কর আদায়ে নাগরিক সচেতনতা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১:০৩

লাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি । আয়কর দেন প্রায় ১৮ লাখ লোক। বিআরটিএ-র হিসাবে ৫৫ লাখের ওপর মটরযান আছে। বাড়ির সংখ্যার হিসাব সরকারিভাবে বলা যাবে না। কারণ সরকারের কাছে সেই হিসাব নেই। বাড়ি আছে, গাড়ি আছে; কিন্তু আয়কর দেয় না। এটা ভাবতেও অবাক লাগে!

কর আদায়ে বাংলাদেশের সাফল্য ভালো নয়। প্রতিবছর শুল্ক-কর আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু অর্থনীতির আকার আরো বেশি গতিতে বেড়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের মাত্র ১ শতাংশ মানুষ বার্ষিক রিটার্ন জমা দিয়ে আয়কর দেন। জিডিপির তুলনায় কর আহরণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানির একটি। আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম নাগরিক আয়কর দেন। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর দেওয়ার জটিল প্রক্রিয়া এবং হয়রানির ভয়ে এ দেশের নাগরিকেরা করযোগ্য আয় থাকলেও কর দিতে আগ্রহ বোধ করেন না। তবে বড় অংশই আয়কর ফাঁকি দেন। আবার অনেকে আয়করের বিনিময়ে সরকারি সেবা কম পাওয়ার কথাও বলেন। দেশে আয়করদাতার সংখ্যা কম বলেই শুল্ক ও ভ্যাট আদায়ে বেশি চাপ দেওয়া হয়। যেমন- সাবানের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নানা পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ আছে। অথচ ধনী-গরিব সবাই সাবান ব্যবহার করেন। ফলে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের মাধ্যমেও গরিব মানুষের কাছ থেকে কর আদায় করা হয়। বাংলাদেশের জিডিপির আকার যত, এর মাত্র পৌনে ৯ শতাংশের কম আসে কর থেকে। অথচ পার্শ্ববর্তী নেপালে জিডিপির মোট ২১ শতাংশের মতো কর থেকে আসে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালের বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এই হিসাব পাওয়া গেছে। যদিও সরকারি হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর নাগাদ কর- জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাত আফগানিস্তানে। ঐ দেশে জিডিপির অনুপাতে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো কর আসে। তারপরেই আছে বাংলাদেশ। এ দেশে কর ব্যবস্থায় গত কয়েক দশকে কোনো সংস্কার হয়নি। তাই যে হারে অর্থনীতির আকার বাড়ছে, সেই হারে রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। করনীতি, কর প্রশাসন ও অটোমেশন, কোনো খাতেই সংস্কার হয়নি। নতুন ভ্যাট আইনটি কেড়ে ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। বর্তমান নীতি দিয়ে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো যাবে না।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ লাখ নাগরিকের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে। কিন্তু বছর শেষে আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেন মাত্র ২০-২২ লাখ। তাদের মধ্যে ৭-৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা। প্রতি মাসে বেতন-ভাতা প্রদানের সময় 'পে রোল ট্যাক্স' হিসেবে কেটে রাখা হয়। অন্যদিকে যারা বছর শেষে রিটার্ন জমা দেন, তাদের কমবেশি ১০ শতাংশ শূন্য রিটার্ন জমা দেন । এর মানে, তারা কোনো কর দেন না। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ কর দেন। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কয়েক বছর ধরে কর প্রশাসনে সংস্কার চলছে। কর দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে অনলাইনে রিটার্ন জমা এবং অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। নতুন করদাতাদের টিআইএন নিতে এখন আর কর কার্যালয়ে যেতে হয় না। বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্য অর্জনে আয়করের অংশ দিনদিন বাড়ছে। এ দেশের অনেক নাগরিকের করযোগ্য আয় থাকলেও তারা কর দিতে চান না। এখন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ টাকা। মোটা দাগে, মাসে ২৫ হাজার টাকা আয় করলেই করের আওতায় আসার কথা। তবে চাকরিজীবীরা বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ কিছু খাতের খরচে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের ওপর কর ছাড় আছে। সেই হিসাবে, বছরে তিন লাখ টাকার বেশি করযোগ্য আয় করেন এমন মানুষের সংখ্যা ২০ লাখের কম। এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামেই দেশের ৬০-৬৫ শতাংশ করদাতার বাস। কিন্তু সিলেট, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়াসহ বহু জেলায় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়েছে। এসব এলাকায় সেই তুলনায় তেমন নতুন করদাতা পাওয়া যাচ্ছে না, হয়রানির ভয়ে কর দিতে আগ্রহী হন না। সামর্থ্যবানরা। তারা মনে করেন, একবার করের জালে ঢুকে TAX গেলে প্রতিবছরই কর দিতে হবে; কিংবা আগের বছরের চেয়ে আয় কমে গেলে কর কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জালে জর্জরিত হতে হবে। এর সত্যতা আছে।

এবার দেখা যাক, গত ১০ বছরে করদাতার সংখ্যা কত বাড়ল। ২০১০-১১ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১৪ লাখ করদাতা কর দিয়েছেন। ১০ বছর পর তা মাত্র ২২ লাখে উন্নীত হয়েছে। ১০ বছরে নতুন করদাতা বেড়েছে মাত্র ৮ লাখ। কিন্তু গত ১০ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপির আকার ছিল সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা। এর মানে, এই সময়ে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের মূল্য সংযোজন দ্বিগুণ হয়েছে। মাথাপিছু গড় আয়ও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি । কিন্তু তাল মিলিয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে পারেনি এনবিআর। এনবিআর প্রতিবছর নতুন করদাতার খোঁজে নানা ধরনের কর্মসূচি নেয়। এই কর্মসূচিতে শুধু টিআইএন দেওয়া হয়। এতে টিআইএনধারীর সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু টিআইএন নিয়ে পরের বছর থেকে কত জন রিটার্ন দিয়ে কর দিলেন, তা খুঁজে দেখে না এনবিআর। তাই এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

ইত্তেফাক/ইআ