শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

এই অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়?

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১:৪১

‘মনুষ্যত্বের শিক্ষাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন’—কবিগুরুর এই অমিয় বাণী কি আমরা আত্মস্থ করিতে পারিয়াছি? চারিদিকে প্রতিদিন যেই হারে অমানবিকতার স্তূপ জমা হইতেছে, তাহাতে মনে হয় না মনুষ্যত্ব নামক কোনো কিছু এই সমাজে আছে! দুঃখজনক সত্য হইল, মানুষের যাহা কল্পনারও বাহির, স্বয়ং মানুষের দ্বারাই ঘটিতেছে তাহা! সত্যিকার অর্থেই, আজও আমরা ‘মানুষ’ হইয়া উঠিতে পারি নাই। দেশ জুড়িয়া বিরতিহীনভাবে এমন সকল ঘটনা ঘটিতে দেখা যাইতেছে যে, যাহাকে ‘অস্বাভাবিকের চাইতেও অস্বাভাবিক’ বলিলেও কম বলা হয়! চট্টগ্রামে ছোট্ট শিশু আয়াতকে যেই নারকীয়ভাবে হত্যা করা হইয়াছে তাহা বর্ণনাতীত। এই বিভীষিকাময় ঘটনায় আমরা যাহার পর নাই ব্যথিত, স্তম্ভিত। 

সত্যি বলিতে, এই জাতীয় ঘটনাগুলি আজিকার সমাজে প্রতিদিনকার চিত্র হইয়া উঠিয়াছে। রুটিন বিরতিতে মানুষ হত্যা এমনকি অবুঝ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটিতেছে। শুধু হত্যা নহে, ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরির মতো ঘৃণ্য অপরাধ। এমনকি অতি তুচ্ছ বিষয়ও বৃহত্ সংঘর্ষ-সহিংসতার রূপ পরিগ্রহ করিয়া বড় অপরাধকে ডাকিয়া আনিতেছে। এক কথায় বলিতে গেলে, সমাজ হইয়া উঠিয়াছে অপরাধের স্বর্গরাজ্য। আর এই অপরাধরাজ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করিয়া একের পর এক অপরাধ করিয়া চলিয়াছে একশ্রেণির তরুণ প্রজন্ম। এমন কোনো অপরাধ নাই, যাহাতে তাহাদের নাম যুক্ত হয় নাই। বিশ্বায়নের যুগে যেইখানে তাহাদের আলোকিত মানুষ হইবার কথা, সেইখানে তাহারা হাঁটিয়া চলিয়াছে অন্ধকারের পথ ধরিয়া। যেইখানে তাহাদের সভ্য সংস্কৃতিকে আঁকড়াইয়া ধরিবার কথা, সেইখানে তাহারা ‘গ্যাং কালচার’ গড়িয়া তুলিয়া ক্রমাগতভাবে লোমহর্ষক কর্মকাণ্ড ঘটাইয়া চলিয়াছে। কী সাংঘাতিক কথা!

বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো নহে। স্বাভাবিকভাবেই ভালো নয় বাংলাদেশের অবস্থাও। দেশে দেশে অভাব, সংকট ও সহিংসতা বাড়িয়া চলিয়াছে; কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলির সহিত অস্বাভাবিকভাবে বাড়িতেছে ‘অমানবিক’ কাজকর্ম। এই অমানবিকতা কিংবা অপরাধ বাড়িয়া যাইবার কারণ হিসাবে সমাজবিজ্ঞানীরা সুষ্ঠু সামাজিক পরিবেশের অভাবকে দায়ী করিতেছেন। সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশের ঘটতিকে দায়ী করিতেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। মনোবিজ্ঞানীরা বলিতেছেন নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা। প্রকৃত শিক্ষার অভাবের কথা বলিতেছেন শিক্ষাবিদগণ; আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতে ধর্মীয় অনুশাসন না মানিবার অভিযোগ তোলা হইতেছে। এই সকল প্রতিটি কথার সহিত সহমত পোষণ করিয়া আমরা বলিতে চাই—সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করিতে না পারিবার ব্যর্থতার কারণেই অমানবিকতা মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে। অপরাধমূলক চিন্তাভাবনা স্থায়ী শিকড় গাড়িয়াছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মানিতে হইবে, এই উপমহাদেশে আইনের শাসন তলানিতে গিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই ব্যর্থতা যে আমাদেরকে দিনকে দিন পিছনের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে, তাহা কে না বলিবেন? পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ব্যাপকভাবে বাড়িয়া গিয়াছে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা। ইহার সহিত পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে কিশোর অপরাধ। সকল কিছু মিলাইয়া অবস্থা অতি বেগতিক। এমতাস্থায় বড় প্রশ্ন—এই নিষ্ঠুর প্রবণতার শেষ কোথায়? 

অবশ্য অপরাধ বাড়িয়া যাওয়ার বিষয়ে অন্ধকারে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—এমন কথা আমরা বলিতে চাহি না। অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও কাজ করিতেছেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস; কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই যেন কাজে দিতেছে না! বলা হইয়া থাকে, ‘হিউম্যান সাইকি (মানুষের মন-প্রবৃত্তি)’ সঠিকভাবে ধরিতে পারিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কাজ সহজ হইয়া যায়; কিন্তু প্রশ্ন হইল, অবস্থা কি এতটাই আয়ত্তের বাহিরে যে, সমাধানের রাস্তা খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছেন না? পরিবারকে বলা হয় ‘শাশ্বত বিদ্যালয়’—তথাকথিত আধুনিক যুগে এই মাতৃসদনও কি তাহা হইলে দায়িত্ব পালন করিতে ব্যর্থ হইতেছে! পারিবারিক অনুশাসন কিংবা সামাজিক শিষ্টাচারও কি সমাজজীবন হইতে চিরবিদায় লইল! আমরা আসলে আশাবাদী হইতে চাই। সমাজজীবন হইতে অপরাধের শিকড় তুলিয়া ফেলিবার সক্ষমতার সংবাদ শুনিতে চাই। প্রতিনিয়ত যেইভাবে অমানবিকতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হইতেছে তাহাতে এই বঙ্গের চিরাচরিত মানবিকতার উদাহরণগুলি যেন চাপা পড়িয়া যাইতেছে। অথচ আমাদের শতসহস্র মানবিকতার গল্প আছে, মনুষ্যত্বের একেকটি মহাকাব্য রহিয়াছে এই বাংলার। পাশবিকতার নিকট মানবিকতার ধরাশায়ী হওয়া বাঙালি সংস্কৃতির নিয়মবিরুদ্ধ। সুতরাং, অমানবিকতার মূলোৎপাটনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজ নিজ জায়গা হইতে কাজ করিয়া যাইতে হইবে।

ইত্তেফাক/ইআ