বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আমরা কবে ‘নাগরিক’ হইয়া উঠিব?

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:৩০

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়াছেন; কিন্তু দেশ শাসনে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় তিনি আমাদের যোগ্য নাগরিক করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারেন নাই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গত প্রায় দেড় দশক ধরিয়া এই দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকিয়া ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করিয়াছেন। তাহার আমলে শহর-গ্রাম-গঞ্জ এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এমন সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হইয়াছে, যাহাতে সামাজিক রূপান্তরের বিষয়টি সহজেই উপলব্ধি করা যায়; কিন্তু নাগরিক সৃষ্টিতে আমাদের এখনো বহু পথপরিক্রমা অতিক্রম করিতে হইবে। আমাদের উপমহাদেশটি পৃথিবীর বিশেষত শিল্পোন্নত দেশের মতো নহে। ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পোন্নত দেশগুলি ব্যক্তি-অধিকার, স্বাধীনতা, আইনের শাসন, এমনকি নীতি-নৈতিকতায় অনেক উন্নত। আসলে একটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নই শেষ কথা নহে। ইহার নাগরিকদের বিশ্বমানের নাগরিকে পরিণত করাটাও রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

একটি দেশ কীভাবে গড়িয়া উঠে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একটি রাষ্ট্রের চারটি প্রধান উপাদান রহিয়াছে। যথা—জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্রের সরকার তথা আইনকানুনের প্রতি জনগণের স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শনের প্রতিও গুরুত্বারোপ করিয়াছেন; কিন্তু ক্ষমতায় থাকুন আর নাই থাকুন, উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতিবিদরা মনে করেন, তাহারা চাহিলে যাহা কিছু তাহাই করিতে পারেন। সেই সকল দেশে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে হাজার হাজার পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি বিতরণ করা হয়। তাহার পর এইগুলি রাস্তায় গড়াগড়ি খায়। অনুষ্ঠান শেষ হইয়া গেলেও ব্যানার-ফেস্টুন ইত্যাদি ঝুলিতেই থাকে। এই সকল পোস্টার, ব্যানার প্রভৃতি যত্রতত্র পড়িয়া থাকিলে তাহাতে একটি নগরের সৌন্দর্যহানি হয়। জাতি হিসাবে বিদেশিদের নিকট আমাদের মাথা হেঁট হইয়া আসে এই অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার জন্য। অথচ দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২ অনুযায়ী এইগুলি আমাদের নিজ দায়িত্বেই মুছিয়া ফেলিতে হইবে বা অপসারণ করিতে হইবে। এই জন্য জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও রহিয়াছে; কিন্তু আমরা কেহই এই আইনের ধার ধারি না। এই পরিস্থিতি দেখিয়া মনে হয়, আমরা যেন ঢাকায় নহে, কমিউনিস্ট কোনো শহরে রহিয়াছি, যাহারা দেওয়াল লিখনের মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেওয়াল মালিকের অনুমতি পর্যন্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। অন্যদিকে লন্ডনে হাইডপার্কে যে যাহার মতো বক্তৃতা দিতে পারেন; কিন্তু এই জন্য কেহই সমস্ত শহর স্তব্ধ করিয়া দিতে পারেন না। আবার শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিতে প্রত্যেক নাগরিকেরই কর্তব্য রহিয়াছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের রাজধানী দিল্লিতেও সেই দেশের নেতাদের ব্যানার-ফেস্টুনে শহরটা সয়লাব থাকে না। আসলে, কাহারো যাতায়াত বা চলাচলের পথে বাধা-প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করা বা কাহারো কর্মঘণ্টা নষ্ট করিবার অধিকার কাহারো নাই।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় বড় আক্ষেপ করিয়া লিখিয়াছেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করো নি।’ আসলে আমরা এখনো মানুষ হইতে পারি নাই, সুনাগরিক হইতে পারি নাই। বিশ্বনাগরিক হওয়া তো বহু দূরের কথা! বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশ দিলেও তাহার স্বল্প সময়ের শাসনামলে তিনি আমাদের প্রকৃত নাগরিকের খাতায় নাম লিখাইতে পারেন নাই। কেননা তাহার সময় আমাদের সমাজটা ছিল আধাসামন্তবাদী সমাজ; কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা সেই কাজটি করিতে পারিব না কেন? শহরের শান্তিশৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষায় নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদেরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে হইবে। আর জনগণকে পথ চলিতে হইবে দেখিয়া-শুনিয়া।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন