সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বন্ধ হউক নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১৪:৪৮

সারা বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়িয়া চলিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র দ্বারা নারী নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হইতেছে। ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোর-জবরদস্তি, কন্যাশিশু হত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, অনার কিলিং, যৌতুক, অপহরণপূর্বক বিবাহ, যৌন দাসত্ব, পাচার প্রভৃতি হইল নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন রূপ ও ধরন। তবে ইদানীংকালে পৃথিবীব্যাপী নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা মারাত্মক আকার ধারণ করিয়াছে। আর ইহাই অধিক শঙ্কা ও দুশ্চিন্তার কারণ। কেননা নারী যদি পরিবারেই নিরাপদ না থাকে, তাহলে মানবসভ্যতা টিকিয়া থাকিবে কীভাবে?

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে, ২০২১ সালে বিশ্বে ৪৫ হাজার নারী খুন হইয়াছেন তাহাদের সঙ্গী বা পরিবারের মানুষের হাতে। ইহা মোট খুন হওয়া নারীর ৫৬ শতাংশ। অর্থাত্ নারীরা আজ ঘরেই বেশি অনিরাপদ। জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম ও ইউএন উইমেনের মতে, বিশ্বে প্রতি ঘণ্টায় পরিবারের একজন সদস্যের হাতে খুন হইতেছে পাঁচ জনের বেশি নারী। অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় এশিয়ায় নারীরা অধিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় পরিবারের মানুষদের হাতে নারী হত্যার সংখ্যা কমিয়াছে যথাক্রমে ১৯ ও ৬ শতাংশ। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ক্রমবর্ধমান। কোভিড লকডাউনের সময় নারীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়া যায়। নারীর প্রতি পারিবারিক এই সহিংসতার কারণ বহুবিধ। যেমন—অধিকারপ্রাপ্তির বোধ, উচ্চস্থান বা মর্যাদার বোধ, নারীবিদ্বেষ, কুসংস্কার, প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। জাতিসংঘের ডিকলারেশন অব ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন-এ বলা হইয়াছে—নারীর প্রতি সহিংসতা হইতেছে নারীর বিরুদ্ধে নারী ও পুরুষের মধ্যকার ঐতিহাসিক অসম ক্ষমতা সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। ইহা ছাড়া গবেষণায় দেখা যায়, একটি দেশের লিঙ্গসমতার স্তর ও পারিবারিক সহিংসতার হারের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ ও তাত্পর্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক রহিয়াছে। লিঙ্গসমতা কম থাকা দেশগুলিতে পারিবারিক সহিংসতার হার অনেক বেশি। অনেক সময় এই নির্যাতনকে এক প্রকার অধিকার, গ্রহণযোগ্য, ন্যায়সংগত ও ক্ষমাযোগ্য বিষয় মনে করা হয়—যাহা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা বিচ্ছিন্নতা, নির্যাতনকারীর সঙ্গে যন্ত্রণাদায়ক বন্ধন, সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা, আর্থিক সংস্থান, ভয়, লজ্জা ও বাচ্চাদের সুরক্ষা ইত্যাদির কথা ভাবিতে গিয়া বংশানুক্রমে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হইতেই থাকেন এবং একসময় তাহাদের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় বা তাহারা খুনখারাবির শিকার পর্যন্ত হন।

জ্যাক অ্যাশলের যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার সময় ১৯৭৩ সালে প্রথম ফ্যামিলি ভায়োলেন্স বা ‘পারিবারিক সহিংসতা’ শব্দ ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দূরীকরণের ঘোষণাপত্রে ইহাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। উনিশ শতকে রাজনৈতিক আন্দোলন ও নারীবাদী আন্দোলনের কারণে ১৮৫০ সালে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে আইন করিয়া স্ত্রীকে প্রহার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৮৭০-এর দশকের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ আদালত স্ত্রীদের শারীরিকভাবে শাসন করিবার স্বামীদের চিরায়ত অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৭৮ সালে যুক্তরাজ্যে বৈবাহিক কারণসংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে নারীদের অত্যাচারী স্বামীর নিকট হইতে আইনি বিচ্ছেদ দাবি করিবার সুযোগ প্রদান করা হয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এখনো নারীর প্রতি কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় নাই দুঃখজনকভাবে।

আমরা বহুলভাবে উচ্চারণ করিয়া থাকি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন—‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ কিন্তু বাস্তবে সমাজ-সংসার ও সভ্যতায় নারীর অবদানকে আমরা তেমন একটা স্বীকার করি না। এই জন্য বাংলাদেশে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা বন্ধে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন জরুরি। সারা বিশ্বে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ হউক, ইহাই আমাদের একান্ত কামনা। এই জন্য সকল দেশকে কাজ করিয়া যাইতে হইবে ঐক্যবদ্ধভাবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন