বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মুক্তিযোদ্ধা নেতা মো. আজিজুর রহমান

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০২

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অগ্রসৈনিক বৃহত্তর দিনাজপুরের বিপ্লবী জননেতা অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান ছিলেন ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) এবং মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমাঞ্চল ক-জোনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আজ ৪ ডিসেম্বর তার ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে তারা একই সঙ্গে পড়াশোনা করতেন এবং বেকার হোস্টেলে  থাকতেন। দুই জনেই ছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ  সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী । ১৯৭১ সালে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হলে অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান, এমএনএ দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর মহল্লায় তার বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নির্দেশনায় বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নির্বাচিত আহ্বায়ক হিসাবে জেলায় নেতাকর্মী ও তরুণদের সংগঠিত করেন। ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যরা দিনাজপুর দখল করলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আঙ্গিক বদলে তাকে সভাপতি করে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ গঠিত হয়। একাত্তরে জুলাই মাসে যুদ্ধ সেক্টরগুলো পূর্ণতা পাওয়ার আগ পর্যন্ত এই পদাধিকার বলেই তিনি দিনাজপুর কেন্দ্রীয় মুক্তিসংগ্রাম কমিটির সভাপতি হিসাবে মুক্তিযুদ্ধকালীন তার লেটারহেড প্যাডে অসংখ্য নির্দেশনা জারি করেছেন। 

মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলো সম্পন্ন করলে আজিজুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর এবং ৬ নম্বর সেক্টর (অর্ধেক) অঞ্চলের  লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় সিভিল অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজার, ফ্রিডম ফাইটার্স রিক্রুটিং ও লিয়াজোঁ অফিসার পদে দায়িত্ব প্রদান করে। জেনারেল ওসমানী স্বাক্ষরিত মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ৩০ আগস্ট জারি করা গোপন পরিপত্র নম্বর :০০০৯জি/২ অনুযায়ী মো. আজিজুর রহমানের সদর দপ্তর ছিল ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত তরঙ্গপুরে। মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত সেই গোপন পরিপত্র অনুয়ায়ী কার্যত তিনি ৭ নম্বর এবং ৬ নম্বর সেক্টর (অর্ধেক) সেক্টরের সব মুক্তিযোদ্ধার রিক্রুটিং ও অস্ত্র  প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনায় সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ছিলেন। উল্লেখ্য, পশ্চিমাঞ্চল প্রশাসনিক ক-জোনের প্রশাসনিক কর্মকর্তার হিসাবেও দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের অবিকৃত তালিকার লাল বইখ্যাত দলিলে মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব কাঠামোয় ‘স্বাধীনতার বীর সেনানী, স্মরণীয় যারা বরণীয়  যারা’ শিরোনাম অধিভুক্তক্রম অনুযায়ী অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমানের কোড ০৭০০০০০০২১ এবং পরে দিনাজপুর-২ আসনের এমএনএ  হিসাবে ০৭০০০০০০৩৯।  

মূলত অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান, এমএনএ-এর নেতৃত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক শাসক দেশদ্রোহিতা ও ৩ হাজার লোককে গণহত্যার অভিযোগ এনে অক্টোবর মাসে সামরিক আদালতে তাকে হাজির হতে সমন জারি করে এবং পরে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) রিপোর্টে বলা হয়, ১৭ আগস্ট ১৯৭১ দুই দফায় ৩০ এমএনএ-কে সামরিক আদালতে তলব। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দলিলপত্র :পঞ্চদশ খণ্ড। পৃষ্ঠা ২২৭। এখানে অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান, এমএনএ-এর  প্রদত্ত  বিবৃতির কিছু অংশ উল্লেখ করা অতি প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ দুই ঘণ্টার জন্য কার্ফু তুলে নেওয়া হয়। এ সুযোগে আমি বেরিয়ে পড়ি এবং ইপিআর বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্থির হয় দিনাজপুর ইপিআর অষ্টম বাহিনীর বাঙালিদের দায়িত্বে  থাকবেন ক্যাপটেন নজরুল হক এবং নবম বাহিনীর দায়িত্বে থাকবেন সুবেদার মেজর আবদুর রউফ। আর আমি বেসামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করব।’

দিনাজপুরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতার ইতিহাসে দেখা যায়,  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিনাজপুর শহরে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম দিনাজপুর জেলা কমিটি গঠিত করে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য এবং তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমানকে প্রথম সহসভাপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। এরপর তিনি  ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের দুই দফায় নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন।  ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের ফলে  বঙ্গবন্ধুর কারামুক্ত হয়ে অক্টোবরের ১০ তারিখে দিনাজপুর সফরে আসেন। সফরের সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান এবং সম্পাদক অধ্যাপক ইউসুফ আলী।  

জননেতা অ্যাডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান অসাধারণ মেধাবী  ছিলেন । ১৯৪৫ সালে ডিস্টিংশন (৮৫ শতাংশ প্রতি বিষয়ে) সহ তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে তৃতীয় স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অনেক ভাষায় পণ্ডিত  আজিজুর রহমান ছিলেন সর্বস্বত্যাগী। এই জননেতা  সম্পর্কে দিনাজপুর তথা বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মেহরাব আলী সম্পাদিত দিনাজপুরের ইতিহাস সমগ্র-পঞ্চম খণ্ডে (পৃষ্ঠা নম্বর ৫৮২) লিখেছেন, ‘দিনাজপুর বারের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, সুলেখক, সম্পাদক, সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের  উত্তেজিত যুগে। যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন যুদ্ধের সংগঠক ও সংস্থানের ব্যবস্থাপনায় প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেন তিনি। ঐ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে অনেকগুলি জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেন, যা দেশবাসীর মনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে অপূর্ব সারা জাগায়। দিনাজপুর বড়মাঠে আয়োজিত ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর বিজয়োত্সবে তার প্রদত্ত ভাষণটিও ছিল উন্মাদনাময়ী, আবেগময়ী ও জ্বালাময়ী।’

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই স্বর্ণসন্তান ৪ ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে দিনাজপুর শহরে ঘাসিপাড়া মহল্লায় ভাড়াবাড়িতে  ইন্তেকাল করেন।

লেখক: সংসদ সদস্য

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন