শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নীরব মহামারি ঠেকানো জরুরি

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১:৫৮

‘যতক্ষণ না সমাধান হইতেছে, ততক্ষণ সমাধানকে অসম্ভব বিষয় বলিয়া মনে হইতে থাকে’—এই কথার যথার্থতা লক্ষ করা যাইতেছে দেশে লাগামহীন হইয়া উঠা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে। উদ্বেগের সহিত লক্ষ করা যাইতেছে, বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমাগতভাবে বাড়িতেছে। বিশেষ করিয়া, ২০১৯ সালের পর হইতে কোনোভাবেই ডেঙ্গুকে বাগে আনে যাইতেছে না। বছরটিতে এডিস মশা লক্ষাধিক মানুষকে আক্রান্ত করিয়া রেকর্ড সৃষ্টি করে। ক্ষুদ্রাকায় মশার হাতে ঝরিয়া যায় প্রায় দুই শত তাজা প্রাণ। বরাবরের মতোই এই ঘটনা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করি নাই আমরা। সুতরাং অবধারিতভাবে ইহার মাশুল গুনিতে হয় পরের বত্সরগুলিতে। এই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর এডিস যেন যমদূত হইয়া উঠিয়াছে! এই বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনের প্রাণ কাড়িয়াছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীতে পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে চিকিত্সাকেন্দ্রগুলি। এমনকি কোভিড হাসপাতালগুলিকেও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ছাড়িয়া দিতে হইতেছে। ডব্লিউএইচও (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) বহুকাল পূর্ব হইতেই বলিয়া আসিতেছে, ‘ডেঙ্গু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও মারাত্মক রোগ’। ডব্লিউএইচওর ন্যায় সতর্কতা আসিয়াছে বিশেষজ্ঞ মহল হইতেও। পরিবর্তিত জলবায়ুর পর্যবেক্ষণে বলা হইয়াছিল, ডেঙ্গুর ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়াছে। এমনকি এ-ও বলা হয়, পরিবর্তন ঘটিয়াছে ডেঙ্গু রোগীর ধরনেও—পূর্বে নাক, মুখ, কান দিয়া রক্তক্ষরণ হইলেও সাংঘাতিকভাবে এখন আক্রান্ত হইতেছে ফুসফুস। সুতরাং, প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, আমরা সতর্কবাণীতে কর্ণপাত করিলাম না কেন? ২০১৯ সালের ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তকে আমলে লইয়া কেনই-বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পথে হাঁটিলাম না?

দুঃখজনকভাবে লক্ষ করা যাইতেছে, বর্ষা শেষে দরজায় শীত কড়া নাড়িলেও এডিসের দাপট কমে নাই। সাধারণত দেশে মে মাস হইতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে ডেঙ্গুর মৌসুম হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু বত্সর শেষ হইতে চলিলেও পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে ডেঙ্গু রোগী। ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষাকাল অনিয়মিত হয়ে পড়ায় ডেঙ্গু দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে’—এই দাবির কঠিন কথাগুলো বুঝিতে পারা বেশ মুশকিল। কারণ, ২০০০ সালে দেশে যখন প্রথম বারের মতো সাড়ে পাঁচ হাজারের অধিক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়, তখনই তো নড়িয়াচড়িয়া বসিবার কথা! ইহার পর তো প্রায় দুই যুগ গড়াইয়া চলিয়াছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় কত দূর আগাইতে পারিয়াছি আমরা? ইহার দায় শুধু সরকারের উপরই বর্তায় না, বরং জনগণও সমভাবে দায়ী। এডিস মশাকে থামাইতে জনগণের যেমন সচেতনতার ঘাটতি রহিয়াছে, অনুরূপভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনার প্রতিও আঙুল তুলিবার সুযোগ রহিয়াছে। অন্যান্য সমস্যার মতোই প্রতি বত্সর—বিশেষ করিয়া ২০১৯ সাল হইতে—ডেঙ্গুর প্রকোপ চরম আকার ধারণ করিবার পর ‘তত্ক্ষণাত্’ ব্যবস্থা গ্রহণে তোড়জোড় লক্ষ করা যায়। আমরা বলিতেছি না, ব্যবস্থা গ্রহণে বিরাট ঘাটতি রহিয়াছে। কিন্তু কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে না পারাসহ সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তো কর্তৃপক্ষকে মানিতেই হইবে। জনগণকে সতর্ক-সচেতন করা যায় নাই আজও। সত্যিকার অর্থেই, আজও অসচেতনতার জাল ছিন্ন করিতে পারিলাম না আমরা; ডেঙ্গুর ন্যায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেন সতর্কতার বিপরীত পৃষ্ঠে আমাদের বাস!

কোনো সন্দেহ নাই, করোনা মহামারি কাটিতে না কাটিতেই নূতন রোগ-ব্যাধি গভীরে শিকড় গজাইয়া বসিলে তাহা হইবে চরম দুর্দশা-দুর্বিপাকের কারণ। কেননা, কোভিড শরীরের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমাইয়া দিয়াছে। সুতরাং, এডিস মশার বিস্তারে ইতি টানিবার ব্যাপারে অবহেলা করা কাহারো জন্যই সুখকর হইবে না। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অতিসত্বর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ তো করিতে হইবেই, আগামী দিনগুলির কথা মাথায় রাখিয়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে প্রয়োজনে ঢালিয়া সাজাইতে হইবে—জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংগতি রক্ষার জন্য ইহা আবশ্যকও। এডিস নিধনে যেই সমস্ত উপকরণ ব্যবহার করা হয়, তাহার সঠিক কার্যকারিতা পরীক্ষার কথাও বলিতেছেন বিশেষজ্ঞরা—যেই হেতু ইহা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কাজ করিলে এডিসের বিস্তার এতটা বাড়িবার কথা নহে। সর্বোপরি, প্রতিরোধব্যবস্থার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়া ডেঙ্গু নির্মূলে সরকার-জনগণ উভয় পক্ষের সহনশীল আচরণ ও সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নাই।

ইত্তেফাক/কেকে