বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিবেক কী বলে?

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০০:৫১

কথায় বলে, চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা। দুঃখজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশ যেন চুরি আর দুর্নীতির অভয়ারণ্য হইতে চাহিতেছে। সপ্তদশ দশকের বিখ্যাত ইংলিশ নাট্যকারদ্বয় বিউমন্ট ও ফিটচার যেমন বলিয়াছেন—‘দুর্নীতি এমন একটি বৃক্ষ—যাহার শাখাগুলি অসম্ভব রকমের দীর্ঘ আর তাহারা অনেক দূর অবধি ছড়াইয়া আছে।’ বিউমন্ট ও ফিটচারের নাটকের বাণী হইতে বুঝা যায়—দুর্নীতি সেই সময় ইউরোপেও যথেষ্ট ডালপালা মেলিয়া বসিয়াছিল। কিন্তু ক্রমশ তাহারা সততা ও মননশীলতার দিক হইতে উন্নত হইয়াছে। জনমানসে সুনীতি গাঁথিয়াছে বলিয়াই তাহারা উন্নতি লাভ করিয়াছে। অপর দিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষ এখনো অনেক ‘চালাক’। তাহারা মনে করে, ‘চালাক’ না হইলে টিকিয়া থাকা সম্ভব নহে। 

চালাক হওয়াটা দোষনীয় নহে। কিন্তু চালাকির সঙ্গে যখন অসততা জোট বাঁধে তখনই হয় সমস্যার শুরু। এই বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি গল্প স্মরণ করা যাইতে পারে। তৃতীয় বিশ্ব হইতে একজন চালাক কর্মী গিয়াছে উন্নত বিশ্বের একটি বৃহৎ দুগ্ধ খামারে কাজ করিতে। চালাক কর্মীটি একদিন তাহার দুগ্ধ খামারের মালিককে বলিলেন, ‘মহোদয়, আপনার মুনাফা ১০ শতাংশ বাড়িয়া যাইবে, যদি আপনি ১ লিটার দুধে ১০০ মিলিগ্রাম পানি মিশাইয়া দেন।’ মালিক শুনিয়া তাহাকে পত্রপাঠ ছাঁটাই করিয়া দেশে পাঠাইয়া দিলেন। কারণ, এই পরামর্শ হইল সোনার রাজহাঁসের পেট কাটিবার শামিল। সাময়িক লাভ বটে, ধরা পড়িলেই সকল সুনাম শেষ। আর সুনামই তো সবচাইতে বড় পুঁজি।

আমরা শৈশবে পড়ি বটে, ‘অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি’—কিন্তু ইহা যেন কেবল তোতাপাখির মতো মুখস্থ করিয়া পাশ করিবার জন্য। উন্নয়নশীল বিশ্বে কেহ যদি বলেন—অমুক লোকটি সৎ—তখন পালটা বলা হয়, কত টাকা পর্যন্ত তাহার সততার সীমা? কিংবা বলা হয়, লোকটি সুযোগের অভাবে সত্। অর্থাৎ সুযোগ পাইলে রাক্ষসের মতো অর্থ গিলিবে, চুরি করিবে। যেন সত্ হওয়াটা সোনার হরিণের মতোই অবাস্তব বিষয়। কেন এমন দুঃসহ মনস্তত্ত্ব এই জাতির মধ্যে গাঁথিয়া গেল? মনস্তত্ত্ববিদরা বলিয়া থাকেন, মানুষের মনোবিকাশে শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্ব অপরিসীম। যেই শিশু বা কিশোর দেখিতেছে যে তাহার পিতা অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়া অর্থের পাহাড় তৈরি করিতেছে, তাহার মধ্যে কী করিয়া নীতিবোধ তৈরি হইবে? অথচ আমাদের আদর্শলিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থসমূহে সত্ পথে চলিবার এবং চুরি না করিবার অসংখ্য নীতিবাক্য রহিয়াছে। দুর্নীতি কিংবা চুরি করা অর্থ তো হারাম। কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কোনো বস্তুকে হারাম মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে তাহার কবিরা গুনাহ হইবে। আবার যদি হারাম বস্তুকে হালাল মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে পরিণতি হইবে আরো ভয়াবহ। আখিরাতে সরাসরি জাহান্নাম। এই কথা জানা থাকিলে কাহারা এবং কেন চুরি ও দুর্নীতি করে? এই জন্যই প্রবাদে বলে, চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি।

সভ্য দেশের মানুষেরা মধ্যরাত্রে গাড়ি চালাইবার সময়েও ট্রাফিক সিগন্যাল মানিয়া চলেন, তাহাদের শিক্ষা ও বিবেকই তাহাদের আইনরক্ষক। দোকানে কেহ না থাকিলেও তাহারা দ্রব্য লইয়া যথোচিত মূল্য ফাঁকা কাউন্টারেই রাখিয়া আসেন। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে চুরির সুযোগ থাকিলে চুরি না করাটাই যেন বোকামি! কিন্তু প্রতিটি মানুষের মধ্যেই তো ‘বিবেক’ রহিয়াছে। চোরেরও তো একটি বিবেক আছে। খারাপ কাজ যে খারাপ—তাহা কী করিয়া বুঝা যাইবে? সহজ উত্তর হইল—নিজের বিবেকই বলিয়া দিবে। সুতরাং যে কোনো কাজ করিবার আগে প্রথম নিজের বিবেকের নিকট প্রশ্ন রাখিতে হইবে। শুনিতে হইবে নিজের বিবেক কী বলে। 

বিবেকের কথা সকলে শুনিতে পারে না, সকলে শুনিতে চাহে না। এই জন্য বিবেক জাগ্রত করিবার শিক্ষা শৈশব হইতে আমাদের ভিতরে প্রোথিত করিতে হইবে। জাতি হিসাবে আমাদের দৈন্য ঘুচাইতে হইলে সুনীতি ও সততার সংস্কৃতিকে ধারণ করিতেই হইবে। তাহা না হইলে আমরা কখনই উন্নত জাতিতে পরিণত হইতে পারিব না।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন