শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রবাসীর চোখে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন 

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ০০:৪৮

আমেরিকার সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আবহ পালটে দিতে শুরু করেছে। দেশের রাজনৈতিক সচেতন মহল, মিডিয়া, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতদের সব জরিপ, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণকে পাশ কাটিয়ে জনগণ একটি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দুটি রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তি-সামর্থ্যকে নতুন রূপে উপস্থাপন করেছে। ‘কেউ কাউকে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ দুই দলের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন বাংলা এই প্রবাদবাক্যেরই প্রতিফলন। যে কারণে বিজ্ঞজনের ধারণা মোতাবেক নির্বাচনি ফলাফলে তথাকথিত রেড ওয়েভ (লাল ঢেউ) আসেনি বা ঘটেনি। অর্থাৎ, আমেরিকান রাজনীতির ধারাবাহিকতায় সব প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে কংগ্রেসের সিনেট ও হাউজে বিরোধী দলকে ব্যাপক বিজয় দিয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসে। সচেতন জনগণ সাধারণত এটি করেন রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি বা চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স আনার নিমিত্তে। 

এবারের এই নির্বাচনে বিরোধী রিপাবলিকান দল হাউজে অল্পসংখ্যক (পাঁচ-ছয়) আসনের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সিনেটে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসে। আগে সিনেটে দুই দলেরই সমান সমান আসন ছিল এবং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সিনেটের সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্টকে ভোট দিয়ে টাই ভাঙতে হতো। এবার ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে একটি রিপাবলিকান আসন ছিনিয়ে এনে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। জর্জিয়ার অনির্ধারিত আসনে তারা এগিয়ে থাকলেও ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায়, আগামী ডিসেম্বরের ৬ তারিখে পুনরায় রান অব নির্বাচনের মাধ্যমে জিতে আসতে হবে। ডেমোক্র্যাট দলীয় রাফায়েল ওয়ারনেক সিটিং সিনেটর এবং এবারও ভোটে আগানো, তাই তারই জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। আর তা হলে ডেমোক্র্যাট একটি আসন বেশি পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। হারলেও আগের মতো সিনেটের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। 

শুধু তাই নয়, স্ট্যাট গভর্নরের পদে সাধারণত মোট ভোট কম পেয়েও ছোট ছোট রেড স্ট্যাটের কারণে বরাবরই রিপাবলিকান দল বেশিসংখ্যক স্ট্যাটে গভর্নর পদে জেতে, কিন্তু এবার ডেমোক্র্যাট অনেকগুলো গভর্নর পদও ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এবারে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রায় সমান সমান গভর্নর পদ দখলে নিয়েছে। ডেমোক্র্যাট স্ট্যাটসমূহ বড় বিধায় তাদের ভোটের সংখ্যাও এবার আগের তুলনায় বেড়েছে। স্ট্যাটের অন্যান্য পদের নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাট আগের তুলনায় অনেক ভালো করেছে। বিগত ১০০ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাসে মাত্র তিন বার তিন জন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। ১৯৩৫ সালে ফ্রেডরিক ডি রুজভেল্ট (এফ ডি আর), ৫০-এর দশকে জন এফ কেনেডি এবং আশির দশকে সিনিয়র বুশের বেলায়। তাই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, জো বাইডেনকে যতটুকু দুর্বল প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে করা হোক না কেন, আসলে তিনি তার চেয়েও আরো অনেক শক্তিশালী ও প্রাজ্ঞ্য।

এই নির্বাচনে ১০০ সিনেট আসনের মধ্যে ৩৫ আসন এবং হাউজের ৪৩৫ আসনের সব কটিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বিগত দিনের অভিজ্ঞতা মোতাবেক বিরোধী দল হিসেবে রিপাবলিকানদের এই নির্বাচনের সবশেষ ফলাফলের পর সিনেটে অন্তত ৫১ থেকে ৫২ আসন ও হাউজে ২৩০ থেকে ২৪০ আসন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংগত কারণে তা হয়নি। সে ক্ষেত্রে সিনেটে তারা নিজেদের আগের একটি আসন হারিয়েছে। হাউজে বড়জোর চার থেকে পাঁচটি আসন বেশি পেতেও পারে, আবার মাত্র দুই থেকে তিনটি আসনও বেশি পেতে পারে। সর্বশেষ ফলাফল মোতাবেক রিপাবলিকান ২১৮ ও ডেমোক্র্যাট ২১২ আসন এবং বাকি পাঁচটি আসনের অসম্পূর্ণ গণনানুযায়ী তিনটিতে ডেমোক্র্যাট ও দুটিতে রিপাবলিকানরা এগিয়ে আছে। 

এদিকে হাউজে ২১৮ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে রিপাবলিকান হাউজ ককাস ইতিমধ্যেই কেভিন ম্যাককার্থিকে স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জানুয়ারিতেই নুতন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে। তারা ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে ইম্পিচ, হোমল্যান্ড সিরিউরিটি মন্ত্রিসহ, বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন, বর্ডার সিকিউরিটির কার্যক্রম, কোভিড ভ্যাকসিন মেন্ডেট ইত্যাদি বিষয়ে কংগ্রেশনাল ওভারসাইট কমিটি তদন্তের কার্যক্রম নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের তথা বাইডেন প্রশাসনের ব্যার্থতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি জনগণের সামনে তুলে ধরে নিজেদের ভোটকে সমুন্নত করতে এবং জনগণকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার কৌশল হিসেবেই এসব পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে। ঠিক যেমনটি করে ডেমোক্র্যাটরা এই নির্বাচনে সুফল পেয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প ইতিমধ্যে নিজে নিজেই তার প্রার্থিতা ঘোষণা করে মিলিয়ন ডলারের নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। এতে দলের সিনিয়র-জুনিয়রসহ অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কেননা, নীতি-নির্ধারণীদের অনেকেই এবং তার অতি ঘনিষ্ঠজনেরা যারা বিগত দিনে দুই-দুবার অভিশংসন প্রক্রিয়া, এমনকি ৬ জানুয়ারিসহ কংগ্রেসশনাল কমিটি কর্তৃক পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং তাকে বিচারের সম্মুখীন করার সব কর্মকাণ্ডের সময়ও তার পক্ষে কাজ করেছেন—এমন অনেকেই এখন তার প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন। সাউথ কেরোলিনার সিনেটর তারই অতি ঘনিষ্ঠজন লিনডজি গ্রাহামসহ সিনেটর যশ হোলি তাকে আপাতত প্রার্থী ঘোষণা থেকে বিরত রাখতে অনুরোধ করলেও কোনো কাজে আসেনি। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে তার পক্ষের লোকজনের পরাজয়ে তিনি অনেকটা দুর্বল হয়ে একাকিত্ব অনুভব করছেন এবং নিজেকে আলোচনায় রাখতে তড়িঘড়ি করে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। রিপাবলিকান নীতিনির্ধারণকারীরা অনেকটা নিশ্চিত যে, ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প চূড়ান্ত প্রার্থী হলে ভরাডুবি নিশ্চিত।

রাজনৈতিক আবহ পরিবর্তনের দ্বিতীয় বিষয়টি হলো দুই দলেই নুতন ও অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টি ও এগিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অনুরোধ সত্ত্বেও স্পিকার নেনসি পেলোসি দলের হাউজে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতৃত্বে না থাকার ঘোষণা দিয়ে তরুণ ও নতুন নেতা নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। দলের অন্যান্য সিনিয়র হাউজ নেতা যেমন—কংগ্রেসম্যান ওভারসাইট ককাসের প্রধান হয়য়ার, জেফরি স্মিথ, ক্লেবার্নসহ সিনিয়র নেতৃত্ব নিজেদের পদ থেকে সরে গিয়ে সাধারণ সদস্য হিসেবে থাকার ঘোষণা দিয়ে নতুন ও তরুণ নেতৃত্ব সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। তাই ডেমোক্র্যাট হাউজের নেতা হিসেবে নিউ ইয়র্কের তরুণ কংগ্রেস সদস্য হাকিম জেফরির নাম জোরেশোরেই আসছে।

এদিকে রিপাবলিকান দলের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের দ্বিতীয় বারের মতো বিপুল ভোটে নির্বাচিত গভর্নর অপেক্ষাকৃত তরুণ রন ডিসেন্টিসের নাম ২০২৪ সালের নতুন প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হিসেবে জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। সম্প্রতি তার বিজয় ভাষণে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করেই ট্রাম্পের তড়িঘডড়ি প্রার্থিতা ঘোষণার সমালোচনা ও উপহাস করেন। রিপাবলিকান শিবিরে সিনেটর জোশ হোলিসহ তিনিও ট্রাম্পপন্থি বলে পরিচিত থাকলেও এখন ট্রাম্পের বিপক্ষে সরাসরি কথা বলছেন। এদিকে ট্রাম্পপন্থি মিডিয়া ফক্স নিউজও তার প্রার্থিতা ঘোষণা নিয়ে সমালোচনা করছে। রিপাবলিকানপন্থি ডেইলি পোস্ট উপহাস করে প্রথম পাতার একদম নিচে ছোট কলামে ‘ফ্লোরিডা ম্যান তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে’ শিরোনামে নিউজ ছেপেছে। ডেমোক্র্যাট দলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখনো পর্যন্ত কোনো নতুন বা তরুণ নাম শোনা না গেলেও সময়ে উচ্চারিত হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা, বিজ্ঞ মহল বলছে, বাইডেন দেশ ও দলের জন্য যে কোনো রকম ত্যাগ স্বীকারে সব সময় প্রস্তুত।

লেখক : বাংলাদেশি আমেরিকান, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 

ইত্তেফাক/ইআ