বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দেশে দেশে ম্রিয়মাণ গণতন্ত্র!

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৫৫

গত ফেব্রুয়ারি মাস হইতে চলিতেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কতটা পড়িয়াছে, তাহা আজ কমবেশি সকলেরই জানা। তবে ইহার বাহিরে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কী হইতেছে, তাহা অনেক সচেতন মানুষের অজানা নহে। গতকাল আফ্রিকার দেশ সুদানে বহুদিন ধরিয়া অব্যাহত থাকা গণবিক্ষোভ নিরসনে সামরিক বাহিনী, শক্তিশালী সশস্ত্র গ্রুপ ও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছে। ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিবার পর হইতেই দেশটিতে বিরাজ করিতেছে অস্থিরতা। ইহার প্রতিবাদে জনবিক্ষোভ চলাকালে সেখানে এই পর্যন্ত ১২০ জন প্রাণ হারাইয়াছেন। সেইখানে সেনাবাহিনী ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ শক্তিশালী অবস্থানে রহিয়াছে। ২০১৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির ক্ষমতা হইতে চলিয়া যাইবার পর হইতে দেশটিতে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হইতেছে। দেশটিতে মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব বাড়িতেছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। বিক্ষোভরত তরুণরা সামরিক ও বেসামরিক এলিটদের এখনো বিশ্বাস করিতে পারিতেছে না। কেননা তাহারা বারংবার চুক্তি ভঙ্গ করিয়া নিরপরাধ মানুষের উপর খড়্গহস্ত হইয়াছে। এদিকে কঙ্গোতে এক সপ্তাহের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতায় ২৭২ জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় বিরোধী দল তাহার পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচনের দাবি জানাইয়াছে। এইভাবে আফ্রিকাসহ অনেক দেশেই এখন বিরাজ করিতেছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রায়শই লাগিয়া থাকে। ইহা নূতন কোনো বিষয় নহে; কিন্তু খোদ আমেরিকায়ও আজ সংবিধান সংশোধনের দাবি উঠিয়াছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প পঞ্চম সংশোধনী ছাড়া সম্পূর্ণ সংবিধান সংশোধনের পক্ষপাতী। তাহার ভাষায়, ‘মোস্ট অব ইট ইজ ওয়াস্ট অব পেপার’। কী ভয়াবহ কথা! অর্থাৎ সেইখানের গণতন্ত্রেও চলিতেছে টানাপড়েন।  আসলে পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান। এই লইয়া চলিতেছে অবিরাম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। এই দুই মতবাদের নামে নানা কর্ম-অপকর্ম ঘটিয়া চলিয়াছে। তবে এই কথা সত্য, আমরা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের পক্ষে; কিন্তু গণতন্ত্রের মানে কী তাহা আমাদের অনেকেরই অজানা। এই ব্যাপারে নাই সুস্পষ্ট ধারণা। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা আজ দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্রের মানের অবনতি ঘটিয়াছে। 

লক্ষ করা যাইতেছে, তথাকথিত কোনো কোনো গণতান্ত্রিক দেশে যেন তেন প্রকারে ক্ষমতায় থাকিবার প্রবণতা বাড়িয়া চলিয়াছে। নির্বাচনি ফলাফল মানিয়া না লইবার প্রবণতাও বাড়িতেছে। কোনো কোনো মহল এই ব্যাপারে নিজ নিজ অবস্থানে অটল ও অনড় থাকিতেছে। ইহা একটি বিপজ্জনক গণতন্ত্র! এমনকি আমেরিকার মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হইতেছে। সেখানে কোনো কোনো মহল বলিতেছে, গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটা সুষ্ঠু হয় নাই। ইহাতে আমরা আর যাই কোথায়? রাশিয়া প্রতিবেশী স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ ইউক্রেনে হামলা চালাইয়া কয়েকটি অঞ্চল দখল করিয়া লইয়াছে। সেই দেশটিতেও লক্ষ করা যাইতেছে বিভক্ত মত। কেহ কেহ রাশিয়ার পক্ষাবলম্বন করিয়াছেন। আবার রাশিয়াতেও দেখা যাইতেছে, উল্লেখযোগ্য মানুষ আছেন যুদ্ধের পক্ষে। তাহারা মনে করিতেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করিয়া সঠিক কাজটি করিয়াছেন। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনব্যবস্থার কারণে অনেক দেশেই নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রেরও বহিঃপ্রকাশ দেখা যাইতেছে দুঃখজনকভাবে।

যে কোনো দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব, যদি সেখানে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনি ব্যবস্থা গড়িয়া না উঠে। স্বচ্ছ নির্বাচন না হইলে এবং নির্বাচনি ফলাফল মানিয়া লইবার সংস্কৃতি গড়িয়া না উঠিলে এই গণতন্ত্র নিরর্থক ও অকার্যকর। নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ হইতে হইবে? আসলে যতটা সম্ভব  স্বচ্ছ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া কোনো দেশেই গণতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করিবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন