‘যতক্ষণ না কেহ একটি প্রাণীকে ভালোবাসে, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাহার আত্মার একটি অংশ সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকেন।’ কথাটি বলিয়াছিলেন নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক আনাতোল ফ্রান্স। প্রাণীকে ভালোবাসা সুনাগরিক হইবারও একটি মাপকাঠি। সেই জন্য উন্নত বিশ্বের সুনাগরিকদের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা, দরদ ও দায়িত্ববোধ আমাদের বিস্মিত করে। আসলে উহাই স্বাভাবিক। আমরা দায়িত্ববোধের জায়গায় এখনো ভোঁতা রহিয়াছি বিধায় ভালো নাগরিক হইয়া উঠিতে পারিতেছি না। ইহার একটি উদাহরণ পশুদের প্রতি আমাদের দরদ ও দায়িত্ববোধ হইতে দেওয়া যায়। সম্প্রতি কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারাস্থ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের পুরুষ হাতি সৈকত বাহাদুরের মৃত্যুর পর নারী হাতি রংমালাও মারা গিয়াছে। এই সাফারি পার্কে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দুইটি হাতির মৃত্যু ঘটিল। একটি হাতি অবশ্য যথেষ্ট বয়স্ক। তবে অন্য হাতিটি কেন মারা গেল—তাহা তদন্ত করিয়া দেখা দরকার।
কিন্তু তদন্ত করিলেই কি সমাধান মিলে? প্রকৃত চিত্র কি তদন্তে উঠিয়া আসে? এই বছরের শুরুতে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে এক মাসের ব্যবধানে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহী মারা যাইবার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছিল। তাহারা প্রতিবেদনও জমা দিয়াছিলেন। কিন্তু সেই অনুযায়ী কি সাফারি পার্কগুলিতে ব্যবস্থা লওয়া হইয়াছে? ইতিপূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়াছে যে, প্রাণীদের খাবারের জায়গাগুলি ভীষণভাবে অপরিষ্কার ও খাবারগুলিও ময়লাযুক্ত। পচা ঘাস কিংবা মাংসের মান যাচাই করিবার কেহ যেন নাই! এই জিনিসগুলি যাহাদের দেখিবার, তাহারা কী করেন? বলিবার অপেক্ষা রাখে না—অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই এই সকল প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়া থাকে। ইতিপূর্বে জেব্রার মৃত্যুর ঘটনার পর জানা গিয়াছে, জেব্রার প্রধান খাবার ভুট্টার ডগা হইলেও সেই ডগাগুলি নষ্ট বা খাওয়ার অনুপযোগী হইয়া পড়িলেও তাহা যাচাই করিবার কেহ থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই মানহীন খাবার খাইয়া প্রাণীগুলি অসুস্থ হয়। প্রস্তুতকৃত খাদ্য, মাছসহ জীবন্ত প্রাণী, দানাদার খাদ্য ও শাকসবজি—প্রতিটি পণ্য সংশ্লিষ্ট ভেটেরিনারি ডাক্তার এবং সুপারভাইজারের উপস্থিতিতে দেখিয়া-শুনিয়া মাপিয়া গ্রহণ করিবার নিয়ম রহিয়াছে। কিন্তু নিয়মগুলি যেন ‘কাজির গরু’ কাগজে আছে গোয়ালে নাই। প্রকৃতপক্ষে, পার্কগুলিতে বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু হইলেও কর্তৃপক্ষ যদি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহা হইলে এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটিতে থাকিবে। যাহা আমরা দেখিতেছি। এমনও দেখা গিয়াছে, পার্কে বিদেশি প্রাণী ব্যবস্থাপনায় যেই নিয়ম থাকা উচিত, তাহা নাই। যেমন জেব্রা যেইখানে বসবাস করে সেইখানে রহিয়াছে জেব্রার খাওয়ার অনুপযোগী উদ্ভিদ ও লতাপাতা। রহিয়াছে বদ্ধ নালা। সেই নালায় পানি জমিয়া থাকে। যে কোনো প্রাণীর উপযুক্ত পরিবেশে সমস্যা থাকিলে তাহাদের আয়ুষ্কালও কমিয়া যায়। তাহা ছাড়া দেশীয় ও বিদেশি প্রাণী ব্যবস্থাপনায় বিস্তর ফারাক রহিয়াছে। যেই সকল প্রাণী বিদেশ হইতে আনা হয়, তাহাদের বসবাস উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করিবার পাশাপাশি বিদেশি প্রাণীদের লালনপালনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা কিংবা প্রশিক্ষণও জরুরি—যাহার ঘাটতি দেখা যায়। এই বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের দেশেও বলিবার মতো তেমন কোনো ব্যবস্থা এখনো গড়িয়া উঠে নাই।
দেশি হউক কিংবা বিদেশি—প্রতিটি প্রাণী যথোপযুক্ত খাবার ও পরিবেশ না পাইলে তাহাদের মৃত্যু ত্বরান্বিতই হইবে। ব্রিটিশ নাট্যকার স্যার মাইকেল মুরপুর্গো প্রাণীর প্রতি তাহার ভালোবাসার প্রকাশ এইভাবে করিয়াছিলেন যে, ‘প্রাণীগুলি বোধগম্য, বুদ্ধিমান, সংবেদনশীল এবং আনন্দদানকারী। আমরা বাচ্চাদের যেইভাবে যত্ন নিই, তেমনি করিয়া তাহাদেরও যত্ন নেওয়া উচিত।’ আসলে ‘উচিত’ তো কত কিছুই, কিন্তু দায়িত্বহীনতা ও লোভের নিকট মাথা বিক্রয় করিলে আমাদের আর উচিতজ্ঞান থাকে না। আমরাও আর সুনাগরিক হইয়া উঠিতে পারি না। চক্ষু মেলিয়া বিশ্বের দিকে তাকাইতে হইবে, যাহারা সুনাগরিক তাহাদের নিকট হইতে শিখিতে হইবে।
