শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নভেম্বর মাসের ডায়ারি কী বলে!

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩:৫৪

নভেম্বর মাসে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন: নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ১৭তম জি২০-এর সামিট হয়ে গেল। জি২০-এর বাৎসরিক সামিটের রেওয়াজ হয় ২০০৭-২০০৮ সালের ভয়াবহ অর্থসংকটের আবহে—সংক্ষেপে, আর্থ্য ক্ষতে পরিশ্রান্ত জি৭ নিজেকে উজ্জ্বল ঝকঝকে দেখানোর জন্য ‘আবির্ভাবরত’ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে—চীন তো বটেই, প্রতিশ্রুতিমানদের নিয়ে বাৎসরিক সামিটের প্রচলন করে।

বালি সামিটের চমকপ্রদ দিক হলো, জি৭ তথা লন্ডন ও ওয়াশিংটন ইউক্রেন-সংকটকে কেন্দ্র করে জি২০ সামিটকে রুশবিরোধী সামিটে পরিণত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বা অন্তত রুশ-চীন সম্পর্কের মধ্যে গোঁজ ঠুকে দিতেও ব্যর্থ হয়। সাদামাটা ভাষায়, জি৭ আটঘাট বেঁধে এসপার-ওসপার পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করে, যেমন রাশিয়াকে বহিষ্কার করা। রাশিয়াকে বের করতে পারলে পৃথিবীর বৃহত্তম রপ্তানিকারক চীন নিশ্চয় উপস্থিত থাকতে উত্সাহী হবে না! চীনও থাকবে না। সামিটের বাকি অতিথিদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রুশবিরোধী ঘোষণাপত্রে সই নেওয়ার দায়িত্ব নেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। মিটিং শুরুর দিন কয়েক আগে পুতিন নিজে থেকেই বলেন যে সামিটে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকবেন না এবং তার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন বৈদেশিক মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। 

কম্বোডিয়ার নমপেনে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংস্থা ‘আসিয়ান’-এর কোভিড-উত্তর প্রথম সামিট শেষে লাভরভ বালি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই মিডিয়ায় খবর হয়ে যায় যে অসুস্থ লাভরভকে বালি বিমানবন্দর থেকে সোজা বালির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যা হোক, সন্ধ্যার মধ্যেই জানা গেল যে খবরটি ফেইক ছিল। 

দুই দিনের সামিট চলাকালীন সম্মিলিত পশ্চিমের মিডিয়া সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বলে যে, ‘অধিকাংশ জি২০ দেশ’ রাশিয়াকে দোষারোপ করতে চায়। অবশ্য বাস্তবে দোষারোপ করে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ। অদোষারোপের দলে থাকে আর্জেনটিনা, ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক এবং অবশ্যই রাশিয়া। অর্থাৎ, জি২০ সমান ভাগে বিভক্ত মত পোষণ করে।

চূড়ান্ত স্টেটমেন্টে তার অনুরণন দেখা যায় :সম্মিলিত পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গির সংক্ষিপ্তসার লিপিবদ্ধ করার পরে ডিবেট বা বিতর্কের ইতি টেনে বলা হয় :পরিস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞাসমূহ সম্বন্ধে অন্য আরো দৃষ্টিভঙ্গি ও ভিন্ন মূল্যায়ন ছিল। আমরা জানি যে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়াদি বিশ্বীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিণাম ডেকে আনতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তাবিষয়ক বিষয়াদি সমাধানের ফোরাম জি২০ নয়। অন্যভাবে, এই প্রথম বার সম্মিলিত পশ্চিম বাকি পৃথিবীর ওপরে নিজস্ব বিশ্বভঙ্গি চাপিয়ে দিতে ব্যর্থ হয় এবং সামিটের উদ্যোক্তা দেশ সাফল্যের সঙ্গে, ‘হয় এসপার-নয় ওসপার পরিস্থিতি’র অবতারণা রোধ করে। 

বালি সামিটের চমকপ্রদ আরেকটি অংশ ছিল :সব প্রটোকল লঙ্ঘন করে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মিটিংয়ে জেলেনস্কি ভিডিওর মাধ্যমে ভাষণ দেন। রাশিয়া তখন আপত্তি করেছিল। কিন্তু প্রটোকল লঙ্ঘন করে বালি সামিটে জেলেনস্কির ভিডিও অংশগ্রহণে রাশিয়া সম্মতি দেয়! 

জেলেনস্কি বরাবরই আদেশ-নির্দেশসমৃদ্ধ বক্তৃতা দিতে অভ্যস্ত। বালি সামিটেও তার অন্যথা হয় না। পেশাগতভাবে জেলেনস্কি কমেডিয়ান-মস্কোর কর্মকাণ্ডের নাটকীয় ফিরিস্তি দিয়ে ‘জি১৯’ থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কারের প্রস্তাব দেন। অর্থাৎ, সম্মিলিত পশ্চিমের হয়ে জেলেনস্কি উপস্থিত রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী ও বৈদেশিক মন্ত্রীদের লক্ষ্য করে বহিষ্কারের হুকুম উচ্চারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে, সামিটে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের মধ্যকার বিরোধ বিতর্ক ইউক্রেনকে নিয়ে ছিল না বিরোধ। বরং যুক্তরাষ্ট্র প্রণীত বিশ্ববিন্যাসের কাছে আত্মসমর্পণ করা কি-না করা নিয়ে। সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার চার অংশগ্রহণকারী বলেছে যে এই কর্তৃত্বময়তার দিন শেষ, আর নয়; বিশ্ব এখন বহুমেরুর বিশ্ব। এই প্রথম বার জেলেনস্কি প্রত্যক্ষ করেন যে তার সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকের দল এ পর্যন্ত যারা নাকি তর্কাতীতভাবে একমাত্র হুকুমকারী ছিল—নিজেদের অবস্থানকে আরো কিছুটা সময় প্রলম্বিত করতে অনায়াসে তাকে এক টুকরো ন্যাকড়ার মতো ছুড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করছে না! কিন্তু জেলেনস্কি বুঝতে পারেননি যে যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ং উপলব্ধি করছে যে বিশ্বীয় পর্যায়ে তার অবস্থান আর তর্কাতীত নয়, দ্রুত নিম্নগামী। তাই রুশ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক স্যালিভেনের কয়েক দফা মিটিংয়ের পরে সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নস ও রুশ ‘এসভিআর’-এর পরিচালক সের্গেই নারিশকিন তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মিটিং করেন! 

ইউক্রেন সম্মিলিত পশ্চিমের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। জেলেনস্কি এখন বেপরোয়া, নিজের সীমান্ত পেরিয়ে মাত্র চার মাইলের মধ্যে পোল্যান্ডের গ্রামে সোভিয়েত আমলের ‘এস-৩০০’ মিসাইল নিক্ষেপ করেন এবং ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারার তাত্ক্ষণিক প্রয়োগের জন্য মহা সোরগোল তোলেন। বাইডেন, জি২০-এর সামিটের আসরে জি৭-এর নিজস্ব সামিট ডেকে বলেন যে মিসাইলের প্রজেক্টাইলে গন্ডগোল রয়েছে; পূর্বমুখী হওয়ার বদলে ছিল পশ্চিমমুখী  (পোল্যান্ডমুখী)। অর্থাৎ, মিসাইল ছুড়েছে কিয়েভ। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই ইমারজেন্সি মিটিংয়ে বাইডেন উপস্থিত অ-পশ্চিমা দেশের কাউকে ডাকেননি।  

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তথা বাইডেন ও সুনাক লাভরভের সঙ্গে জি২০-এর ফ্যামিলি ছবি তুলতে রাজি হননি বলে ছবি তোলার ঐতিহ্যটি প্রোগ্রামে ছিল না।

তবে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা স্থায়ী বাইডেন-শি মিটিং হয়েছে। চীন বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছে, নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ হবে না। এবং ‘স্বাধীন তাইওয়ান’ সমর্থন করে না; একইভাবে ‘দুই চীন’ বা ‘এক চীন, এক তাইওয়ান’ও সমর্থন করে না। চীনের সঙ্গে জোড়াচ্যুতির (ডিকাপলিং) পাঁয়তারাও করছে না এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় না। এত সব ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি! দেখা যাক কী হয়! 

জি২০ সামিটে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে সম্মিলিত পশ্চিমের ব্লক মেন্টালিটির (মাই ওয়ে, অর নো ওয়ে) প্রায় কোনোই আকর্ষণ নেই। জি২০-এর ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও সৌদি আরব ছাড়াও ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথকে ব্রিক্স (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) চুম্বকের মতো টানছে। সম্মিলিত পশ্চিম, জি৭-কে কেন্দ্র করে জি২০ নামক অধস্তন দেশগুলোর যে মেখলা তৈরি করেছিল—শেষ পর্যন্ত সেই মেখলার দেশগুলো আবিষ্কার করে যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তরের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পশ্চিমি মৈত্রী সিস্টেম মান্ধাতা হয়ে গেছে, টিকে থাকার সামর্থ্য হারিয়েছে। বালি সামিটে যে অনৈক্য প্রকাশিত হয়, সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে স্ব-আরোপিত ‘অধিকার’-এর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এখনো দৃঢ়ভাবে আসক্ত এবং প্রয়োজনে নষ্টকারক বা স্পয়লার থেকে পিছপা হবে না।

সব মিলিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও ইরান ব্রিক্সের সদস্যপদের আবেদন করেছে। সম্প্রতি স্বয়ং শি জিংপিংয়ের রিয়াদ ভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ।

রুশ গ্যাসের নতুন ‘হাব’ স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ এবং রুশদের সঙ্গে  ইরানে বৃহৎ মাপের তেল ও গ্যাস সহযোগিতায় অংশগ্রহণের দিন কয়েক বাদে ইস্তাম্বুলে ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্ম সংঘটিত হয়। এবং তুর্কিরা প্রকাশ্যে মার্কিন দূতাবাসের সমবেদনা জ্ঞাপক পত্রটির তীব্র সমালোচনা করে। যা হোক, তুরস্কও ব্রিক্সমুখী মোড় নিয়েছে। তার মানে তার বলয়ভুক্তদের অনেকেই তার সঙ্গী হবে।

ইরান এখন ‘উচ্চ-প্রিসিশনের’ হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইলের অধিকারী, যা নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ফলে স্ট্র্যাটেজিক নিউকসহ ইরানি পারমাণবিক চুক্তিও অর্থহীন এখন। সরল ভাষায় রুশ-চীন জোটে ইরান ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ভুক্ত হলো, যার অর্থ ইরাক, সিরিয়া, হেজবুল্লাহ্, হুথি একই পথ অনুসরণ করবে। যা হোক, সৃষ্টি হলো রাশিয়া-চীন-ভারত-ইরান কোয়াডের।

পশ্চিম এশিয়া যখন পুরাতন ‘নিরাপত্তা কৌশল’কে ত্যাগ করে নতুন নিরাপত্তা কৌশল নির্মাণে মনোযোগী, রূঢ় রুশবিরোধী মুষ্ঠি দিয়ে ইউরোপ তার ‘নিরাপত্তা কৌশল’কে এখনো শক্ত কড়া ন্যাটোর মধ্যে কঠিন জমাট করে রেখেছে।

লেখক: চেক রিপাবলিক প্রবাসী 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন