রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আধুনিক বিশ্বে বিশ্বকাপের রাজনীতি

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০১:২৮

কাতারে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ দেখছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। এই বিশ্বকাপ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্রীড়া উৎসব। কিন্তু এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও একটি রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। আধুনিক বিশ্বকে রূপদানকারী নৈতিক, ব্যাবসায়িক ও ভূরাজনৈতিক শাঁখের করাতগুলো তুলে ধরেছে।

এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টটি মাঠের বাইরে আরো বেশি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রিভিউ) পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, তা ফুটবল-ভক্তদের আরো ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। রূপান্তরকামীদের সমর্থনে ইউরোপীয় ফুটবল দলগুলোর আদেশ ফিফার বাতিল করে দেওয়া, নারী দর্শকদের অধিকারে হস্তক্ষেপ, মরুভূমিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম তৈরিতে অভিবাসী কর্মীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অ্যালকোহলের প্রাপ্যতা নিয়ে বিতর্কগুলো দেখা দেয় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেভাগেই। ফুটবল একটি সুন্দর খেলা। বলা হচ্ছে, এই খেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই এমন একটি দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়েছে কেবল তেলসম্পদের কথা বিবেচনা করে। গত মঙ্গলবার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সৌদি আরব বিস্ময়করভাবে জয়লাভ করেছে। ফিফা এখন আশা করবে বিশ্বকাপের রাজনীতি পরিণত হবে সাইড শোতে। এমনকি এতে নিজেদের দলের খেলা দেখা নিয়ে দর্শক নৈতিকভাবে বিরোধে জড়িয়ে পড়বে।

গত মঙ্গলবার ‘ওয়ানলাভ আর্মব্যান্ড’ পরা রূপান্তরকামী খেলোয়াড়দের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ফুটবল অনুরাগী এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের সমালোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে। ব্লিংকেন মঙ্গলবার দোহায় কাতারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ফুটবল হলো সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়গুলোর একটি। ফুটবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে। তবে যখন আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কোনো বিধিনিষেধ দেখি, তখন এটা আমার দৃষ্টিকোণ থেকে সব সময়ই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যখন বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিষয় নিয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়। আমার মতে, অন্তত ফুটবল মাঠে কাউকে এই মূল্যবোধ সমর্থন করা এবং তাদের দলের হয়ে খেলার মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়।’

মার্কিন মহিলা জাতীয় দলের অবসরপ্রাপ্ত বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক ব্রায়ানা স্করি মঙ্গলবার সিএনএনের ‘নিউজরুম’কে বলেছেন, ফিফা বিশ্বকাপের ভেন্যু বেছে নিয়ে এই রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন দেশ নির্বাচন করেন, আপনি তখন ফলাফলও চয়ন করেন।’

বিশ্বকাপ এমন একটি ঘটনা, যেখানে বিশ্বদ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করতে পারে। যেমন—গত সোমবার ইরানের খেলোয়াড়েরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী খেলায় তাদের জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মাধ্যমে তারা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে ভিন্নমতের মানুষদের বিক্ষোভ দমনে সরকার যে সহিংস পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট আয়োজনে একটি সামন্তরিক ভূরাজনৈতিক প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি এমন এক সময়ে আয়োজন করা হয়েছে, যখন পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থা একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যখন পুরোনো বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো কেঁপে উঠছে। ফলে উপসাগরের অতিধনী তেল ও গ্যাস জায়ান্টদের একটি ছোট্ট দল কীভাবে তাদের ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর কাতারে শামিল হতে পারে এবং পর্যটন, বিনোদন ও খেলাধুলার উত্তরাধিকার তৈরি করতে পারে, কাতার বিশ্বকাপ হলো এখন পর্যন্ত তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যখন তাদের জ্বালানিশক্তির মজুত শেষ হয়ে আসছে, তখন তারা কীভাবে টিকে থাকতে হয় তা ভালো করেই জানে। এজন্য প্রয়োজনে তারা উদারনৈতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করতেও প্রস্তুত। এই টুর্নামেন্ট পশ্চিমা দেশের ক্রীড়া দল ও লিগ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের মূল্যবোধের জন্য হুমকি হলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত নগদ অর্থের একটি অংশ দখল করার জন্য একটি পরীক্ষামূলক ঘটনাও বটে।

পশ্চিম ইউরোপের রাজধানী থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও চীনের নতুন কেন্দ্রস্থলে এই বিশ্বকাপ ফুটবল ক্ষমতার বৈশ্বিক পরিবর্তন, বিশেষ করে আর্থিক পেশিশক্তির প্রতিফলন ঘটিয়েছে। বিপুল বৈশ্বিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফুটবল বিশ্ব একটি বাঁক নিচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী শ্রমিক শ্রেণির ফুটবল ক্লাবগুলো কয়েক দশক ধরে তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে উঠে এখন হঠাৎ নিজেদের বিদেশি জ্বালানি ম্যাগনেটদের মালিকানাধীন হিসেবে খুঁজে পাচ্ছে। প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ম্যানচেস্টার সিটিকে কিনে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপ। এবং নিউক্যাসল ইউনাইটেড সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের মালিকানাধীন।

এই বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পেছনে ফুটবলই একমাত্র খেলা নয়। দ্রুত এবং ক্ষিপ্রগতির আইপিএল ক্রিকেট লিগের জন্য ভারতে কয়েক মিলিয়ন দর্শক তৈরি হয়েছে। এটি ক্রিকেট খেলায় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ক্ষমতার ভারসাম্যকে সরিয়ে দিয়েছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ফিল মিকেলসন ও ডাস্টিন জনসনের মতো গল্ফ তারকাদের ব্যাপক বেতনের প্রণোদনা দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিজিএ সফরের আধিপত্য ভাঙার চেষ্টা করছে। ঘটনাটি ‘স্পোর্টস ওয়াশিং’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে একটি কর্তৃত্ববাদী জাতির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া তারকাদের আকৃষ্ট করে তারা তাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চায়। চীন তার ২০০৮ ও ২০২২ গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অলিম্পিকের সঙ্গে এমন একটি এজেন্ডার জন্য অভিযুক্ত হয়, যেখানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত তার দমনমূলক শাসনের কারণে ব্যর্থ হয়।

দুর্নীতির দাবি ও রাজনৈতিক বিতর্ক কাতারের বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের মুহূর্তকে ছাপিয়ে গেছে। ২০১৮ সালে পূর্বসূরি রাশিয়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ করেছে যে, দুটি ইভেন্ট বরাদ্দ করার ক্ষেত্রে শীর্ষ বিশ্ব ফুটবল কর্মকর্তারা ঘুষ গ্রহণ করেছিলেন। রাশিয়া ও কাতারের কর্মকর্তারা জোরালোভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত বছর ডিওজে খেলাধুলার অন্য বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রকদের ২০১ মিলিয়ন ডলার প্রদান করে ফুটবল দুর্নীতির ছয় বছরের তদন্ত শেষ করেছে। কিন্তু নতুন বিতর্কগুলো কাতার বিশ্বকাপ-২০২২কে বিপর্যস্ত করেছে এবং ফিফাকে আরো বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। এর মধ্যে স্টেডিয়াম নির্মাণকারী অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্দশাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাতারে দক্ষিণ এশীয় কর্মীদের মধ্যে নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট তার সর্বশেষ মানবাধিকার প্রতিবেদনে কাতারে চলমান বেআইনি জোরপূর্বক শ্রমের উল্লেখ রয়েছে।

ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ওয়েলস ‘ওয়ানলাভ’ ক্যাম্পেইনে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তাদের গভর্নিং অ্যাসোসিয়েশনগুলো ফিফাকে সম্ভাব্য হলুদ কার্ডসহ খেলোয়াড়দের ওপর ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে।

একটি বিশ্বব্যাপী ক্রীড়া ইভেন্টের জন্য রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত পরিবেশে উদ্ভাসিত হওয়া নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন ক্রীড়াবিদ জেসি ওয়েনস ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে নাসি মাস্টার রেসের অ্যাডলফ হিটলারের দাবিকে খাটো করে দিয়েছিলেন। ১৯৬৮ মেক্সিকো অলিম্পিকে মার্কিন ট্র্যাক তারকা টমি স্মিথ এবং জন কার্লোস মেডেল পডিয়াম থেকে ব্ল্যাক পাওয়ার স্যালুটসহ নাগরিক অধিকারের প্রচার করেছিলেন। মোহাম্মদ আলি একজন জাতিগত ও রাজনৈতিক আইকনের পাশাপাশি একজন বক্সারও ছিলেন। ১৯৮০ মস্কো এবং ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের কারণে বয়কটের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্রীড়াবিদেরা তাদের সরকারের চেয়ে উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ডে অধিষ্ঠিত হতে পারে—এই ধারণাও গল্ফের বর্তমান দ্বন্দ্বের মূল কারণ। পৃথিবী যে বদলে গেছে, এই টুর্নামেন্টও দেখাবে অন্যভাবে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হওয়া এবং তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকা সত্ত্বেও খেলাধুলা সমর্থক প্রভাবশালী দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কসরত করে যাচ্ছে। তবে আগামী ফুটবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট মার্কিন অভিবাসী ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে দখল রয়েছে, সেই পরিস্থিতি তুলে ধরবে। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জনসংখ্যা।

যখন থেকে খেলাধুলা বিশ্বব্যাপী চলে এসেছে, এটি সর্বদা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রবণতা ও দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে আসছে, রাজনীতি থেকে নিরাপদ স্থানে থাকার জন্য বিশুদ্ধবাদীদের আহ্বান সত্ত্বেও। সুতরাং এটি একটি ভালো বাজি যে ফুটবল সার্কাস যখন ২০২৬ সালে এসব দেশে আসবে, তখন মাঠের বাইরে কিছু নতুন বিতর্ক মনোযোগ আকর্ষণে খেলার স্কোরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে।

লেখক: সিএনএনের হোয়াইট হাউজ রিপোর্টার

সিএনএন থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন