শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে স্থান পেতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয়

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০১:০৯

একটি বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তাদীপ্ত ও মানবিক বোধসম্পন্ন জাতি গঠনে জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু হলেও সরকার গৃহীত পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে উচ্চশিক্ষার পরিধি এবং ব্যাপ্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৭টি। এর মধ্যে দেড় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। সংখ্যার বিচারে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে বাংলাদেশের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার গুণমানের দিক বিবেচনা করলে আমাদের অবস্থান এখনো পেছনের সারিতে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান অবকাঠামো, জনবল এবং গবেষণা খাতে ব্যয় দুর্বল ও অপর্যাপ্ত থাকার কারণে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থা খুবই নাজুক।

বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ র‍্যাংকিং সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার এবং গবেষণার মান উন্নত করার জন্য সহায়ক হয়ে থাকে। র‍্যাংকিংয়ের ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি, খ্যাতি এবং প্রকৃতপক্ষে একটি দেশেরও খ্যাতি বাড়ে।

একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, শিক্ষক বা গবেষক কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন বা গবেষণা করবেন, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কোথায় অর্থবরাদ্দ দিতে পছন্দ করবে, নীতিনির্ধারকগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন, স্কলারশিপ প্রাপ্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মূল্যায়ন ইত্যাদিতে এই র‍্যাংকিং বিশেষ ভূমিকা রাখে।

সারা বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী তিনটি র‍্যাংকিং হলো—কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং সাংহাই র‍্যাংকিং। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং ২০২২-এ শীর্ষ দুটি বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (এনএসইউ)। র‍্যাংকিংয়ে ১০৪টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ১ হাজার ৭৯৯টি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নেয়। বিশ্বব্যাপী এই তালিকায় ৬০১ থেকে ৮০০তমের মধ্যে ঢাবি ও এনএসইউর অবস্থান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ২০১ থেকে ১ হাজার ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান পেয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় টানা সপ্তম বারের মতো তালিকার শীর্ষে রয়েছে। তবে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় গত বছর যৌথ পঞ্চম স্থান থেকে যৌথ তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ১৭৭টি প্রতিষ্ঠানসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে সর্বাধিক প্রতিনিধিত্বকারী দেশ হিসেবে তালিকায় জায়গা করে নেয়। শীর্ষ ২০০-এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে চীন চতুর্থ অবস্থানে আছে। অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে নেদারল্যান্ডের সঙ্গে পঞ্চম অবস্থানে আছে।

টাইমস হায়ার এডুকেশন মোটা দাগে শিক্ষা (৩০ শতাংশ), গবেষণা (৩০ শতাংশ), সাইটেশন (৩০ শতাংশ), ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক (৭ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম (২ দশমিক ৫ শতাংশ) ইনডিকেটরসমূহে প্রাপ্ত স্কোর থেকে র‍্যাংকিংয়ের কাজটি করে থাকে।

সম্প্রতি কিউএস বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশ করেছে। ৮ জুন বিশ্বসেরা ১ হাজার ৪০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ র‍্যাংকিংয়ে ছয়টি সূচকে মোট ১০০ নম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল্যায়ন করে কিউএস। এর মধ্যে একাডেমিক খ্যাতি ৪০, চাকরির বাজারে সুনাম ১০, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ২০, শিক্ষকদের গবেষণা ২০ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক অনুপাত ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অনুপাতে পাঁচ নম্বর করে ধরা হয়।

কিন্তু এতে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি সেরা ৫০০-এর মধ্যে। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৫০০ তালিকার মধ্যে রয়েছে। এমনকি পাকিস্তানেরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৫০০-তে আছে। কিউএসের নতুন এ র‍্যাংকিংয়ে পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় যেসব দেশে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে, সেসব দেশের শিক্ষার মানও উন্নত হচ্ছে। উন্নতি করা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া উল্লেখযোগ্য। কিন্তু, বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতি সত্ত্বেও শিক্ষার মানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। এর পেছনের কারণগুলোর প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে। লক্ষ করলে দেখা যায়, র‍্যাংকিংয়ের প্রথমে অবস্থানরত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মূলত একটি গবেষণানির্ভর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি প্রথম সারির অবশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যও গবেষণাকেন্দ্রিক। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতার নথি ঘাঁটলে দেখা যায়, এগুলোর বাজেটের বেশির ভাগ গবেষণায় ব্যয় করা হয়।

অথচ উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রবণতার উলটো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। গবেষণার বদলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলে মুখস্থনির্ভর পড়ালেখা, চলে চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মাথায় চাকরির চিন্তা, ভবিষ্যৎ চিন্তার ঘুণপোকা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের মুক্ত জ্ঞানচর্চার স্থান। শিক্ষার্থীরা গবেষণা করবেন, নতুন নতুন উদ্ভাবন করবেন, জাতিকে বিশ্বদরবারে মেলে ধরবেন—এটাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্দেশ্য। কিন্তু হচ্ছে ঠিক তার ব্যতিক্রম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের মুক্ত জ্ঞানচর্চার সুযোগ না দিয়ে বরং ক্লাসে বাধ্যতামূলক উপস্থিতি, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা হয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় এটিই, গবেষণা খাতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং মাপকাঠির অন্যতম জায়গা; অথচ এখানেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা বেশি। এর জন্য দুটি বিষয়কে প্রধানত দায়ী করা যায়। শিক্ষকদের অপর্যাপ্ত গবেষণামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দের হারের চিত্র খুবই হতাশাজনক। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে র‍্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে হলে গত্বাঁধা নিয়মনীতির ঊর্ধ্বে উঠে অগ্রসর হতে হবে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সৃজনীশক্তি দিয়ে নতুনত্ব উপহার দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পড়ালেখা, চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে সৃজনশীলতার দিকে মনোনিবেশ করতে পারেন, তা শিক্ষকদের বিবেচনায় নিতে হবে।

এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত মেনে চলা হয় না। যেমন—আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা মানা হয় না বা নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেও তা নামমাত্র। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পলিসি করে যাতে বৈদেশিক শিক্ষার্থী ভর্তি ও কিছু বিদেশি ফ্যাকাল্টি মেম্বার নিয়োগ করানো যায়। গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া উচিত এবং পদোন্নতির জন্য গবেষণার মান সংযুক্ত করে দেওয়া উচিত।

একাডেমিক খ্যাতি, চাকরির বাজারে সুনাম বাড়াতে হলে ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষকদের পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় গুরুত্ব না দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

একটি সেন্ট্রাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষকের গবেষণার মান বৃদ্ধি করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পদোন্নতি পেতে পিএইচডি ডিগ্রিসহ আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা থাকতে হবে, এ ধরনের নিয়ম করা জরুরি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কর্মগুলোর ডিজিটাল ইনডেক্স থাকা, প্রকাশনাগুলোকে ডিজিটালাইজড করার দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। অর্থাৎ আমরা যে কাজগুলো করছি, সেগুলোকে সিস্টেমে আনা, যেন সেগুলো সবাই দেখতে পারে আর সাইটেশন করতে পারে।

বেসরকারিভাবে গবেষণার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা নেই। অথচ, বিশ্বের অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বাজেটের বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক গবেষণা তেমন একটা হচ্ছে না। অন্যদিকে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে গবেষণা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে, অনেক মেধাবী শিক্ষক গবেষণা করতে চেয়েও গবেষণা করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এভাবে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বরাদ্দ অর্থের যথাযথ বণ্টন-মনিটরিং-মূল্যায়নের অভাবে ভালো মানের গবেষণা হচ্ছে না।

এছাড়া, মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিশ্বে, এমনকি এশিয়া মহাদেশের মধ্যেও, বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে বর্তমান অবস্থান তার থেকে উত্তরণের জন্য কমপক্ষে এশিয়া মহাদেশের, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন বা মালয়েশিয়ার শিক্ষা এবং গবেষণা নীতিমালাকে মডেল হিসেবে অনুসরণ করা যেতে পারে। এছাড়া, জাতীয় ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশ করতে হবে, যাতে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। এভাবেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক: সচিব, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন