শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ছোট মাছ আর রহিল কোথায়!

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:৫৯

একটি ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির মামলায় এক কর্মকর্তার জামিন আবেদন শুনানিকালে বিজ্ঞ আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে উদ্দেশ্য করিয়া যাহা বলিয়াছে তাহা কেবল কথার কথা নহে। বিজ্ঞ আদালত বলিয়াছে, ‘ঋণখেলাপিরা আইনের চেয়ে শক্তিশালী নয়। তাহলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? যারা অর্থশালী তারা কি ধারাছোঁয়ার বাইরে থাকবে? দুদক রাঘববোয়ালদের নয়, চুনোপুঁটিদের ধরতে ব্যস্ত আছে।’ বিজ্ঞ আদালতের এই বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। উচ্চ আদালতের বেঞ্চের বিচারপতিদ্বয় গভীর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এবং তাহাদের অবজারভেশনের উপর দেশবাসীর আস্থা রহিয়াছে। 

আমাদের দেশে একসময় খাল-বিল, ডোবায় সর্বত্র দেশীয় ছোট-বড় মাছের দেখা মিলিত। উহার মধ্যে সর্বাধিক পাওয়া যাইত যেই মাছটি তাহা চুনোপুঁটি। অর্থাৎ আকারে ছোট পুঁটি মাছ। নানাবিধ কারণে উহা এখন প্রায় বিলুপ্ত। এমনকি ইন্টারনেটে চুনোপুঁটি লিখিয়া সার্চ দিলেও মাছের ছবি দুই-একটি আসে বটে; কিন্তু তাহার ১০ গুণ আসে ঋণগ্রহীতা, রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান-সংবলিত ছবি। অর্থাৎ বর্তমান প্রযুক্তি যাহারা ব্যবহার করেন, তাহাদেরও একটি বড় অংশ চুনোপুঁটি দেখেন নাই অথবা ভুলিয়া গিয়াছেন; কিন্তু চুনোপুঁটি যেই অর্থে আমরা ব্যবহার করিয়া থাকি, সেই চুনোপুঁটিও কি আর আছে? সম্ভবত নানা ধরনের ফিডিং খাইয়া ছোট চুনোপুঁটিও এখন বড় হইয়া গিয়াছে। আর রাঘববোয়ালও এখন আর বোয়াল নাই। বোয়াল হইয়াছে তিমি আকারের। সাধারণত বোয়াল মাছের মধ্যে যেইটি আকারে বড় হয় তাহাকে বলা হইত রাঘববোয়াল, যেমন করিয়া ছাগলের মধ্যে বড় জাতের ছাগলকে বলা হয় রামছাগল। রঘু বংশের রাজা যেহেতু বড় মানুষ, তাই তাহাকে কেন্দ্র করিয়া রাঘববোয়াল শব্দের উৎপত্তি। যাহারা দেশে অপেক্ষাকৃত অধিক অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী হন, তাহাদেরকেই রাঘববোয়াল বলার রেওয়াজ আছে; কিন্তু গোড়ায় তলাইয়া দেখিলে দেখা যাইবে—তাহারা শুধু অপেক্ষাকৃত বড় নহে, আকারে এত বড় হইয়াছেন যে, তিমি হইয়া গিয়াছেন। 
এখন সেই তিমি শিকারের উপায় কী? নিউ ইয়র্ক শহরসহ বিভিন্ন জায়গায় নাকি এত বড় বড় ইঁদুর আছে, যেই ইঁদুর বিড়ালকে তাড়া করিয়া থাকে। নিউ ইয়র্কে যেই ইঁদুর বিড়ালকে তাড়া করিতে পারে, তাহাকে বিড়াল দিয়া কি শিকার করা সম্ভব? উহা শিকার করিতে কমপক্ষে কুকুর সাইজের কোনো প্রাণীর প্রয়োজন। সুতরাং আজ যাহাদের চুনোপুঁটি বলা হইতেছে, সমাজ যাহাদের চুনোপুঁটি বলিয়া ভাবিত, তাহারাও যে এখন চুনোপুঁটি নাই! যে কোনো কিছু সাইজে যখন বড় হইয়া যায়, তাহা সেই অনুপাতে শক্তিশালী হইয়া উঠে। তখন তাহা শিকার করার জন্যও আরো শক্তিশালী হাতিয়ার প্রয়োজন হয়। 

প্রসঙ্গত বলা যায়, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কয়েক দশক পূর্বের চাইতে নিঃসন্দেহে ভালো হইয়াছে। মহামারি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিকালীন সংকটের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক স্ফীত হইয়াছে। সেই স্ফীত আকারের অর্থনীতিতে যাহারা মুখ ডুবাইয়াছেন তাহারা বড় বড় করিয়াই গ্রাস করিতে চেষ্টা করিয়াছেন এবং করিতেছেন। সুযোগগুলিও দিনে দিনে বড় হইয়াছে। সুতরাং ইহা সত্য যে, রাঘববোয়াল ধরা পড়িলে চুনোপুঁটির স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিস্তার থাকিবে না। তাই বিজ্ঞ আদালতের সহিত দ্বিমত করিবার কোনো সুযোগ নাই। কেহই যে আইনের ঊর্ধ্বে নহে, তাহা প্রমাণ করিবার একটি বিষয় তো রহিয়াছেই। শক্ত করিয়া জাল ফালানো গেলে তাহাতে বোয়ালের পাশাপাশি চুনোপুঁটিও রক্ষা পাইবে না। দুদককেই এই প্রমাণ রাখিতে হইবে যে, তাহারা শুধু চুনোপুঁটি শিকার করিতে আসে নাই।

ইত্তেফাক/ইআ