সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান
ব্যাঙ্গালোর হচ্ছে ভারতের অন্যতম পর্যটন নগরী। যে কাজে গিয়েছিলাম সেটা ৩ দিন পিছপা হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিলাম অযথা বসে না থেকে ব্যাঙ্গালোর শহরটা ঘুরে দেখা যাক। প্রথমেই গেলাম শহরের মালাভিতে অবস্থিত বিখ্যাত লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে প্রবেশ করতে মাথাপিছু মাত্র ২০ রুপি খরচ করতে হবে। আমরা ভেতরে প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম সুবিশাল একটি সাইনবোর্ড। সেখানে পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেনের ম্যাপ আঁকা এবং বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। নির্বিঘ্নে ঘুরে ফিরে বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখার জন্য মোবাইলে ম্যাপের একটি ছবি তুলে নিলাম। ম্যাপের একটু সামনেই আরেকটি সাইনবোর্ডে আছে এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের ইতিহাস। সেখান থেকে জানতে পারলাম, ১৭৫৬ সালে তত্কালীন মহীশূর (বর্তমানে কর্ণাটক) রাজ্যের মহারাজা হায়দার আলী এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী সময়ে এর কাজ সমাপ্ত করেন মহারাজা টিপু সুলতান। ২৪০ একর জায়গার ওপর লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন নির্মিত।
আমরা এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের যেদিকে তাকাই সবুজ আর সবুজ। যতই সামনে এগিয়ে যাই একের পর এক রাস্তা। পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেনে অসংখ্য রাস্তা। কোন রাস্তা ধরে ঘুরবো এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল আমরা কোনো সবুজ অরণ্যে হারিয়ে গেছি। সবুজের যে কত রঙ হয় সেটা এখানে এসে বুঝেছি। পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেনজুড়ে হাজার প্রজাতির ফুল, ফল ও কাঠের গাছ আছে। কত প্রজাতির যে ঘাস দেখেছি সেটাই বলতে পারবো না। এই বোটানিক্যাল গার্ডেন পাখিদের অভয়ারণ্য হওয়ার কারণে অসংখ্য পাখি দেখতে পেলাম। কিছু পাখি মুক্ত স্বাধীন আর কিছু পাখি বিশালাকার খাঁচার ভেতর বন্দি। মাঝে মধ্যে গাছের ডালের ফাঁকে বানরও দেখতে পেলাম। বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিভিন্ন দিকে আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন লেক দেখতে পেলাম। লেকের ওপর বিভিন্ন ডিজাইনে দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ আছে। এসবের মাঝে মহীশূরের মহারাজা টিপু সুলতানের সময়কার আভিজাত্য খুঁজে পায় যায়। পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেনজুড়ে আছে শতশত শিল্পকর্ম। প্রতিটি শিল্পকর্ম গাছের ডাল, কাণ্ড, গোড়ি বা পুরো গাছ দিয়ে তৈরি করা। বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘোরার সময় কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে শিশুরা খেলা করছে, কোনো শিশুকে মা দুধ পান করাচ্ছে কিংবা বিশালাকার কুমির, অজগর সাপ, বানর, শিম্পাঞ্জি, উটপাখি, ময়ূরসহ নানা ধরনের শিল্পকর্ম। একদম কাছে গিয়ে না দেখলে বোঝার উপায় নেই এগুলো যে কাঠের তৈরি। এছাড়াও জলজ্যান্ত গাছ ও লতাপাতার সমন্বয়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম দেখা যায়।
লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন একটি দৃষ্টিনন্দন গ্লাস হাউজ আছে। সেখানে কত প্রজাতির ফুল গাছ দেখতে পেলাম সেটা আমার ধারণার বাইরে। তবে আবার বিস্ময়ে সেখানকার ফুল দেখেছি। অনেক বিরল প্রজাতির ফুল সেখানে সংরক্ষণ করা আছে। যে কেউ এই গ্লাস হাউজ দেখলে বিমোহিত হবে নিশ্চিত। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে বিশাল এরিয়া নিয়ে বনসাই গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন গাছের বনসাই দেখতে পেলাম। এগুলো সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। যে কেউ মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে এখান থেকে বনসাই সংগ্রহ করতে পারবে। তবে লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনের মধ্যে যেটা দেখে আমি সবচেয়ে বেশি অবাক ও বিস্মিত হয়েছি, সেটা হচ্ছে পাথরের পাহাড়। এই পাথরের পাহাড় বলতে গেলে মাঝারি মাপের পাহাড়। আমি অনেক ঘোরাঘুরি করেও পাথরের পাহাড়ে কোথায় ভাঙা বা ফাটল দেখতে পেলাম না। পুরো পাহাড়টা মনে হবে একখণ্ড বিশালাকার পাহাড়সম কালো বা ধূসর পাথর। পাথরের পাহাড়ের চূড়ায় মহাদেবের একটি মন্দির আছে। এই পাথরের পাহাড় সম্পর্কে একটি সাইনবোর্ডে কিছু তথ্য দেওয়া আছে। সেখানে থেকে জানতে পারলাম, প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর আগে কোনো এক বিকট ভূ-কম্পনের ফলে এই পাথরের পাহাড় ভূগর্ভ থেকে ভূপৃষ্ঠের ওপরে উঠে আসে। লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে, পুরো এরিয়া একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আর একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, গাছের প্রতিটি প্রজাতি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেওয়া সাইনবোর্ড পাওয়া যায়। গার্ডেনে কর্মরত একজন আমাদের জানান, লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনের গাছগুলো দেখে এবং সাইনবোর্ডগুলো পড়ে গাছ ও গাছের প্রজাতি সম্পর্কে জানতে কমপক্ষে ১ মাস সময় লাগবে। সেখানে বিভিন্ন দেশের অগণিত পর্যটক ও শিক্ষার্থীকে দেখতে পাওয়া যায়। এই গার্ডেনটি সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
