শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গুটিকয় বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ভোগ্যপণ্যের আমদানি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০২:০২

প্রতিযোগিতায় না পেরে ছোট ও মাঝারি পর্যায়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকরা ছিটকে পড়েছেন। ভোগ্যপণ্যের আমদানি এখন দেশের কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ডলার-সংকটে  কম পণ্য ও গ্রুপ-ভিত্তিক আমদানি ব্যবসা এখন হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ডলার-সংকটে ব্যাংকগুলো এখন ১০-১২ হাজার টন পণ্য আমদানির এলসি দিচ্ছে না। বিদেশি সরবরাহকারীরাও এত কম পণ্য সরবরাহ দিচ্ছে না। ফলে বৃহৎ আমদানিকারকরা বেশি পণ্যের এলসির সক্ষমতা থাকায় ভোগ্যপণ্য আমদানি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

আবার ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না। কিন্তু শিল্প গ্রুপগুলো শিল্পের ঋণের টাকা দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানি করছে বলে এমন অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিল্প গ্রুপগুলোর সঙ্গে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য আমদানি থেকে ছিটকে পড়েছেন। আবার  খাতুনগঞ্জে গত কয়েক বছরে চেক প্রতারণা ও ব্যবসায় লোকসানে ছোট ও মাঝারি পর্যায়ে অনেক আমদানিকারক দেউলিয়া হয়ে গেছেন।

খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের দেশের ভোগ্যপণ্য আমদানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্যের ৪০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। বাকি পণ্য ঢাকাসহ অন্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা আমদানি করেন। খাতুনগঞ্জের আমির মার্কেট, ওসমানিয়া মার্কেট, ওসমান মঞ্জিলসহ কয়েকটি মার্কেটে কয়েক শ আমদানিকারক ছিলেন। এখন এসব মার্কেটে সেই ব্যস্ততা নেই। আমদানিকারকদের অনেক অফিস এখন খুচরা পণ্যের দোকান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। মাঝারি পর্যায়ে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা কয়েক জন মিলে গ্রুপ করে পণ্য আমদানি করতেন। কিন্তু বর্তমানে গ্রুপ-ভিত্তিক আমদানি ব্যবসা হচ্ছে না। ফলে মাঝারি আমদানিকারকদের মধ্যে অনেকেই ডিও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। তারা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে ডিওতে পণ্য নিয়ে বিক্রি করছেন। আমদানিতে অর্থসংকট, নতুন আমদানিকারকদের দৌরাত্ম্য, চেক প্রতারণায় পুঁজি হারানোসহ নানা জটিলতায় মাঝারি পর্যায়ে আমদানিকারকরা ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়েছেন। এসব ব্যবসায়ীর অনেকেই এখন ভোগ্যপণ্য আমদানির পরিবর্তে অন্য ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন।

এক সময়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে জড়িত ছিলেন ব্যবসায়ী নুরুল আলম। তিনি বলেন, ভোগ্যপণ্য আমদানি অনেক আগে বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি ব্যবসায় টিকতে পারছেন না। শিল্প গ্রুপগুলো ভোগ্যপণ্যসহ সব ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। তারা শিল্পের নামে ব্যাংক ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন। সেই টাকা দিয়ে পণ্য আমদানি করছেন। কিন্তু পণ্য আমদানির জন্য আমরা ব্যাংক ঋণ পাচ্ছি না। ফলে আমাদের মতো অনেকেই ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যবসা থেকে সরে গেছে। আমদানিকারক ব্যবসায়ী আশুতোষ মজুমদার বলেন, ডলার-সংকটে কয়েক মাস যাবত ভোগ্যপণ্য আমদানি করছি না। বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলো এখন আমদানি করছে। তাদের কাছে প্রচুর মালও রয়েছে। বাজারে এখন ডালজাতীয় পণ্যের দামও চড়া। বেচাবিক্রি কমে গেছে।

চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র সূত্র জানায়, গত কয়েক মাস যাবত আমদানি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এলসি কমে গেছে। ডলার-সংকটে এলসি কম হচ্ছে।

আমদানি ব্যবসায় জড়িতরা জানান, আগে ১০-১২ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানির এলসি করা যেত। এতে মাঝারি ব্যবসায়ীরা আমদানির সুযোগ পেতেন। আগের মতো ছোট  মাদার ভ্যাসেল এখন চলাচল করে না। ৩০ থেকে ৪০ হাজার টন পণ্যের কম  জাহাজগুলো বহন করে না। আর বিদেশি সরবরাহকারীরা কম পণ্য সরবরাহ দিতে চান না। কম পণ্য আমদানি করতে গেলে খরচ বেশি হচ্ছে। ফলে বড় আমদানিকারকদের হাতে চলে গেছে ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যবসা। এছাড়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন এলসি প্রদান সংকুচিত করেছে। বলতে গেলে ১০-১২ টন পণ্য আমদানির এলসি ব্যাংকগুলো করছে না। আবার ব্যক্তি দেখেশুনে ব্যাংকগুলো এলসি দিচ্ছে বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামে আমদানি পণ্য মজুত রাখার প্রায় ১ হাজার ২০০ বাণিজ্যিক গুদাম রয়েছে। আমদানি পণ্য জাহাজ থেকে খালাসের পর গুদামে রাখা হয়। সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা বিক্রির পর ডেলিভারি দেওয়া হয়। আমদানি কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক গুদামগুলোয় ডালজাতীয় পণ্যের মজুত একেবারে কমে গেছে। সম্প্রতি সময়ে চট্টগ্রামের দুজন আমদানিকারক কিছু গম আমদানি করেছেন। ফলে বাণিজ্যিক গুদামগুলোয় গম, চাল, কেমিক্যালজাতীয় পণ্য ছাড়া অন্য কোনো পণ্য মজুত নেই। তবে বড় আমদানিকারকদের নিজস্ব গুদাম রয়েছে। তাদের গুদামে প্রচুর ডালজাতীয় পণ্য মজুত আছে বলে পাইকারি বিক্রেতারা জানান। চট্টগ্রাম গুদাম মালিক সমিতির সভাপতি শফিক আহমেদ বলেন, বাণিজ্যিক গুদামগুলোতে পণ্যের মজুত কমে গেছে। কয়েক মাস আগে যেসব এলসি হয়েছে সেসব পণ্য আসছে। সম্প্রতি কিছু গম আমদানি হয়েছে।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চিনি, সয়াবিন, ছোলা, মশুর ডাল ও মটরের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। ছোলার দাম বেশি বেড়েছে। গতকাল পাইকারিতে ছোলা প্রতি মণ ২ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে খুচরা বাজারে ছোলা কেজি ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মশুর ডাল পাইকারিতে প্রতি মণ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর মটর বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ২ হাজার ৪০০ টাকায়। আমদানি কমে যাওয়ায় সামনে ছোলাসহ ডালজাতীয় পণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন। অন্য দিকে পাইকারিতে খোলা পাম অয়েল প্রতি মণ ৪ হাজার ৬০০ টাকা ও সয়াবিন প্রতি মণ ৬ হাজার ৬৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর চিনির বাজারও চড়া। পাইকারিতে প্রতি মণ ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

 

 

ইত্তেফাক/ইআ