শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মধ্যপ্রাচ্যে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রবেশ

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ০১:০১

আজ হইতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে শুরু হইতেছে সর্বকালের সবচাইতে ব্যয়বহুল ফুটবল বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপকে ঘিরিয়া এখন কাতারে সাজসাজ রব পড়িয়া গিয়াছে। ফুটবলের মহাতারকাদের মেলায় কাতার হইয়া উঠিয়াছে আরো বর্ণিল ও ঝলমলে। বলিতে গেলে পুরা দুনিয়াই এখন কাঁপিতেছে এই বিশ্বকাপ জ্বরে। কেননা পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। আর ফুটবলের সবচাইতে বড় এই আয়োজনকে বলা হয়  ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। ৩২টি দেশ আজ শিরোপার লড়াইয়ে মাঠে নামিলেও আগামী ১৮ ডিসেম্বর নিশ্চিত হওয়া যাইবে ট্রফিটা শেষপর্যন্ত এই দফায় কাহার ঘরে উঠিতেছে। প্রশ্ন হইল, এই বিশ্বকাপ মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতে কতটা প্রভাব ফেলিবে?

উপসাগরীয় দেশ কাতার যখন ২০২২ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়, তখন অনেকের কপালেই চিন্তার ভাঁজ পড়িয়াছিল। এখনো সেই সকল চিন্তা ও প্রশ্ন মিলাইয়া যায় নাই। তবে চোখ ধাঁধানো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু প্রশ্নের সমাধান পাওয়া গিয়াছে বটে; কিন্তু সাংস্কৃতিক পার্থক্য কতটা বিপাকে ফেলিবে খেলোয়াড় ও বিভিন্ন দেশ হইতে আসা দর্শকদের? ধারণা করা হইতেছে, বিশ্বকাপ চলাকালে ১৩ মিলিয়ন দর্শক কাতারে যাইবে, যাহা এই দেশটির বর্তমান সামগ্রিক জনসংখ্যার অর্ধেকের সমান। কাতার ২০১৯ সালে ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করে। সেই অভিজ্ঞতা হইতে বিশ্বকাপ আয়োজনে এবং দর্শক ও খেলোয়াড়দের আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে কোনো সমস্যা হইবে বলিয়া মনে হয় না। তবে তাহাদের মনোরঞ্জন কতটা করিতে পারিবে—প্রশ্ন হইল সেইখানেই।

কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজন লইয়া আসলে সেই বিতর্কটা এখনো চলিতেছে। অনেকে বলিতেছেন, আবহাওয়াসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাতারে বিশ্বকাপের আয়োজন করা সঠিক হয় নাই; কিন্তু শেষপর্যন্ত কী কারণে ফিফা এই সিদ্ধান্ত লইয়াছে, তাহাও একটি ভাবিবার বিষয়। কাতার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও রক্ষণশীল দেশ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে আসিয়া স্টেডিয়াম এলাকায় অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছে ফিফা। ইহার পূর্বে বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামগুলিতে অ্যালকোহল বা বিয়ার পাওয়া যাইবে—এমন কথা বলা হইয়াছিল, এমনকি তাহার দোকানও চালু হইয়া গিয়াছিল। এখন ইহা শুধু ভিআইপি স্যুটে পাওয়া যাইবে, মিলিবে নির্দিষ্ট কিছু ফ্যানজোনেও। যতই সীমিত হউক, এই উদ্যোগের কারণে কাতারও কি শেষপর্যন্ত উন্মুক্ত সংস্কৃতির কাতারে শামিল হইল না? এই নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি হোটেলে প্রেমিক-প্রেমিকার এক রুমে রাত্রি যাপন ও রাতভর পার্টিতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হইয়াছে। জনসম্মুখে যাওয়া যাইবে না খোলামেলা পোশাকে। 

ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি স্টারের খবরে বলা হইয়াছে, কাতার বিশ্বকাপে খোলামেলা পোশাক পরিলে রহিয়াছে জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও। এমনকি পুরুষরাও খালি গায়ে স্টেডিয়াম কিংবা জনসম্মুখে চলাফিরা করিতে পারিবেন না। কমপক্ষে স্লিভলেস টি-শার্ট পরিতে হইবে তাহাদের। আইন অমান্য করিলে গুনিতে হইবে ২ হাজার ৪০০ পাউন্ড বা প্রায় ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা। তবে ফিফার ওয়েবসাইটে বলা হইয়াছে, ‘নারীরা ইচ্ছা মতো পোশাক পরিধান করিতে পারিবেন। কেবল জনসম্মুখে—যেমন মিউজিয়াম ও সরকারি দপ্তরে গেলে কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা কাপড় পরিধান করিতে হইবে।’ 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের পর কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে উন্মুক্ত সংস্কৃতির আরো ছোঁয়া লাগিতে পারে। আমরা জানি, ইতিমধ্যে সৌদি আরবে সিনেমা হল চালু, নারীর প্রাইভেট কার চালানো ইত্যাদিতে অনুমতি মিলিয়াছে। হাজার বৎসরের সংস্কৃতি পরিবর্তনের পিছনে মূল প্রভাব বিস্তার করিয়া চলিয়াছেন দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান প্রভৃতি দেশে ইতিমধ্যে আধুনিক সভ্যতার প্রভাব তৈরি হইয়াছে, কাতারও সেই কাতারে শামিল হইতেছে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। যদিও অ্যালকোহল সীমিতকরণ বা পোশাক-পরিচ্ছদের কিছুটা বিধিনিষেধ মানিয়া লইয়া ফিফা কাতারের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি একপ্রকার সম্মান দেখাইয়াছে, তথাপি আখেরে ফুটবল বিশ্বকাপ সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দৈনন্দিন জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে কতটা দাগ কাটিয়া যাইবে তাহা দেখিবার বিষয় বটে।

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন