নুরুল করিম
যেদিন বাবার হাত ধরে ৮ বছরের ফাহিম মোহাম্মদ ফ্রান্স পাড়ি দিয়েছিলেন সেদিন জীবনের নাটকীয়তা অজানাই ছিল। তবে তাঁর বাবা নুরে আলম এটাই জানতেন, যাচ্ছি তবে ঠাঁই না-ও হতে পারে সেখানে। সেই ভাবনাই সত্য হলো, রাজনৈতিক আশ্রয়ে ফ্রান্সে থাকার চেষ্টা ব্যর্থ। তাও একবার নয়, দু-বার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কোনো উপায় না পেয়ে নুরে আলম পরিবার নিয়ে প্যারিসে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে কাটাতে থাকেন তাঁদের জীবন। সেই জীবনের মোড় ঘোরালেন ছোট্ট ফাহিম, যা অকল্পনীয়।
তার আগে ফাহিমকে নিয়ে বাবা নুরে আলমের চিন্তার কমতি ছিল না। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে ব্যর্থ হন বার বার। নাগরিকত্ব বা থাকার অনুমতি ছাড়া ভর্তি নেবে না কোনো প্রতিষ্ঠানই। এদিকে ফাহিম নিজের মতো করে দাবার চাল খেলেই যাচ্ছেন। ফ্রান্সে আসার আগে থেকে দাবাই ছিল ফাহিমের ধ্যান-জ্ঞান। সেটা এতটাই যে অবৈধ প্রবাস জীবনের দুঃসময়েও দাবার তালিম নিতে থাকে। সে সময়গুলো কেমন ছিল? মেইলের মাধ্যমে জবাব দিলেন ফাহিম। তাঁর কথায়, ‘আমরা ফ্রান্সের যে মহল্লায় থাকতাম সেখানে ক্লাব টমাস দু বুর্গেনেফ নামের একটি ক্লাব ছিল, সেখানে নিয়মিত দাবা খেলতো সবাই। তাঁদের দেখাদেখি অনেককিছুই শিখেছি। যেহেতু স্কুল ছিল না, দিনের বেশিরভাগ সময়ই পড়ে থাকতাম ওখানে।’
সাহস করে একদিন মহল্লার দাবা খেলোয়াড়দের ফাহিম বলেই ফেললো, ‘আমিও খেলবো।’ তাঁরাও তাঁকে সুযোগ দেয়। প্রথমবারই ফাহিম যেন দাবার বোর্ডে ছক্কা হাঁকালেন। তাঁর খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে তাঁরা আরো ভালো করে দাবার চাল শেখালেন। এমনকি তাঁদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এক সময় ফ্রান্সের জাতীয় দাবা দলের সাবেক প্রশিক্ষক জাভি পারমন্টিয়েরের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন ফাহিম। এরপরই পাল্টে যেতে থাকে ফাহিমের জীবন। একে একে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার শিরোপা জিততে থাকেন তিনি। এমনকি ফ্রান্সের জাতীয় জুনিয়র (অনূর্ধ্ব-১২) দাবায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। তাঁকে নিয়ে স্থানীয় ও ওই দেশের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে বড় বড় শিরোনাম হয়, নজরে আসে সবার। রাস্তায় হাঁটতে গেলে তাঁকে সবাই চিনে ফেলতো। ফাহিম বলেন, ‘তখন রাস্তায় দেখে অনেকেই আমার সঙ্গে ছবি তুলতো। ভালোই লাগতো।’
২০১২ সালের ১১ মে, দিনটি ছিল নুরে আলমের কাছে স্বপ্নের মতো। এটা সম্ভব হয়েছে ফাহিম মোহাম্মদের জন্যই। অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট পান নূরে আলম। এদিকে ফাহিমও স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সেদিনের ঘটনা এখনো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ফাহিমের। সেদিন তাঁর গায়ে ছিল একটি সাদা রঙের জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট। প্রায় ১৫/২০ জন গণমাধ্যমকর্মী তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, তোমার অনুভূতি কী? উত্তরে সেদিন ১২ বছরের ফাহিম অর্ধেক বাংলা এবং ভাঙা ভাঙা ফরাসি ভাষায় বলেছিলেন, ‘অনেক ভালো। আমি আপনাদের মন জয় করতে চাই।’
ফাহিম এখনো ফরাসি ভাষা ভালোভাবে জানেন। শুধু তাই নয়, পরের দু-বছরে সবার মন জয় ঠিকই করেছেন। ২০১৩ সালে গ্রিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব দাবা স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব-১৩ বিভাগে সেরা হয়েছেন। ইউরোপিয় চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলেছেন ফাহিম। বিশ্ব জুনিয়র দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি। বিপর্যয়ের মুখেও ভেঙে না পড়ে লড়াকুর মতো অসীম দৃঢ়তা দেখিয়েছেন ফাহিম ও তাঁর বাবা। দাবার বোর্ডে জীবনকে জয় করেছেন। ফ্রান্সের দাবা ফেডারেশন ও ফরাসি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় তাঁদের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়।
ফাহিমকে নিয়ে বই ও চলচ্চিত্র
ফাহিম বলেন, ‘আমার ঝুলিতে যখন একে একে নানা সাফল্য ও ট্রফি আসতে থাকে তখন ফ্রান্সে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় আমার সাক্ষাত্কার ছাপানো হয়। টিভিতেও বহুবার আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছে। হঠাত্ একদিন একটা প্রকাশনা সংস্থা থেকে কল এলো। বললো, আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমিও সাধারণভাবে রাজি হলাম। দেখা হওয়ার পর আমাকে বললো আমার জীবনের গল্পটা তাঁরা ছাপাতে চায়। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। টানা ১১ দিন জীবনের গল্প শুনিয়েছি তাঁদের।’
২০১৪ সালে ফাহিমের বলা ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ওপর নির্ভর করা গল্পে প্রকাশিত হয় ‘অ্যা ক্ল্যানডেস্টাইন কিং’। বইটি বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। সে বই থেকেই ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত হয় ২০১৭ সালে। সিনেমার নাম রাখা হয় ‘ফাহিম’। চলচ্চিত্র বানিয়েছেন ফরাসি পরিচালক পিয়ের-ফ্রঁসোয়া মার্তা-লাভাল। চলচ্চিত্রে তাঁর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আহমেদ আসাদ। নূরে আলম চরিত্রে মিজানুর রহমান। দু’জনই প্রবাসী বাংলাদেশি। ফাহিমের কোচ জাভি পারমন্টিয়েরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দেশটির বিখ্যাত অভিনেতা জেরার দেপার্দ্যুকে। ছবিটির শুটিং হয়েছে প্যারিস, কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার পর্যটন কেন্দ্র টাকিতে। জানা যায়, আগামী ১৬ অক্টোবর ফ্রান্সের বড়পর্দায় মুক্তি পাবে ছবিটি।
ফাহিম বলেন, ‘যখন বলা হলো আমার নামে সিনেমা নির্মাণ করা হবে তখন বিশ্বাস হচ্ছিল না। যেদিন আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছিল সেদিন তাঁদের বললাম, আমার জীবনে তো এখনো অনেক সংগ্রাম করা বাকি। কিন্তু তাঁরা বললো, আমার জীবনের সেরা সময়টাই ছিল ৮ থেকে ১৪ বছর।’
বাংলাদেশ নিয়ে ফাহিম
ঢাকার ডেমরায় কাটানো ছোটবেলাকে এখনো মিস করেন। ফাহিম বলেন, ‘ঢাকায় থাকাকালীন সময়েই এলাকার অনেককেই দাবা খেলায় ডুবে থাকতে দেখতাম। তখন থেকেই মূলত আমার দাবার প্রতি ভালোবাসা শুরু হয়। আমি এখনো সে সময়টা ভুলতে পারিনি। দাবা ছাড়াও ফুটবল খেলা হতো সেসময়। দিনগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে। আমি বাংলাদেশে যেতে চাই।’
