শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পেশাগত সত্তা ও অপরাধবিজ্ঞান

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৪০

ডাক্তারি পাশ করে বিসিএস পুলিশ অফিসারে যোগদান করছেন অনেকেই, আবার দেশসেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে অনেকেই যোগদান করছেন প্রশাসন ক্যাডারে। বিষয়টি সরাসরি পেশার বৈপরীত্যকে তুলে ধরে, অথচ সেখানে পেশার কোনো নিজস্বতা নেই। এমনটি কি হওয়ার কথা ছিল? নিশ্চয়ই ছিল না। তবু হচ্ছে এবং আরো কত দিন এই ধারা চলবে, তা বলা মুশকিল। তবে সবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় প্রতিটি পেশার সত্তা আনয়ন করা জরুরি। 

একবার ভেবে দেখুন, খুব ভালো হয় যখন ডাক্তার সাহেব মেডিক্যাল বিদ্যায় গবেষণা করেন কিংবা সারাক্ষণ রোগীর সেবায় নিয়োজিত থাকেন। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যদি দেশের প্রকৌশল খাত নিয়ে গবেষণা করেন, তাহলে সেটি অনেক বেশি প্রাণবন্ত এবং দেশের জন্য মূল্যবান হিসেবে পরিগণিত হবে। এই ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ডাক্তার সাহেবকে এক্ষেত্রে দোষারোপ করার কোনোরূপ সুযোগ নেই। কেননা, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পুলিশ ক্যাডার কিংবা প্রশাসন ক্যাডারে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, অন্যান্য ক্যাডারে সে রকম নেই। শুধু তাই নয়, অন্য পেশায় উল্লিখিত দুই ক্যাডারের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম। তাই সবাই পছন্দের তালিকায় শুরুতেই প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারকেই পছন্দ করে তালিকা পেশ করেন। বিসিএস ফোবিয়া শিক্ষার্থীদের ক্রমশ বিসিএসমুখী করছে। বাংলাদেশে এখনো মেধাবীরা প্রকৌশলী তথা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, সংগত কারণে ডাক্তার ও প্রকৌশলীদের উদাহরণ হিসেবে টানা হয়েছে। 

শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানকৃত সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক যেসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন, সে বিষয়ে সবারই প্রায় জানা। অন্যদিকে একজন সার্কেল এএসপি একটি গাড়ি, ড্রাইভার, গানম্যান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। চাকরি কিন্তু দুটোই পিএসসির আনুকূল্যে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে এক পক্ষ বেশ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন, অন্যপক্ষ কোনোরূপ বাড়তি সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অনেকেই আবার বলে থাকেন, চাকরির বৈচিত্র্যের কারণে পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ-সুবিধা বেশি; কিন্তু এই যুক্তি আমজনতা মানতে নারাজ। সেক্ষেত্রে সব থেকে গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো পেশাগত সত্তা আনয়ন করা এবং সেটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। 
 
পেশাগত সত্তা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে লক্ষ্য ও অভিলক্ষ্য স্থির রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজবে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট সময় থেকে ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনাচিন্তার সুযোগ পেলে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বিষয়টি এমন—বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীকে ব্যাংকার হিসেবে নিয়োগ না দিয়ে ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের ব্যাংকার হিসেবে নিয়োগ দিলে ব্যাংক ও জাতি উভয়েই লাভবান হবে। প্রেক্ষিতে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীকে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা, বাংলা ভাষার শিক্ষক, অধ্যাপক ও সংশ্লিষ্ট কর্মে নিযুক্ত করা হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে এবং পেশাগত স্বাজাত্য সৃষ্টি হবে। 

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপরাধবিজ্ঞান তুলনামূলকভাবে একটি নতুন বিষয় হিসেবে সংযোজিত হয়েছে। যদিও ২০০৩ সালে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স নামে একটি বিভাগ যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিভাগটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভাগটির পাঠদান শুরু হয়। এছাড়া পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশে এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রাম চলমান রয়েছে। এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের পেশাগত সত্তা বজায় রাখা সম্ভব হলে বাংলাদেশে অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধ করে জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনয়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। 

উল্লেখ্য, এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানের জন্য সুযোগ প্রদান করতে হবে। বিশেষ করে বিসিএস পুলিশ, সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা, এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা Introduction to Policing, Evidence Based Policing, Contemporary Issues in Policing, Forensic Science, Criminal Investigation, White Collar and Corporate Crime, Emerging Techniques and Technologies in Policing ইত্যাদি বিষয়ে অধ্যয়ন করে থাকে। সেক্ষেত্রে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের যদি বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ প্রদান করা হয়, তাহলে জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে, যাতে করে অপরাধের মূলোৎপাটন করা সহজতর হয়।

এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা অপরাধ সাংবাদিকতা অধ্যয়নেও বেশ পারঙ্গম (Media and Crime কোর্সটি শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়ে থাকে)। অপরাধ সাংবাদিকতায় এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে সাংবাদিকতায় নতুন নতুন বিষয়ের সংযোজন হবে নিঃসন্দেহে। শুধু তাই নয়, কাউনসেলিংয়ের ক্ষেত্রে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের অফুরান সম্ভাবনা রয়েছে (Psychology of Criminal Behaviour কোর্সটি বিভাগে পড়ানো হয়ে থাকে)। রাষ্ট্রকে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, সুযোগ দিলেই পেশাগত সত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শিক্ষার্থীরা অনার্স পড়াকালীন চাকরিমুখী না হয়ে পঠন-পাঠন ও গবেষণায় আরো মনোযোগী হবেন। কেননা, তখন বিষয়ভিত্তিক চাকরির নিশ্চয়তা থাকবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। কেননা, এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা Human Rights, Drug Trafficking, Transnational crime প্রভূত বিষয়ে পড়াশোনা করে থাকেন। এছাড়া বিচার-সালিশি ব্যবস্থাপনায় এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া জরুরি (Victimology and Restorative Justice পড়ানো হয় শিক্ষার্থীদের)। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে জোরদার করার নিমিত্তে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি পুলিশ পাবলিকের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ককে বৃদ্ধি করবে এবং অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। মানি লন্ডারিং, সাইবার ক্রাইম, এনভায়রনমেন্টাল ক্রিমিনোলজি, আইন প্রভৃতি বিষয়ে পাঠদান করানো হয়ে থাকে বিধায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়োগদান করা যেতে পারে। 

সবিশেষ যে কথাটি বলতে হয়, প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য পেশাগত সত্তার অনুশীলন রাষ্ট্রীয়ভাবে ও বেসরকারিভাবে অনুসরণ করা উচিত। এতে উক্ত ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বাড়ে এবং কাজের প্রতি মনোযোগী হওয়াটা অনেকাংশে সহজতর হয়। আমরা প্রত্যাশা করি, পেশাগত সত্তা অবশ্যই অনুসরণ করা উচিত এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি ও জাতি উভয়ই উপকৃত হবে।

লেখক :সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন