বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রতিবন্ধিতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০৮

প্রতিবন্ধিতা শুধু শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক বা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা নয়; এটি কখনো কখনো পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সমাজের সামগ্রিক সচেতনতা বা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও ওতপ্রতভাবে জড়িত। একজন প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিশু বা ব্যক্তিকে একটি পরিবার বা সমাজ কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর ঐ শিশু বা ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ ও ভবিষ্যৎ জীবন নির্ভর করে। কখনো একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সামান্য প্রতিবন্ধকতাও সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে তার জীবনে অনেক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, আবার কখনো অনেক সীমাবদ্ধতা বা অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও পরিবার বা সমাজের উন্নততর মানসিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা বা সঠিক পরিচর্যার ফলে ব্যক্তির সামগ্রিক বিকাশসাধন তথা সমাজের মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে নিজেকে বিবেচিত করতে পারে। 

সোশ্যাল স্টিগমা বলতে মূলত পরিবেশগত বা সমাজের ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রতিবন্ধিতাকে হেয় প্রতিপন্ন করা, কলঙ্ক দেওয়া, অপবাদ দেওয়া, কারো ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, কারো সীমিত ক্ষমতাকে উপেক্ষা করে তাকে সামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখা ইত্যাদি দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝায়। এজন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ সমাজে প্রতিনিয়ত নানা বৈষম্যের শিকার হয়, সমতা ও ন্যায্যতাভিত্তিক আচরণ থেকে বঞ্চনার মুখোমুখি হন। আর এসব কারণে ‘সামাজিক প্রতিবন্ধিতা’ অনুধাবন ও তার কুফল সম্পর্কে জানা আবশ্যক। 

আমরা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধিতা নিয়ে নানারকম ভ্রান্ত ধারণা ও বিশ্বাস, কুসংস্কার, অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা শুনে থাকি। যদি সঠিকভাবে বা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিবন্ধিতাকে না বোঝা যায়, তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমাজে কখনো সমতাভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না এবং প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবে না; বরং তারা সমাজ বা রাষ্ট্রের করুণার পাত্র হয়ে আমাদের বোঝা হিসেবে নিজেদের মধ্যে আত্মগ্লানিতে ভুগবে।

প্রতিবন্ধিতাকে নিয়ে আমাদের সমাজের বেশ কিছু অপব্যাখ্যা বা ভ্রান্ত ধারণা আছে। প্রথমত আমরা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তার প্রতিবন্ধিতার জন্য দায়ী করে থাকি। শুধু ব্যক্তিকে নয়, ব্যক্তির পরিবার বা স্বজনরাও এই অপবাদ থেকে রেহাই পান না। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও ব্যক্তি কখনোই এর দায়ভার নিয়ে সারা জীবন কলঙ্কিত হতে পারে না। 

অনেক ক্ষেত্রে অনেক কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবও প্রতিবন্ধিতাকে বোঝার ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে না। ধর্মের অপব্যাখ্যা, অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-ধারণা, পুরোনো ধ্যানধারণা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত প্রতিবন্ধিতা ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যদিও সেগুলোর কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই। কৃতকর্মের ফল হিসেবে, উত্তরাধিকার সূত্রে, পাপ বা অভিশাপ ইত্যাদি বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রতিবন্ধিতাকে সমাজ অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। 

প্রতিবন্ধিতা কখনো সংক্রামক কোনো রোগ নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা পরিবার ঘনিষ্ঠ হলেও তা অন্যের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। অথচ সামাজিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী শিশুর সঙ্গে খেলতে না দেওয়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে না দেওয়া সম্পূর্ণরূপে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। আর এভাবে মূলধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে না পারার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখে নিজেদের অভিশপ্ত বলে মনে করে ও হীনম্মন্যতায় ভোগে।

একটা সময়ে প্রতিবন্ধিতাসংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের টার্ম বা শব্দ ব্যবহার করা হতো। এসব মানহানিকর বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতাকে হেয় প্রতিপন্ন করার টার্মগুলো মানুষের সচেতনতা ও শিক্ষা অর্জনের ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। কারো সীমিত ক্ষমতা বা জন্মগত শারীরিক-মানসিক অসুবিধাকে পুঁজি করে একধরনের সমাজ সংস্কারক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদাকে হীন করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে।

এসব সামাজিক অসচেতনতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার থেকে উত্তরণের উপায়সমূহ কী? সমাজের প্রত্যেক স্তরে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে যথাযথ তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন ও সংবেদনশীল করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, র‍্যালি, পোস্টার, মাইকিং, সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে এ সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যেতে পারে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক যে কোনো ক্রিয়াকলাপে বৈষম্যের বিলোপ ঘটানো জরুরি। বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সমতা ও ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে মনোযোগী হতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তার পরিবারকে হেয় না করে বরং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। এতে তারা এক দিকে নিজেদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতে পারবে, অন্য দিকে নানা রকম উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করার সুযোগ লাভ করবে। পারস্পরিক ভাতৃত্ববোধ ও ভালোবাসাই পারে এ ধরনের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের পথ মসৃণ করতে।

সুশিক্ষা একধরনের হাতিয়ার। এ হাতিয়ারের মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকে গুরুত্ব না দিয়ে বিজ্ঞানমনস্ক, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন জ্ঞান অর্জনের বিষয়কে গুরুত্বারোপ করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধিতাসংক্রান্ত ভ্রান্তধারণা ও অপব্যাখ্যা সমাজ থেকে দূরীভূত হবে। পরিশেষে, ‘ভিন্নতাই বৈচিত্র্য’—এ স্লোগানকে সমাজের প্রত্যেক স্তরে অনুধাবনের সুযোগ দিতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও আমাদের মতো সন্তান, ভাই, বোন, আমাদের মতো নাগরিক, আমাদের মতো তাদেরও এ সমাজে সমান অধিকার রয়েছে—এ বিষয়গুলো সবাইকে বুঝতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সীমিত সক্ষমতাকে পরিচর্যা করে ন্যায্যতাভিত্তিক সুযোগ প্রদান করলে তারাও সফল হতে পারবে। কাজেই, সামাজিক সকল কুসংস্কার ও নেতিবাচক ধ্যানধারণা পরিহার করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে সম্মান প্রদর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আলোকিত টেকসই সমাজ গঠনের অন্যতম নিয়ামক।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন