আওতায় তোড়া, মালা, স্তবক, গুচ্ছ, ফুলের ঝুড়ি, ফুলের সামগ্রী ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ভোক্তার চাহিদার কথা মাথায় রেখে সেভাবে সাজিয়েগুছিয়ে বিক্রেতা বা বিক্রয়কর্মী তাদের হাতে তুলে দিয়ে থাকেন। আর এটি ভোক্তার চাহিদা, সময় ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ফুলের পাইকারি বাজার বললে যে নামগুলো প্রথমে উঠে আসে, তা হলো, শাহবাগ, আগারগাঁও, গাবতলী, গোদখালী, লিজা ফ্লাওয়ার সেন্টার, ইত্যাদি। 

এদিকে উৎপাদক থেকে পাইকারি বাজার হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছলেও অনেক সময় বণ্টন প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত কতগুলো নেতিবাচক কারণে সুষ্ঠু বিপণনে সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। বস্তুত উৎপাদক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং দেশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা শত সহস্র খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমান্তরাল সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য। পরোক্ষভাবে ফুলের দার্শনিক হৃদয়কাড়া অবয়বসহ সৌরভ প্রকারান্তরে সৃষ্টি করবে আমাদের ফুলের মতো জীবন।

লেখক: অর্থনীতি গবেষক

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন