বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সাক্ষী সুরক্ষা আইন কেন জরুরি

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:০০

কথায় বলে, ‘উইটনেসেস আর দ্য আইজ অ্যান্ড ইয়ারস অব জাস্টিস’। ইহার অর্থ হইল—সাক্ষীরাই বিচারব্যবস্থার চক্ষু ও কর্ণ। অথচ সেই সাক্ষীকেই হত্যার ঘটনা ঘটিতেছে একের পর এক। সম্প্রতি বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা বাঁশবাড়িয়ায় শামীম হাওলাদার নামে একজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হইয়াছে, যিনি ছিলেন একজন ধর্ষণ মামলার সাক্ষী। ইহার পূর্বে গোপালগঞ্জে মিনা মোটরসের মালিক মিন্টু মিনাকে হত্যা করা হয়। তাহার অপরাধ, তিনি ছিলেন মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাইদুর রহমান বাসু হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। মামলার সাক্ষীদের উপর এইভাবে হামলা, হত্যা, নির্যাতন, হুমকি-ধমকি ইত্যাদির ঘটনা আমাদের দেশে অহরহই ঘটিতেছে। ফৌজদারি স্পর্শকাতর মামলা হইতে শুরু করিয়া মাদক মামলার সাক্ষীকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হইতেছে। এই হুমকির ফলে সাক্ষীকে কোর্টে হাজির করা যাইতেছে না। আর সাক্ষী না আসায় বৎসরের পর বৎসর মামলা পড়িয়া থাকিতেছে। আমাদের বিচারব্যবস্থার এই সমস্যার সমাধানে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করা আজ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাক্ষীর নিরাপত্তায় আইন রহিয়াছে; কিন্তু এই বিষয়টি আমাদের দেশে বরাবরই উপেক্ষিত হইয়া আসিতেছে। দেশের বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে ইহা একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক সময় সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করিয়াও সাক্ষীদের হাজির করা যাইতেছে না। হাজির হইলেও তাহারা ভয়ে সত্য কথা বলিতেছেন না। ইহাতে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হইতেছে এবং অনেক সময় দাগি আসামিরাও খালাস পাইয়া যাইতেছে। ২০০২ সালে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ এই ধরনের আইন প্রণয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করিয়াছিলেন। ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা বিচার শুরু হইলে সাক্ষীদের প্রতি হুমকি ও হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এইরূপ আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়। ২০১১ সালে আইন কমিশন এই সংক্রান্ত ১৯ দফার একটি সুপারিশ পাঠায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টও এই ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশ জারি করেন। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষী সুরক্ষায় আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়; কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইহা এখনো লেজিসলেটিভ বিভাগেই ফাইলবন্দি। এখনো ইহা চূড়ান্ত করা হয় নাই। গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানাইয়াছিলেন যে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার আইন করিবার বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন। আমরা আশা করি, শিগিগরই এই ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে।

যুক্তরাষ্ট্রে স্পর্শকাতর মামলায় সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা এমনকি সাক্ষ্য গ্রহণ-পরবর্তী সময়েও তাহাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। গুরুত্ব বিবেচনায় সাক্ষীকে সুরক্ষা দেওয়াটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ইহার ব্যতিরেকে অধিকাংশ মামলায় সাক্ষী পাওয়া যাইবে না। ইহাতে দেশে অপরাধপ্রবণতা বাড়িতেই থাকিবে। অপরাধীরা যদি ধরিয়া লয় যে, কেহ জানমালের ভয়ে সাক্ষী দিতে যাইবে না, তাহা হইলে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হইবে না। আমাদের দেশে করোনা পরিস্থিতি চলাকালে ২০২০ সালের ৯ মে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ইহার আওতায় ঐ বৎসর ১২ মে হইতে শুরু হয় ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম। পরে অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করিয়া ২০২০ সালের ৯ জুলাই আইন হিসাবে পাশ করা হয়। ইহাতে আসামিপক্ষের হুমকি-ধমকিতে থাকা ভীতসন্ত্রস্ত সাক্ষীর ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সাক্ষ্যপ্রদানের সুবর্ণসুযোগ তৈরি হইয়াছে। ইহা একটি আশাব্যঞ্জক দিক; কিন্তু এই আইনটি কার্যকর করিতে হইলে ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্য আইনের সংশোধন প্রয়োজন। আমরা মনে করি, সাক্ষীর সুরক্ষায় অবকাঠমোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এই সংক্রান্ত আইনগত সংস্কার অপরিহার্য। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন বলিয়া আমরা প্রত্যাশা করি।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন