বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রাচীর ভেঙে ভালো কিছুর  জন্ম হোক আবার

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০৩

এক টুকরো জীবন, অথচ এই জীবনের কত আয়োজন। এই আয়োজনের পেছনে ছুটতে ছুটতে চেনা মানুষটাই একদিন অচেনা হয়ে যায়। খুব আপন মানুষটা কেমন করে যেন ধীরে ধীরে পর হয়ে যায়। তার পরও সত্যকে মিথ্যা করে হলেও মেনে নিতে হয়। পৃথিবীর নিয়মটাই যে এমন। যত দূর চোখ যায়, তত দূর প্রাচীরের পর প্রাচীর দেখা যায়। কখনো সেটা স্বার্থের প্রাচীর হয়, কখনো লোভের প্রাচীর, কখনো সেটা ক্ষমতার প্রাচীর হয়, আবার কখনো হয় অভিনয়ের প্রাচীর। যেখানে সম্পর্কের চেয়ে স্বার্থের মূল্য বেশি, যেখানে জীবনের চেয়ে ধ্বংসের মূল্য বেশি, সেখানে মাটির গভীরে শিকড় প্রবেশ করানো মহাবৃক্ষের চেয়ে আগাছার দাম অনেক বেশি। সেখানে পরগাছা আরো মূল্যবান, পরজীবীরা মহামূল্যবান। কোনো দর্শনতত্ত্বের গভীর জ্ঞানের কথা নয়, এগুলো বরং জীবনের ছোট ছোট চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া সুখ-দুঃখের মতো জলছবি। 

নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী কিপ থর্ন বলছেন, ‘আমি এখন কবিতা নিয়ে আছি। কবিতার বই লিখছি। এখন বিজ্ঞানের চেয়ে কবিতা লেখা অনেক কঠিন মনে হয়। তাই কবিতার জন্য সময় দিতে গিয়ে অবসর পাওয়া যায় না। আর এই ব্যস্ততাই আমি বেশি উপভোগ করি। প্রায় ৫০ বছর ধরে পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন কঠিন সব গবেষণা আমি ভালোবেসে করে গেছি। এবার কবিতা লেখার নতুন চ্যালেঞ্জে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ পাচ্ছি। এই কাজে নতুন বলে সব খুব কঠিন লাগছে। কঠিনকেই তো ভালোবাসি, এতেই আমার আনন্দ।’

মৌলিক ভাবনা হচ্ছে, সব ধরনের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের নতুন ভাবনার জন্ম দেওয়ার শক্তি। মানুষের মধ্যে মৌলিক ভাবনাচর্চার সুযোগ তৈরি করা দরকার। মৌলিক ভাবনা থেকে নতুন সৃষ্টির ধারণা তৈরি হয়, সভ্যতার বিকাশে যার ভূমিকা অনন্য। সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন প্লেটো, প্লেটোর ছাত্র ছিলেন অ্যারিস্টটল, অ্যারিস্টটলের ছাত্র ছিলেন থিওফ্রাস্টাস ও আলেকজান্ডার। এদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না, অথচ তাদের ভাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। সক্রেটিস প্লেটোকে তার মতো করে ভাবতে বলেননি, প্লেটো অ্যারিস্টটলকে তার মতো করে ভাবতে বলেননি, অ্যারিস্টটল থিওফ্রাস্টাস ও আলেকজান্ডারকে তার মতো করে ভাবতে বলেননি বরং গ্রিক শিক্ষকেরা তাদের ছাত্রদের নিজের মতো করে ভাবতে শিখিয়েছেন। অদ্ভুত একটা বিষয় এখানে রয়েছে, অ্যারিস্টটলকে জীববিজ্ঞানের জনক বলা হলেও থিওফ্রাস্টাসকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, জীববিজ্ঞানের দুটি শাখা যদি প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যা হয়, তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনকও অ্যারিস্টটলের হওয়াটা যৌক্তিক। তাহলে এমনটা না ঘটার পেছনের ভাবনাটা কী? বাস্তবতা হচ্ছে, অ্যারিস্টটল যখন জীববিজ্ঞানের জনক হিসেবে স্বীকৃত হন, তখন উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে, মানুষ তা জানত না। কেবল প্রাণিবিদ্যার গবেষণাকে বিবেচনায় এনে অ্যারিস্টটলকে জীববিদ্যার জনক বলা হয়। ভাবনার বৈচিত্র্য এখানেই, যেখানে অ্যারিস্টটল শিক্ষক হিসেবে প্রাণিবিদ্যা নিয়ে ভেবেছেন, সেখানে তার ছাত্র হয়েও থিওফ্রাস্টাস উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে ভেবেছেন। উদ্ভিদ নিয়ে তখন যেটা মানুষ পারেনি, তার অনেক বছর পর মানুষ সেটা পেরেছে। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে যে মানুষটা গবেষণা করছিলেন, সেই মানুষটা কেমন করে যেন উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণায় নিজেকে জড়িয়ে ফেললেন। বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু প্রমাণ করলেন উদ্ভিদের প্রাণ আছে। ১৯১৪ সালে তিনি লজ্জাবতী ও বনচাঁড়াল গাছ নিয়ে ইংল্যান্ডে গেলেন। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ রয়েল সোসাইটিতে তার আবিষ্কৃত ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি দেখালেন জীবদেহের মতো উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, তারাও যে কোনো ধরনের উত্তেজনায় সাড়া দেয়। জগদীশচন্দ্র বসুর উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা। তাদের ভাবনার জায়গাটা জগদীশচন্দ্র বসু গড়ে দিলেও তারা ভেবেছেন তাদের মতো করে। 

শিক্ষকের সফলতা এখানেই, যেখানে ছাত্ররা তাদের শিক্ষকদের মতো ভাববে না, বরং তাদের নতুন ভাবনার জন্ম দিয়ে মৌলিক চিন্তার উন্মেষ ঘটাবে। সব মহান শিক্ষকই চান তার ছাত্ররা তাকে সব ক্ষেত্রেই ছাড়িয়ে যাবে। ছাত্র যখন শিক্ষকের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন সেটি শিক্ষকের গর্বের বস্তুতে পরিণত হয়। আজকের বাণিজ্যিক দুনিয়ায় এই মহামূল্যবান সত্যটি হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ একটাই, স্বার্থের ক্ষেত্রে কেউ কাউকে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নয়। 

সন্তানের মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনে কতটা লড়াই তাকে করতে হয়েছে, হয়তো সেটা কাউকে বুঝতেও দেননি তিনি। আড়ালে-আবডালে কখনো কখনো না পারার যন্ত্রণা হয়তো তাকে কাঁদিয়েছে, সেটা হয়তো সংসারের কাউকে জানতেই দেননি। কেঁদেছেন একা একা, হেসেছেন সবার সঙ্গে। 

স্বার্থের পৃথিবীতে দাসত্বের কদর বাড়ছে। সব দাসত্ব দৃশ্যমান নয়, বেশির ভাগ দাসত্ব চোখে দেখা যায় না। দাসত্ব মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়। মানুষের স্বকীয়তা ও ব্যক্তিত্বকে ভেঙে দেয়। তখন মানুষের চারপাশে অনেক প্রাচীর তৈরি হয়, বন্দি হয় মানুষ। মানুষকে দাসত্ব চিনতে হবে। মানুষকে তার নিজের শক্তির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। তবেই প্রাচীর পেরিয়ে পেরিয়ে মানুষ তার ইতিবাচক লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

এক টুকরো জীবনে এত আয়োজন যখন, হয়তো সবকিছুর মধ্যেই বিদ্যমান, তার পরও ভালোমন্দ বিচার মানুষকেই করতে হয়। যদি এই আয়োজনে প্রাচীর ভেঙে ভেঙে ভালো কিছু জন্ম নেয়, তবে সেটাই মানুষের শক্তি হয়। এর বিপরীত কিছু ঘটলেই মানুষ সবকিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলে। ভোগবাদিতার এত আয়োজন অর্থহীন। সৃষ্টিশীলতার আয়োজন যত বেশি হবে, মানুষের জীবন তত অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে ।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও লেখক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন