মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শান্তি চাই, যুদ্ধ নয়

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০১

সম্পদ রক্ষা বা অপচয় রোধ করার অবিকল্প উপায় ‘যুদ্ধ’ নামক শব্দটি ডিকশনারি এবং মানুষের মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত করা। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত সম্পদের লুণ্ঠন এবং রক্ষাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে আসছে। সেসব যুদ্ধের ফলস্বরূপ কখনো সম্পদের ধ্বংস ছাড়া বৃদ্ধি দেখা যায়নি। প্রতিটি যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর বুকে বারবার দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। ইতিহাসে নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে বাংলার ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন, এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ না খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল।  

মানুষ এই গ্রহের সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান প্রাণী। সভ্যতার আধুনিকতার সঙ্গে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠেছে। সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা বিষয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। বর্ণবাদ বা জাতিবৈষম্য বিলুপ্তির জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। পৃথিবীর বয়স দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ কি কমেছে? মোটেই না; যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ যেমন বেড়েছে, তেমনি আগের যুদ্ধের চেয়ে বেড়েছে ভয়াবহতা। মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করি—বর্ণবাদ বা জাতিবৈষম্য বিলুপ্তির আন্দোলনের ফলাফল কী? এসবের উত্তর খুঁজে পাই না!

মূলত যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারণ আমরা নিজেরাই। নিজেদের কেউ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি না আমরা। আমরা নিজেদের পরিমাপ করি সাদা-কালো, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-কনফুসিয়াস-জৈন-ইহুদি-বাঙালি-ভারতীয়-চাকমা-আমেরিকান-রাশিয়ান-এশিয়ান-ইউরোপিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান নিক্তিতে। সত্যিকার অর্থে, আমরা পৃথিবীর মানুষকে যেদিন সত্যিকার মানুষ ভাবতে পারব, ঠিক সেদিন থেকে যুদ্ধ নামক শব্দ পৃথিবীর বুক থেকে বিলুপ্ত করতে পারবে। মানুষ তাকেই বলে, যার মধ্যে আছে মানবতা। মানবতা থাকে না পশুর মধ্যে, অর্থাৎ মানবতাহীন মানুষ পশুর সমান। মানবতা আছে, এমন মানুষ যুদ্ধকে সব সময় মনে করে অযৌক্তিক ও অমঙ্গলজনক কর্মকাণ্ড। 

বস্তুত, যুদ্ধ মানবসভ্যতাকে পশ্চাদগামী করে, যুদ্ধ দেশ এবং দশের উন্নয়নে বাধা প্রদান করে। প্রতিটি মানুষের এমন চিন্তা করা উচিত যে, ধ্বংসাত্মক কোনো কর্ম যৌক্তিক হতে পারে না। এই যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে আমরা নিজে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যদি কোনো সমাজের প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সে সমাজ কখনো ‘বিভাজন তত্ত্ব’ নামক শব্দ লালন করবে না। পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে মানুষকে মানুষ হওয়ার বিকল্প কিছু নেই। এক লিটার দুধে এক ফোঁটা বিষ মেশালে সম্পূর্ণ দুধ বিষাক্ত হয়ে যায়। সে রকম সভ্যতার কোনো একটি অংশে যুদ্ধ সংঘটিত হলে পুরো সভ্যতা সেই যুদ্ধের জন্য কলুষিত হয়। উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেন-রাশিয়ার কথাই বলা যায়। এ যুদ্ধের চরম প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জুড়ে। যুদ্ধ হচ্ছে দুটি ভিন্ন দেশের মধ্যে, অথচ এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশে। পুরো পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। 

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে প্রতিটি দেশ যুদ্ধ ও যুদ্ধাস্ত্রের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, সামগ্রিক পরিমাণ হিসাব করলে দেখা যাবে, ঐ অপচয় করা অর্থের সঠিক ব্যবহার করা হলে পৃথিবীর সব মানুষের সব মৌলিক অধিকার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) শতভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে। যুদ্ধে শুধু অর্থসম্পদ অপচয় হয় না। তরুণ-তরুণী ও মেধার প্রচুর অপচয় হয়। যুদ্ধের জন্য প্রতিটি রাষ্ট্র অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে সৈনিকে পরিণত করে। দিন শেষে এদের অকালে প্রাণ ঝরে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যদি যুদ্ধ নামক কোনো শব্দ এই পৃথিবীতে না থাকত, তাহলে এই তাজা প্রাণগুলো অপচয় হতো না। যুদ্ধে তরুণ-তরুণী, অর্থসম্পদ এবং অন্য যতটা অপচয় হয়, সেসব কিছুর থেকে বেশি মেধার অপচয় হয়। চিন্তার উৎস মেধা, যার দ্বারা সাধারণত সুচিন্তা এবং কুচিন্তা করা যায়। যুদ্ধ সম্পর্কে সুচিন্তা ও কুচিন্তা দুটোই করা হয়। দুটোতেই মেধার অপচয় হয়। সুচিন্তা বলতে বর্তমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হচ্ছে, তা নিয়ে অন্য দেশের মেধাবীদের কলাম লেখা, যুক্তিতর্ক করা কিংবা গবেষণা করা ইত্যাদি। এই চিন্তার বিপরীতে যে চিন্তাগুলো করা হয়, সেগুলো মেধার কুচিন্তা। অসংখ্য মেধাবী লোক নিয়োজিত থাকে, বুদ্ধিচর্চায় তারা বুদ্ধি দ্বারা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্রের উদ্ভাবন এবং ব্যবহারের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকে, যা বুদ্ধি দ্বারা জাতির জন্য অভিশাপ অথচ মানুষ সত্যিকার অর্থে মানুষ হলে এই অভিশাপকে আশীর্বাদে পরিণত করা সম্ভব। মেধার কুচিন্তা করা লোকদের বড় একটা রূপ হলো হল্লাবাজ লোক। হল্লাবাজির জনক হচ্ছে ‘যুক্তরাজ্য’, যারা ভারতবর্ষে ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি প্রয়োগ করে ২০০ বছর ভারতবর্ষকে শাসনের নামে শোষণ করেছিল। বর্তমান যুগে বহু আধুনিক হল্লাবাজ আছে—সচেতন দৃষ্টিতে দেখলেই দেখতে পাওয়া যাবে। 

আদিকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যুদ্ধে জয়ীরা অসংখ্য মানুষ হত্যা করে বীরের খেতাবে ভূষিত হয়ে আসছেন। অথচ একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে উল্লাসে হত্যাকারী যোদ্ধা কখনো বীর হতে পারেন না। প্রকৃত বীর কখনো মানুষ হত্যা করেন না, বরং মানুষের প্রাণ বাঁচাতে জীবন বাজি রাখেন। আমরা আমাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে আলেকজান্ডারকে খ্যাতিমান বীর হিসেবে ভূষিত করি। কিন্তু প্রকৃত খ্যাতিমান হচ্ছেন সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল। 

শেষ কথা এটাই, আসুন আমরা একসঙ্গে সবাই মানবিকতা বহন করে প্রকৃত মানুষ হয়ে যাই এবং প্রকৃত মানুষ সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। তাহলেই আমরা সুসজ্জিত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। সুতরাং বলতেই হয়, ‘শান্তি চাই, যুদ্ধ নয়’।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন