বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কেবল বাহিরের শত্রু নহে, চিনিতে হইবে ঘরের শত্রুকেও

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০২:০৫

দেশে পুনরায় অস্থিরতা দেখা দিতেছে। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলিয়াছেন যে, আগামী ১০ ডিসেম্বর বিরোধীপক্ষ গণজমায়েতের নামে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাহা প্রতিহত করিবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলিয়াছেন যে, বিএনপির উদ্দেশ্য ভালো নহে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তাহারা ময়দান ছাড়িয়া নয়াপল্টনের রাস্তায় সমাবেশ করিতে চাহে। তাহাদের কথা স্পষ্ট যে, কাহারা সরকারি দলের শত্রু। এই বাহিরের শত্রু সহজেই চিহ্নিত হইতেছে সরকারি দলের বিভিন্ন নেতাকর্মীর বিভিন্ন ভাষ্যে। কিন্তু শত্রু কি কেবল বাহিরেই রহিয়াছে? ভিতরে শত্রু নাই?

প্রকৃত অর্থে, বাহিরের শক্তি মোকাবিলা করা সহজ কিন্তু ভিতরের শত্রু মোকাবিলা করা সবচাইতে কঠিন। কারণ, বাহিরের শত্রুকে সহজেই চিনা যায়, কিন্তু ভিতরের শত্রুকে চেনা যায় না সহজে। আমরা দেখিতেছি, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল একসময় যাহাদের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন আন্দোলন ও আত্মত্যাগ করিয়াছে, সেই স্বাধীনতাবিরোধীরাই আজ তাহাদের দলের অন্দরে সুচ হইয়া অনুপ্রবেশ করিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ইহারা কখননোই আওয়ামী লীগের ছিল না। সেই জন্য ইহারা নির্দ্বিধায় করিয়া চলিতেছে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম। ক্ষমতার মদমত্তে ইহারা জেলা-উপজেলা কিংবা থানা পর্যায়েও নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী প্রশাসনকে পরিচালিত করিতেছে। আমরা অতীতে বিভিন্ন সময় বলিয়াছি, সরকারি দল যেন জগাখিচুড়ি হইয়া গিয়াছে। বলা হইয়া থাকে, দেশ স্বাধীন হইয়াছে, সকলে মিলিয়াই দেশ গড়িতে হইবে। ভালো কথা। কিন্তু যাহারা এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল, যাহারা কখনোই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নহে, তাহারা যদি অর্থের বিনিময়ে বড় বড় পদ-পদবি দখল করাসহ প্রশাসনের ভিতরে প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী হইয়া পড়ে—তাহা হইলে বিপদের আর কী বাকি রহিবে? মনে রাখিতে হইবে, স্বাধীনতাবিরোধীরা চিরকালই স্বাধীনতাবিরোধী। আমরা দেখিয়াছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যাহারা হিটলারের দোসর ছিল, নািসর পক্ষে সামান্যতম ভূমিকা রাখিয়াছিল, তাহাদের এখনো ধরিয়া ধরিয়া বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২০১৮ সালে জার্মানির সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৎসি স তত্পরতার সহিত জড়িত ৮৯ বৎসর বয়স্ক এক বৃদ্ধাকে গ্রেফতার করিয়া বিচারের মুখোমুখি করিয়াছে জার্মানি। অপর দিকে ৯৪ বত্সরের এক বৃদ্ধ নৎসিসদের পক্ষে প্রহরী ছিল মাত্র, যুদ্ধ শেষ হইবার ৭৩ বৎসর পর এই বয়সেও জার্মানিতে বিচারের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল তাহাকে।

পলাশী যুদ্ধের ক্ষেত্রেও আমরা দেখিয়াছি, সবচাইতে বেশি ষড়যন্ত্র হয় ঘরের ভিতর হইতেই। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্য পরিচালনার ভার ছিল মির জাফর, রায়দুর্লভদের উপর। তাহারা চরম মুহূর্তে সৈন্য পরিচালনা হইতে বিরত থাকেন। বীর মিরমদনের মৃত্যুর পরও মোহনলাল ও সিনফ্রে যখন ইংরেজদের কাবু করিয়া ফেলিয়াছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মির জাফর যুদ্ধ বন্ধ করিবার আদেশ দেন। নবাব যুদ্ধে হারিয়া যান এবং তাহাকে একপর্যায়ে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হইতে হয়। ইহা ইতিহাস। ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে এই ধরনের ষড়যন্ত্রের কাহিনি আমরা দেখিতে পাই। বঙ্গবন্ধুও একই ভুল করিয়াছিলেন শত্রুমিত্র না চিনিয়া। এই ব্যাপারে কিছুদিন পূর্বে প্রয়াত প্রথিতযশা সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলিয়াছিলেন—বঙ্গবন্ধুর সময়ে তিনি লন্ডনে ছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া দেখেন বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্য সচিব হইয়াছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার ছিলেন। আরেক বার দেখেন, কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তাহার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করিয়াছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দিয়াছেন—যিনি কিনা পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম প্রবীণ একনিষ্ঠ হিতাকাঙ্ক্ষী। তিনিই এক সাক্ষাত্কারে বলিয়াছেন, আওয়ামী লীগে কত রাজাকার আছে। বিপদের সময় ইহারা ভয়ানকভাবে আসে। তাহারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম বেশি বলে।

সুতরাং আওয়ামী লীগকে সর্বাগ্রে ঘরের দিকে তাকাইতে হইবে। চিনিতে হইবে শত্রু-মিত্র।

 


 

 

 


    

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন