শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সরকারি চাকুরে

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০৮:৩৯

সরকারি চাকরিতে আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ চাকরির নিশ্চয়তা। এটা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নেই। কারণ, বেসরকারি খাতে সহজেই চাকরিচ্যুত করা যায়। কিন্তু সরকারি চাকরি সহজে যায় না। সামাজিক স্বীকৃতিও অন্যতম একটা বড় কারণ। এছাড়া রয়েছে ক্ষমতাচর্চা বা ব্যবহারের সুযোগ। একজন সরকারি কর্মচারী ক্ষমতাচর্চা করতে পারেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে একজন সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তিও ক্ষমতাচর্চা করতে পারেন না।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি একধরনের মোহ লক্ষ করা যায়। ২০-২৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে হলেও অনেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হতে চায়। এ কথা ঠিক যে, বেতন বৃদ্ধিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সরকারি চাকরিতে আগ্রহ বেড়েছে। সরকারি চাকরিতে পেনশন আছে। ‘উপরি রোজগারের’ সুযোগ আছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে আরো নানা সুযোগ-সুবিধা আছে। যেমন নানা অজুহাতে অফিস কামাই করা যায়। দেরি করে অফিসে গিয়ে তাড়াতাড়ি বের হওয়া যায়। কাজ না করলেও চাকরি যায় না।

তা ছাড়া বর্তমানে সরকারি চাকরিতে বেতনস্কেল-সুবিধা যথেষ্ট বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, চাকরির নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত ছুটি, পরিবহন ও আবাসনসুবিধা, সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার, অবসরকালীন সুবিধার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও সরকারি চাকরির অন্যতম ভালো দিক।

সরকারি চাকরিতে আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ চাকরির নিশ্চয়তা। এটা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নেই। কারণ, বেসরকারি খাতে সহজেই চাকরিচ্যুত করা যায়। কিন্তু সরকারি চাকরি সহজে যায় না। সামাজিক স্বীকৃতিও অন্যতম একটা বড় কারণ। এছাড়া রয়েছে ক্ষমতাচর্চা বা ব্যবহারের সুযোগ। একজন সরকারি কর্মচারী ক্ষমতাচর্চা করতে পারেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে একজন সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তিও ক্ষমতাচর্চা করতে পারেন না।

আসলে যারা জীবনে ঝুঁকি নিতে ভয় পান, তারাই সরকারি চাকরির পেছনে ছোটেন। তাছাড়া একজন সরকারি চাকুরে তার প্রদত্ত কাজের গুণমান যা-ই হোক না কেন, জীবনধারণের জন্য নিশ্চিন্তে মাসান্তে বরাদ্দ টাকা নগদ হাতে পেয়ে যান। অপ্রতুল হলেও অন্য সব পেশার অনিশ্চয়তার তুলনায় তা লাভজনক বলে মনে করেন।

তবে ইদানীং সরকারি চাকরিজীবীদের একাংশের মধ্যেও হতাশা দেখা যায়। এর কারণ হলো, সরকারদলীয় সহকর্মীদের আস্ফাালন। একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীরও যদি দলীয় সংযোগ ভালো থাকে, তাহলে তিনি তার জন্য বরাদ্দ করা কাজকে মুখ্য বিবেচনা করেন না। আর যারা মধ্য বা উচ্চপর্যায়ের দলবাজ, তারা অন্যায়ভাবে পদ ও পদোন্নতির শ্রীবৃদ্ধিতে দক্ষ ও যোগ্যদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতার আসন পাকাপোক্ত করতে চান। নিরপেক্ষ, নিরীহ, দক্ষ, সত্ ও নির্বিরোধ কর্মী বঞ্চনার শিকার হয়ে হয় চাকরি থেকে অবসর নেন, না হয় কাজের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে দেশ ও দশের জন্য তার মেধা নিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে, দলীয় নয় বলে দক্ষ ও সত্ কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখাও মেধার বন্ধ্যাকরণ। ওএসডিগণ ব্যক্তিগত অচলাবস্থা ও সামাজিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

সরকারের প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের অনেকে দিনান্ত পরিশ্রম করেন। আবার কেউ কেউ গা ভাসিয়ে চলেন। আমাদের দেশে সরকারি চাকরি মহার্ঘ হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে আছে নানা গল্প, কৌতুক। তার দু-একটি উল্লেখ করা যাক।

অফিসের এক বসের একদিন খুবই মেজাজ খারাপ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে অনেক ধাতানি খেয়েছেন। রুমে ঢুকেই দেখলেন পিয়নটা হাতে কিছু কাগজ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বস :এই, কাজের কাজ তো কিছুই করো না। সারা দিন শুধু আড্ডা আর ঘোরাঘুরি। যাও, একটা চা নিয়ে আসো। হাতে কার মুণ্ডু নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?

পিয়ন :স্যার, চিঠি।

বস :কোন গাধার চিঠি?

পিয়ন :স্যার আপনার।

বস :কোন হারামজাদা লিখেছে?

পিয়ন :স্যার আপনার বাবা!

শুধু গল্পগুজব, আয়েশ করে সময় কাটানো নয়, রাগারাগি, মেজাজ খারাপের ঘটনাও সরকারি অফিসে ঘটে। এতে করে সবচেয়ে বেশি ঝড় যায় ছোট কর্মচারীদের ওপর। এটা যারা পারেন না, তারা বড় বসের কাছে ঝাড়ি খেয়ে বাড়িতে এসে অনেক সময় বউ-বাচ্চার ওপর রাগ দেখান। শফিক সাহেব তেমন একজন।

একদিন তিনি রেগেমেগে অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেন।

শফিক সাহেবের স্ত্রী বললেন, ‘কী হলো? আজ এত চটে আছ কেন?’

শফিক সাহেব :আর বোলো না। প্রতিদিন অফিসে যে কর্মচারীর ওপর রাগ ঝাড়ি, সে আজ অফিসে আসেনি। মেজাজটাই খারাপ হয়ে আছে!

কাজপাগল সরকারি অফিসার যেমন আছে, আবার ফাঁকিবাজ কর্মচারীর সংখ্যাও একেবারে কম নেই। একদিন এক কর্মচারী তার এক বন্ধুকে বলল, জানিস কাল থেকে আমার অফিস দুই সপ্তাহ ছুটি।

বন্ধুটি জানতে চাইল, কীভাবে?

কর্মচারীটির জবাব, কাল থেকে আমি এক সপ্তাহ ছুটিতে যাচ্ছি। তার পরের সপ্তাহে আমার বস ছুটিতে যাচ্ছেন।

সরকারি অফিসগুলোতে একটি সংস্কৃতি আছে। নাম ডিএফএ বা ড্রাফটস ফর অ্যাপ্রুভাল সংস্কৃতি। বড় বসের অনুমোদন ছাড়া এখানে কিছুই করা যায় না। ‘স্যার, ড্রাফটটা একটু দেখে দেন’ বলে কাজের অ্যাপ্রুভাল পেতে আগে দিনের কত সময় ব্যয় হতো। বসও নানান কাজে ব্যস্ত, ড্রাফটটা দেখে দেওয়ার সময়ই পান না।

ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা যাক। একজন সরকারি অফিসের সহকারী পরিচালক। তিনি নভেম্বরের ১০ তারিখ একটা চিঠি লিখলেন। সেই চিঠিটা অফিসের প্রধান স্বাক্ষর করবেন।

এবার সহকারী পরিচালকের কাজ হচ্ছে, চিঠির ড্রাফট লিখে স্বাক্ষর করে সেটি উপপরিচালককে দেওয়া। তিনি লিখেছেন : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

উপ-পরিচালক ভাবলেন, নদী ছোট হবে কেন? নদী সরু হবে। নদী হবে কিশোরের মতো উচ্ছল। আর এখানে জল হবে কেন? হবে পানি। তিনি দুটো সংশোধন আনলেন। ‘আমাদের সরু নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুপানি থাকে।’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এটা লিখে তিনি সহকারী পরিচালককে ফেরত দিলেন। সহকারী পরিচালক আবার প্রিন্ট দিয়ে স্বাক্ষর করে উপপরিচালকে দিলেন। উপপরিচালক স্বাক্ষর করে এবার পাঠালেন যুগ্ম-পরিচালককে। তিনি আরেকটু আধুনিক দৃষ্টিতে ভাবলেন। এখন বাংলা সন চলে না। বৈশাখ মাস না লিখে তিনি কেটে লিখলেন এপ্রিল মাস। আর ‘হাঁটুপানি’ কেটে তিনি লিখলেন—অল্প পানি থাকে। তার কাটাকাটির পর লাইন দাঁড়াল, ‘আমাদের গ্রামের ছোট নদী বহে বাঁকে বাঁকে/ এপ্রিল মাসে তাতে অল্প পানি থাকে।’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

যথারীতি প্রিন্ট আবার নিচে গড়াল। এর পর আবার প্রিন্ট হলো। সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, যুগ্ম পরিচালক স্বাক্ষর করে পাঠালেন সিনিয়র যুগ্ম-পরিচালককে। সিনিয়র সাহেব ভাবলেন, সবই তো ঠিক আছে। কই কাটা যায়? তিনি ভাবলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটা যুতসই হচ্ছে না। এটা কেটে দেওয়া যায়। আরো কিছু নিজের মত কাঁটছাট করলেন।

এবার যা দাঁড়াল—

‘আমাদের গ্রামের ছোট নদী বহে অক্র বক্র/

এপ্রিল মাসে তাতে দেখি অল্প পানি চক্র—

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠক্র।”

এই অসাধারণ ড্রাফটস আবার প্রিন্টের জন্য নিচে গড়াল। প্রিন্ট হলো। আবার স্বাক্ষর হতে হতে ওপরে গেল। এরপর এই ড্রাফট গেল, অফিস প্রধানের হাতে। তিনি কিছুক্ষণ দেখলেন। হাসলেন। তিনি এই লাইনগুলো জানেন। অফিস প্রধান হলে অনেক জিনিস জানতে হয়। তিনি শেষ কাটাকাটি করে ড্রাফট চূড়ান্ত করলেন। তিনি ড্রাফট সংশোধন করলেন :আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

স্বাক্ষর করে তারিখ লিখলেন । ১০/১২/২০২২

এক মাস চলে গেছে এই মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজে!

পুনশ্চ : মহাসড়ক ধরে ছুটে যাচ্ছিল দুটি গাড়ি। একটির চালক অফিসের বস, অন্যটি চালাচ্ছিলেন অফিসের এক কর্মচারী। চলতে চলতে বস একসময় চেষ্টা করছিলেন, কর্মচারীর গাড়িটি ওভারটেক করে সামনে চলে যেতে। কর্মচারী গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে চিত্কার করে বললেন, ‘গরু!’

শুনে রেগে আগুন হলেন বস! তিনিও জানালা দিয়ে মাথা বের করে ‘কত বড় সাহস! তুমি আমাকে গরু বললে? তুমি একটি বেয়াদব, হারামজাদা, মজা দেখাব তোমায়’ বলতে বলতেই রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি গরুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পাশের ধানখেতে ছিটকে পড়লেন!

এ গল্প থেকে আমরা যা বুঝলাম :বসরা কখনোই কর্মচারীদের কথা আমলে নেন না!

লেখক: রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন