রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সত্য কথা বলা মানে দায়িত্বশীলতা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৫৯

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলিতেছে—প্রতিপক্ষ দলের সেনাপতি গুরুদেব দ্রোণাচার্যকে হত্যা করিবার জন্য ধর্মপুত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির উচ্চারণ করিলেন একটি কৌশলী বাক্য—‘অশ্বত্থামা হত—ইতি গজ।’ অশ্বত্থামা দ্রোণাচার্যের প্রিয় পুত্র, তিনি মারা গেলে দ্রোণাচার্য অস্ত্র ত্যাগ করিবেন। সুতরাং অশ্বত্থামা নামের একটি হাতি নিহত হইবার পর যুধিষ্ঠির বলিলেন, অশ্বত্থামা মারা গিয়াছে। খুব আস্তে বলিলেন, উহা ছিল হাতি। এই মিথ্যা বলার জন্য যুধিষ্ঠিরকে নরকদর্শন করিতে হইয়াছিল বটে; কিন্তু ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, পৌরাণিক যুগ হইতেই মানুষের মধ্যে কৌশলে মিথ্যা বলিবার প্রবণতা ছিল। 

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাণী হিসাবে মানুষ বরাবরই অন্যকে বিশ্বাস করিতে চাহে। মানুষে মানুষে যত যোগাযোগ হয়, তাহার অধিকাংশই সত্যের ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে অন্যের সততা লইয়া পূর্বানুমান ও বদ্ধমূল ধারণা থাকাটাই যোগাযোগের বড় ভিত্তি। এখন যদি পারস্পরিক আস্থাই শেষ হইয়া যায়, তাহা হইলে মানুষে মানুষে যোগাযোগ টিকিয়া থাকিবে কী করিয়া? এই জন্য দুই সহস্রাধিক বৎসর পূর্বেই গ্রিক কবি থিওক্রিটাস বলিয়াছিলেন—‘সত্যের সহিত দাঁড়াও, যদি তাহা একা করিতে হয় তবুও সত্যের পাশেই দাঁড়াও।’ ছোটবেলা হইতে আমরাও তোতাপাখির মতো পড়িয়া আসিতেছি—‘সদা সত্য কথা বলিবে।’ কিন্তু আমরা কি সত্য কথা বলি? বলা হইয়া থাকে, শুধু জীবন বাঁচাইবার প্রশ্নে মিথ্যা কথা বলা যাইতে পারে; কিন্তু জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন দূরের কথা, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলিবার প্রবণতা অনেকেরই রক্তে-মজ্জায় ঢুকিয়া গিয়াছে। তবে সাধারণ মানুষের হৃদয় দোষে-গুণে ভরপুর হইবে—ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু যিনি নেতা—তিনি কি সাধারণ মানুষের কাতারে নামিয়া মিথ্যার ফুলঝুড়ি ফুটাইতে পারেন? প্রকৃত অর্থে নেতা হইবেন সকলের চাইতে আলাদা, সৎ-ন্যায় নিষ্ঠাবান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্কুলের বইতে প্রেসিডেন্টদের সততার গল্প পড়াইয়া আমেরিকায় বাচ্চাদের সততা এবং মূল্যবোধ শিখানো হইয়া থাকে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকে লইয়া বিখ্যাত একটি গল্প রহিয়াছে যে, বাগানের চেরিগাছ কুড়াল দিয়া কাটিয়া ফেলিবার পর তিনি তাহার বাবার নিকট দোষ স্বীকার করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘আমি মিথ্যা বলিতে পারি না বাবা।’ যদিও এই গল্পটিকে অনেকে বানোয়াট বলেন; কিন্তু গল্পটি সত্য বা বানোয়াট হউক—মূল বার্তাটি হইল—যিনি প্রেসিডেন্ট হইবেন, তিনি শৈশবকাল হইতেই সততার ধারক ও বাহক হইয়া থাকেন। আমেরিকার এক সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী একটি দুর্ঘটনার সত্যকে আড়াল করিবার জন্য প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াইবার যোগ্যতাই হারাইয়া ফেলিয়াছিলেন। অন্যদিকে ১৯৯৮ সালে হোয়াইট হাউজের ইন্টার্ন মনিকা লিউনিস্কির সহিত নৈতিক স্খলনের বিষয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পার্লামেন্টে দাঁড়াইয়া অস্বীকার করিয়াছিলেন। পরে এক তদন্তে তাহার মিথ্যাচার ফাঁস হইয়া যায়। এই মিথ্যাচার ও নৈতিক স্খলনের জন্য তিনি পড়িয়াছিলেন ভয়াবহ বির্তকের মুখে। অর্থাৎ যিনি রাষ্ট্রপ্রধান তিনি জাতিকে ধোঁকা দিতে পারেন না। এই জন্য হোয়াইট হাউজের রাষ্ট্রীয় ভোজসভার কক্ষটিতে খোদাই করিয়া লেখা রহিয়াছে—‘এই ছাদের নিচে শুধু যেন সৎ এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরাই শাসক হিসাবে আসেন।’

গণপ্রজাতন্ত্রী দেশসমূহে জনগণকে বলা হয় দেশের মালিক। এখন কোনো নেতা যদি সত্য আড়াল করেন, মিথ্যাচার করেন, তখন প্রশ্ন জাগিতে পারে—মালিকের সহিত কি মিথ্যা বলা চলে? আসলে সত্য কথা বলা মানে দায়িত্বশীলতা। সুতরাং যিনি মিথ্যা বলেন, তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীতার পরিচয় দেন। আর রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি দায়িত্ব পাইতে পারেন না। সহস্র বৎসর পূর্বে মুণ্ডকোপনিষদে বলা হইয়াছিল—সত্যমেব জয়তে। অর্থাৎ সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। মিথ্যার আরো একটি বিপদ হইল—মিথ্যা বলিবার জন্য অনেক অধিক মানসিক শক্তি খরচ করিতে হয়। এই জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলিয়াছিলেন, ‘সফল মিথ্যুক হইবার জন্য কাহারোই পর্যাপ্ত স্মরণশক্তি নাই।’ যেহেতু কাহারোই এমন স্মরণশক্তি নাই এবং মিথ্যা বলিবার এত শত বিপদ—সুতরাং সত্য বলাটাই বুদ্ধিমানের পরিচায়ক।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন