বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকের বেচাকেনা উদ্বেগজনক 

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৪০

সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হলো ইন্টারনেট, যা তথ্য-উপাত্ত, সেবাপ্রাপ্তিসহ আমাদের প্রাত্যহিক জীবন-যাপন এবং অসংখ্য কাজকে অনেক ক্ষেত্রেই সহজ করে দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সবখানেই ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও সরকারের মন্ত্রণালয়, দপ্তর, বিভাগসমূহ অনেক অগ্রগতি সাধন করেছে। ফলে সার্বিক উন্নয়নে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযক্তির অগ্রগণ্য ভূমিকা এখন দৃশ্যমান। পক্ষান্তরে, কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের অপব্যবহারও আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এর মধ্যে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীই বেশি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ২৮ লাখ। দিনে দিনে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

বর্তমানে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পৃক্ততা! গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলোতে খোলামেলাভাবেই বিক্রি হচ্ছে মাদকদ্রব্য। অসাধু মাদক ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের (বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বেশি ব্যবহার করে) নিজেদের মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে মাধ্যমটি ব্যবহূত হচ্ছে সেটি হচ্ছে ফেসবুক। সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদক বিক্রির শুরুটা হয় করোনার সময়ে, যখন তরুণেরা ঘরে বসে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। এই সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নেয় তাদের বাণিজ্যের মূল কেন্দবিন্দুতে। যখন তারা দেখল সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণেরা মাদক কিনতে আগ্রহী, তখনই তারা এই রুটকেই মাদক বিক্রির মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

গবেষণার তথ্যমতে, অস্ট্রেলিয়ায় ১৫-১৭ বছরের কিশোরেরা তাদের জীবনের ৯৮ শতাংশ ইন্টারনেটে ব্যয় করে এবং তা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের বেশির ভাগ সময় বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে অ্যালকোহলের বিজ্ঞাপন, সেই সঙ্গে অন্যান্য অবৈধ মাদকদ্রব্যের আসক্তিতে আসে এবং বন্ধুরাই এগুলোকে নজরে আনে। সম্প্রতি মার্কিন মাদকদ্রব্যের এক গবেষণায়ও দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালকোহল, গাঁজা ও ভ্যাপিং বা ই-সিগারেটজাতীয় মাদকের ব্যবহার শুরু হয়। সুইডিশ এক গবেষণায়ও একই ফলাফল পাওয়া গেছে। তবে এ কথা অবশ্যই বলতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে—পিয়ার গ্রুপ প্রেশার (চবধত্ ত্ড়েঁঢ় চত্বংংঁত্ব) অর্থাৎ, বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়া ও পিতামাতার তদারকির অভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে, ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ, যার ফলে এসব ইয়াবা গ্রহণকারীরা নানান ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জীবনীশক্তি ধ্বংসকারী ইয়াবা সেবনে অল্প সময়ের মধ্যেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং যৌনশক্তি হারিয়ে ফেলছে চিরতরে। বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে  চিকিৎসাধীন  ইয়াবা  আসক্তদের  ওপর পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে প্রায় ১৫ হাজার মাদকাসক্ত নিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ইয়াবাসেবী। একটানা মাত্র দুই-আড়াই বছর ইয়াবা সেবনের কারণেই তারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের নার্ভগুলো সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে ইয়াবার অন্যতম সরবরাহ লাইন। দেশে ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। 

গবেষকেরা বলছেন, মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়ায় তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি আকৃষ্ট ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া’র গবেষক রবিন স্টিভেন্সের মতামত যথার্থ। তিনি বলেছেন, ‘তরুণেরা প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক সেবন করে নিজেদের মানসিক চাপ, কষ্ট, আতঙ্ক ইত্যাদি ভুলে থাকার বিষয়টি প্রকাশ করে। সবার জীবনেই এই সমস্যাগুলো আছে, আর সেখানেই মাদক সেবনকারীদের এই যুক্তি অন্যান্য তরুণের মাদকের প্রতি হাতছানি দেবে। তাদের মনে হবে, মাদকের মধ্যেই হয়তো আমিও শান্তি পাব।’ তার মতে, তরুণ প্রজন্মের মাদকাশক্তি এখনো একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আর মাদক সেবনসংক্রান্ত বিভিন্ন ‘কনটেন্ট’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কিংবা সেগুলো দেখা একজন তরুণকে কীভাবে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে আমরা অনেকাংশেই অজ্ঞ।’

ফ্যাশন হিসেবে অসংখ্য তরুণ আজকাল মাদক সেবনের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জনৈক ব্যক্তির মাদক সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো মানুষকে ক্ষতিকর নেশা সেবনে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। অথচ ইয়াবা গ্রহণকারী ৮৫ শতাংশই তরুণ যুবসমাজ। তাই সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি।

‘মাদক চোরাচালানে বহুমাত্রিকতা এসেছে। চোরাচালানকারীরা এখন ‘ডার্কওয়েব’ ব্যবহার করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতে কোনো ধরনের তথ্য পাচ্ছে না। লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বিট কয়েন। এ কারণে মাদক চক্রকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মাদক কারবারীরা যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করছে, সে অনুযায়ী আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। এ কথা সত্য, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও ইন্টারনেটের বিস্তৃতির কারণে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)’ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে মিলে অসাধু মাদক ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ের পদক্ষেপ নিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা অর্জনে উদ্যোগ না নিলে দেশে আরো বেশি মাদকের ঝুঁকি তৈরি হবে।’

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং শব্দসৈনিক,

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন