বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাশিয়ান তেলের মূল্যসীমা বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৩৮

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় গ্রুপ অব সেভেনের (জি৭) তরফ থেকে ‘কড়া ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হবে—এটা আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেল জি৭কে। রাশিয়ান তেল ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ‘প্রাইস ক্যাপ’ বা সর্বোচ্চ মূল্যসীমা বেঁধে দিল জি৭ভুক্ত দেশগুলো। ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অফিস অব ফরেন অ্যাসেট কন্ট্রোল (ওএফএসি) রাশিয়ান তেলের ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে লম্বা নির্দেশিকা সংবলিত এই মূল্যসীমা প্রকাশ করেছে, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বলা বাহুল্য, এসংক্রান্ত নির্দেশিকা মেনে চলতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে ওএফএসির পক্ষ থেকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অ্যাম্বাসেডররা ব্যারেলপ্রতি ৬০ মার্কিন ডলারের প্রাথমিক নির্ধারিত দরে স্বাক্ষর করেছেন। প্রাইস ক্যাপে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রত্যেক সদস্যকেই আগামী দিনে এতে স্বাক্ষর করতে হবে বলে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এর ফলে শিপিং, বিমা এবং অপরিশোধিত তেলের চালানের ট্রেডিং, ব্রোকিংসহ বিভিন্ন পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার মাধ্যমে তেল কেনার ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর বিপত্তি বাড়বে। কিন্তু যুদ্ধবাজ পুতিনকে থামাতে রাশিয়ার রাজস্বের লাগাম টেনে ধরতে এর থেকে মোক্ষম অস্ত্র আর কী-ই বা ছিল জি৭-এর হাতে! 

কিছু ইইউ সদস্য তেলের মূল্যসীমা আরো নামিয়ে আনার পক্ষে। এর কারণ, তেল বিক্রির মাধ্যমে রাশিয়া যে মুনাফা করছে, তা যাতে আটকে দেওয়া যায়। তাদের যুক্তি, ৬০ ডলার এখনো অনেক অর্থ! এখনো তেল থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় করার সুযোগ রয়েছে রাশিয়ার হাতে। যা হোক, প্রাইস ক্যাপ বা মূল্যসীমা কার্যকরের পর এখনো যদি তেল কেনার ক্ষেত্রে ভোক্তারা অস্বচ্ছ পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে এই পদক্ষেপের প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়বে। বেধে দেওয়া অর্থে তেল কেনার বাধ্যবাধকতার কারণে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর জন্য তেলপ্রাপ্তিকে কঠিন করে তুলবে। অনিয়ন্ত্রিত দালাল ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে ভোগান্তি বাড়বে বহুগুণ। যখন নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটবে, তখন অনিবার্যভাবে এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এর ফলে প্রাইস ক্যাপে স্বাক্ষরকারীদের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে। এতে রাশিয়ার পণ্য (তেল-গ্যাস) বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা রাখার পরও মস্কোর রাজস্ব কমানোর এই দ্বৈত নীতির লক্ষ্য অপূরণীয়ই থেকে যেতে পারে।

প্রাইস ক্যাপের প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে, কোনো সন্দেহ নেই। বেশ বড় ধরনের বৈশ্বিক প্রভাবের কথাই ধরা যেতে পারে। এর ফলে রাশিয়ার রপ্তানি রাজস্ব ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। কতটা হ্রাস পাবে, তা বোঝা যাবে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলসসহ অন্যান্য দেশের রাজধানীতে তেলপাম্পে তেলের দাম ওঠানামা করার চিত্র দেখে। রাশিয়া যে দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রি করে থাকে, বেঁধে দেওয়া দাম আপাতত তার নিচে নয়। তবে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় মস্কো কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তা দেখার বিষয়। ধরে নেওয়া হয়, রাশিয়ার সরবরাহকৃত বেশির ভাগ তেল এখনো বাজারে রয়ে গেছে তথা আপাতত বৈশ্বিক দামের ওপর তেমন একটা প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু প্রাইস ক্যাপের কারণে যদি বিশ্বব্যাপী হঠাত্ করে দাম বেড়ে যায় কিংবা রাশিয়াকে আরো বেশি মূল্যছাড়ে বাধ্য করার কথা চিন্তা করা হয়, সে ধরনের পরিস্থিতিতে রাশিয়া কী ব্যবস্থা নেবে? বিশ্ববাজার অস্থির করে তুলতে মস্কো সরবরাহ কমানোর পথ ধরবে—এ কথা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। সেক্ষেত্রে আগামী দিনে প্রাইস ক্যাপ এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। রাশিয়া বিক্রি বা সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বিশ্ববাজারে দাম অসহনীয় করে তুললে প্রাইস ক্যাপের প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সেই অবস্থায় প্রাইস ক্যাপ ৬০ ডলারে আটকে থাকবে বলে মনে হয় না। যদিও জি৭ভুক্ত সরকারগুলো যে কোনো মূল্যে এটা অনুসরণের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা বলেছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রাইস ক্যাপ নামিয়ে নেওয়া হতে পারে, আবার ওপরেও ওঠানো হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

এখন বড় প্রশ্ন হলো, প্রাইস ক্যাপের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে? রাশিয়ার রপ্তানি আয় কমেছে বলে শোনা গেছে ইতিমধ্যে। অর্থাৎ, তেলের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে রাশিয়ার আয়ও কমে গেছে স্বাভাবিকভাবে। অন্যদিকে গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি বেসামাল হয়ে পড়েছে, যা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। ইউরোপে গ্যাসের প্রবাহ কমানোর সিদ্ধান্তের কারণেও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশটির অর্থনীতি। সব মিলিয়ে নাজুক অর্থনীতি বিপাকে ফেলে দিয়েছে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে। তাই এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন পুতিন। যুদ্ধের দৈনন্দিন বিপুল ব্যয়ের সংস্থান পুতিনের জন্য মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি সূচক যেভাবে ওপরের দিকে উঠছে, সামনের দিনে তা যে পুতিনের ঘাড়ে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আগামী অন্তত বছর তিনেক বাজেট ঘাটতিতে পড়বে রাশিয়া—এমন পূর্বাভাস রয়েছে। এজন্য মূলত দায়ী ইউক্রেন যুদ্ধে দেশটির বিপুল অর্থ ব্যয়। 

প্রাথমিকভাবে জাতীয় কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ ধারের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি পূরণ করার নীতি থাকলেও সামনের দিনগুলোতে এমন চিন্তা খাটবে না। কারণ, প্রতি বছর তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে প্রচুর অর্থ আয় হলেও এবার আয়ের থলি একপ্রকার শূন্য! এই অবস্থায় শোনা যাচ্ছে, দেশীয় বাজার থেকে ঋণ নেওয়ার কথা চিন্তা করছেন পুতিন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রেও চোখে সরষে ফুল দেখতে হবে তাকে। মোট কথা, কোনো দিকেই কূল-কিনারা খুঁজে পাবেন না পুতিন। বাস্তবতা হলো, আজকের দিনে তেলের রাজস্ব অনেক বেশি প্রয়োজন রাশিয়ার। তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থ ছাড়া স্বাভাবিক চলাচল পুতিনের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। আর এ কারণেই হয়তো যে কোনো পরিস্থিতিতে তেল বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি। যদিও বাস্তবতা বেশ কঠিন পুতিনের জন্য। তেল বিক্রিতে প্রাইস ক্যাপ যতই বাধা সৃষ্টি করবে, পুতিনের চলার পথ ততই বন্ধুর হয়ে উঠবে। আর চরম বেকায়দায় পড়ে হাঁসফাঁস করা ছাড়া পুতিনের আর কিছুই করার থাকবে না।

লেখক: রিড ব্লেকমোর—আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল এনার্জি সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর। ব্রায়ান ও’টুল—মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিসের সাবেক সিনিয়র অ্যাডভাইজার
আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন