বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রবীণ বাড়ছে: তাদের নিয়ে এখনই ভাবতে হবে

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০০:৪১

গত ১৯০০ সাল থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাস অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে তা ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ ও বরফ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রের পানি প্রসারণের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ধরন ও পরিমাণে পরিবর্তন, ঋতু দীর্ঘায়িত হওয়া, চরম ঘটনা—যেমন সাইক্লোন সংঘটন সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার প্রভাবগুলো পরিবেশের ওপর পড়বে। চলতি বছরেও আমরা যুক্তরাষ্ট্রে দাবানল, ইউরোপের খরা অবস্থা; কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানের বন্যা; ব্রাজিলে ভূমিধস, ফিলিপাইনের ঝড়, আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাব দেখেছি। বিভিন্ন গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দাবদাহ, ঝড়, বন্যা, খরা, বৃষ্টিপাতে তারতম্য ইত্যাদির সঙ্গে সংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে যে, জলবায়ু দুর্যোগ ৫৮ শতাংশ পরিচিত মানবীয় প্যাথোজেনের প্রকোপ বৃদ্ধি করবে। জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন আনা ছাড়াও প্যাথোজেনিক রোগ বিস্তারে অনুঘটকের কাজও করবে। যেমন দাবদাহ ও বৃষ্টিপাতে পরিবর্তন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া; ঝড় ও বন্যা বিভিন্ন প্যাথোজেন (ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস) এবং আবাসস্থল ধ্বংস জুনোটিক রোগ বিস্তারে সহায়ক হবে, তাপ বৃদ্ধিতে কিডনি-পাথর রোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি।

জাতিসংঘের মতে, ১৫ নভেম্বর ২০২২ দিনটি মানবজাতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ এদিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অভূতপূর্ব বৈশ্বিক জনসংখ্যার এ বৃদ্ধি ঘটেছে মূলত জনস্বাস্থ্যের উন্নতি, পুষ্টি, উন্নত জীবনযাপন রীতি, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ওষুধের কারণে মানুষের গড় আয়ু বাড়ায়, বাংলাদেশও যার ব্যতিক্রম নয়। তবে কিছু দেশের বেলায় উচ্চ ও স্থির উর্বরতার অবদান আছে। যাহোক, আগামী ১৫ বছর পরে অর্থাৎ ২০৩৭ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা ৯০০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে বলে প্রক্ষেপণে বলা হচ্ছে। কাজেই বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কটি সাদা চোখে স্পষ্টতই দেখা যায় অর্থাৎ বেশি মানুষ বেশি অভিঘাত। আরো লক্ষণীয় যে, সাম্প্রতিক দশকগুলোয় বিশ্ব জনসংখ্যায় যে নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে তাতে বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ কোটি মানুষ ষাটোর্ধ্ব, ২০৫০ সাল নাগাদ ২০০ কোটি হবে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। উল্লেখ্য, সে বছরই মানব ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ষাটোর্ধ্ব বয়স্কদের সংখ্যা শিশুদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। জাতিসংঘ অনুযায়ী ১৯৫০-২০১০ সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রত্যাশিত আয়ু ৪৬ বছর থেকে ৬৮ বছরে উন্নিত হয়েছে, এ শতকের শেষে তা ৮১ বছরে ঠেকবে। বাংলাদেশের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ষাটোর্ধ্ব বয়সিদের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ—যা জাতীয় জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে এটা ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৫০ সালে দেশের প্রবীণ জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৩ কোটি ৬০ লাখে অর্থাৎ জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।

কাজেই আগামী দিনে আমাদের দেশেও প্রবীণ জনসংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সমাজে প্রবীণদের অবদানের স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছরের মতো গত ১ অক্টোবর জাতিসংঘ-ঘোষিত আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়েছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির মতো বাংলাদেশেও নারীর সংখ্যা বাড়ছে—এবারের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ৯৯ জন। এমন বাস্তবতায় প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য যথাযথ হয়েছে এবং আগামী দিনে করণীয় ঠিক করতে বিবেচনায় রাখতে সহায়ক হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে চরম সুখের সময় যৌবনকাল নাকি আবার ফিরে আসে ৭০ বা ৮০-র কোঠায়—এ কথাটা প্রচলিত হলেও এটাও সত্য যে, নানা ধরনের অসুখ প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত অবস্থাটা ভালো থাকতে দেয় না। কাজেই ব্যক্তিপর্যায়ে নিজে কিছু কলাকৌশল যেমন নিজের জীবনের মূল্য ও উদ্দেশ্য অনুধাবন, ব্যক্তিভেদে প্রতিদিন একটু পড়াশোনা, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখা—বিশেষত নগর জীবনে প্রযোজ্য, হাঁটাচলা বা সামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে একটু ভালো থাকা যেতে পারে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের কল্যাণে প্রাকৃতিক সবুজ (গাছপালা) ও নীল (পানি) অবদান রাখে বলে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে মূলত শিক্ষা, অর্থ, সমাজ বাস্তবতায় আমাদের দেশের প্রবীণ নারীগণকে পুরুষদের চেয়ে বেশি কষ্টকর জীবন যাপন করতে হয়, তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এমন উদাহরণও আছে যে, নিজের তো বটেই, সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিদের ভরণপোষণ করতে হয় তাদের। উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ অতিমারি প্রবীণ বিশেষত প্রবীণাদের জীবনে আর্থসামাজিক, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত বিরাজমান বৈষম্যকে বিশ্বব্যাপী আরো অবনতির দিকে নিয়ে গেছে। আরো দুঃখজনক যে, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দেশের প্রভূত উন্নতি হলেও নানা কারণে সামাজিক অবক্ষয়ও প্রকট হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থার কারণে পরিবারে তথা সমাজে প্রতিযোগিতায় সর্বজনীন মনোবৃত্তি, সীমাহীন চাহিদা, পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য, হারিয়ে যাওয়া বিনোদন ও আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতার অপব্যবহারে সমাজকেন্দ্রিকতার বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, মনোবৈকল্য ইত্যাদি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বার্ধক্যের হাত থেকে বাঁচার সাধ্য নেই জেনেও আজকের নবীন আগামীর প্রবীণ—এ সত্যটা অনুধাবন না করে আমাদের দেশে অনেক প্রবীণ তাদের সন্তান দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন—মূলত সম্পত্তির লোভে, পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব এড়ানো ইত্যাদি কারণে। আরেকটি সমস্যা হলো একাকিত্ব, যা গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে নগরাঞ্চলে বেশি। বৈশ্বিক এ সমস্যাটি আমাদের দেশের বয়স্কদের বেলায়ও আছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণের জন্য অভিবাসনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রবীণদের কাছে কেউ থাকবে না। 

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পর্যায়ে দিতে হবে, ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে—তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ফল পাওয়া যাবে। আমাদের মনোজগতে ধারণ করতে হবে যে, আরো বেশি মানুষ আরো বেশি দিন বাঁচবে। আমাদের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ ও পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিধি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া চলছে—সবগুলোই তাত্পর্যপূর্ণ ও অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রবীণদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বিদ্যমান পরিধি ও সামর্থ্য বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রবীণগণের ভালো থাকায় ব্যক্তির, পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের—সবারই দায়িত্ব আছে। ভবিষ্যতে প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা ও পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকায় প্রবীণদের জীবনকে স্বস্তিদায়ক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নিরাপদ করতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নে সচেষ্ট হতে হবে। এজন্য আমাদের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা ও নারীদের অবস্থান, প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার বাড়তি কিন্তু জরুরি চাহিদা পূরণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও লৈঙ্গিক অসাম্যকে বিবেচনায় রাখতে হবে। বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক চিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্ভূত রোগে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত ও স্থায়ী ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে।

তদুপরি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিধি আরো বাড়াতে হবে। প্রবীণদের প্রতি দায়িত্বের ব্যাপারে আমাদের সমাজ এখনো যথেষ্ট সচেতন নয় বলে তাদের প্রতি পরিবারের ও সমাজের দায়িত্বের কথাগুলো বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। কারণ বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে শুধু সরকারি পদক্ষেপসমূহ পুরোপুরি সফল হবে না। যেহেতু আগামী দিনে প্রবীণগণ দেশের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ হবেন, তাই বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সমাজ তথা দেশের কাজে লাগানোর সম্ভাবনাকেও ভেবে দেখা যেতে পারে।

লেখক : প্রবীণ নাগরিক এবং ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষক

 

ইত্তেফাক/ইআ