শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চমেকে এমআরআই ব্র্যাকিথেরাপি ও ক্যাথল্যাব মেশিন অচল, জটিল রোগীরা সেবাবঞ্চিত

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০২:২৩

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দীর্ঘদিন যাবৎ অচল রয়েছে রোগ নির্ণয়ের এমআরআই, ব্র্যাকিথেরাপি ও ক্যাথল্যাব মেশিন। মূল্যবান ও অতিপ্রয়োজনীয় এসব চিকিৎসা উপকরণ মেরামত হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসেই একবার করে তাগাদা দিলেও কোনো সুফল মিলছে না। এতে রোগীরা সরকারি কম খরচে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের এমআরআই মেশিনটিও গত প্রায় পাঁচ বছর যাবত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা উপকরণের অচলাবস্থায় রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় ২০১৬ সালে মেশিনটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকায় কেনা হয়। গত ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট রেডিওলজি বিভাগে এমআরআই মেশিনটি বসানো হয়। মেশিনটির ওয়ারেন্টি মেয়াদ ছিল তিন বছর। ফলে গত ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে গত ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর মেশিনটিতে ত্রুটি দেখা দিলে সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেশিনটি মেরামতের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেডকে জানালে তারা মেরামতের জন্য ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাহিদাপত্র পাঠায়। পরে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে মেডিটেল কোম্পানি মেশিনটি মেরামত করে।

২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নিরবচ্ছিন্ন সেবা পেতে সিএমসি করার জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয় বার চিঠি দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক বছরের সিএমসি বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার ডলার দাবি করে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২১ সালের ২৪ এপ্রিল মেশিনটিতে আবার ত্রুটি দেখা দেয়। মেরামতের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়। তারা এসে দেখতে পায় মেশিনের ম্যাগনেটের প্রেশার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে যন্ত্রটি সচল রাখার জন্য যন্ত্রাংশটির রিপ্লেসমেন্ট করা প্রয়োজন। যন্ত্রাংশটির বাজারমূল্য ছিল ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। তখনো মেশিনটি চালু ছিল, রোগীদের সেবা দেওয়া যেত। কিন্তু গত মে মাস থেকে এমআরআই মেশিনটির সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া চমেক হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ক্যাথল্যাব মেশিনটি  গত ২০২১ সালের  ডিসেম্বর থেকে অচল অবস্থায় রয়েছে। এই মেশিনে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের এনজিওগ্রাম করা হয়। গত ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট ক্যাথল্যাব মেশিনটি বসানো হয়েছে। এটি মেরামত করতে ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এর পর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেশিনটি মেরামতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একাধিক বার চিঠি দিয়েছে, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে রেডিওথেরাপি বিভাগের ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনটি গত ১৪ জুন থেকে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এটি দিয়ে নারীদের জরায়ুর ক্যানসারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব প্রকৌশলীরা মেশিনটি চালু করতে চেষ্টা করলেও মেশিনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ না থাকায় সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে মেশিনটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করা হয়। এর জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, জার্মানি থেকে একসঙ্গে পাঁচটি মেশিন কেনা হয়েছিল। তার মধ্যে তিনটি মেশিনের ৩০ শতাংশ টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। বাকি টাকা পরিশোধ করা না হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেশিনগুলোর ওয়ারেন্টি সার্ভিস প্রদান ও মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে। ফলে এখন মেশিনটি অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান ইত্তেফাককে বলেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ তিন চিকিৎসা উপকরণে সেবা বন্ধ রয়েছে। কার্ডিওলজি বিভাগের দুটি ক্যাথল্যাব মেশিনের মধ্যে একটি অচল হয়ে পড়েছে। এমআরআই ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনও অচল অবস্থায় রয়েছে। আমরা মেশিনগুলো মেরামতের জন্য একাধিক বার চিঠি দিয়েছি। নানা জটিলতায় মেরামত প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।’

চমেক হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে রোগীর চাপ কয়েক গুণ বাড়লেও সেবার পরিধি বাড়েনি। টেকনিশিয়ানের সংকটে তিন শিফটে সেবা চালু রাখা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের চড়া দামে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। চমেক হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করানোর জন্য আলাদা রেডিওলজি বিভাগ রয়েছে। এখানে শুরুতে যেসব চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, বর্তমান চাহিদার তুলনায় পরিধি বাড়েনি। বিদ্যমান উপকরণগুলো মাঝেমধ্যে অচল হয়ে পড়লে রোগীদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়। কয়েক মাস লেগে যায় মেশিন সচল করতে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে এই বিভাগে চিকিৎসা উপকরণের মধ্যে রয়েছে একটি এমআরআই মেশিন, একটি সিটি স্ক্যান, চারটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, ছয়টি এক্সরে মেশিন, একটি ওপিজি মেশিন, একটি মেমোথেরাপি মেশিন। এর মধ্যে একমাত্র এমআরআই মেশিনটি গত মে মাস থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে এমআরআই মেশিনটি গত দেড় বছর যাবত নষ্ট অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন অচল থাকায় মেশিনের অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হতে চলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২০১৫ সালে এমআরআই মেশিনটি বসানো হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বসানোর পর তিন-চার বছর বছর মেশিনটির মাধ্যমে রোগীরা সেবা পেয়েছে। এরপর থেকে প্রায় সময় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। চায়না মেশিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিন বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। এই সময়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে মেরামত করে দেওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাদের সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। জানা যায়, এ ধরনের একটি এমআরআই মেশিনের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন অচল থাকায় মেশিনটির অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসকেরা জানান, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম মেরামতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে। ঢাকার বাইরে তাদের কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় নেই। ফলে ভারী মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তাদের বেসরকারি সার্ভিস সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। মাসের পর মাস মেরামতের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়।

 

ইত্তেফাক/ইআ