সম্প্রতি বেগুনের মধ্যে ক্যানসার বিস্তারকারী হেভি মেটালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় জানা গেছে, লেড, নিকেল, ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি রয়েছে বেগুনে। তথ্যটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না যদি না আমরা এই বেগুনকেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ না করতাম। সুস্বাদু সবজি হিসেবে বেগুনের জুড়ি নেই। আর এই বেগুনের সঙ্গে লেড, নিকেল, ক্যাডমিয়ামের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে এবং রেডিয়েশনের মাধ্যমে শরীরে ক্যানসার কোষ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
শুধু বেগুন নয়, আমাদের দৈনন্দিন চলার পথে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জিনিস থেকেই তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিঃসৃত হচ্ছে যেগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে আমরা যে জিনিসটা হাতে নিই, সেটা হচ্ছে মোবাইল ফোন। আধুনিকতার যুগে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই স্মার্টফোন থেকেই নির্গত হচ্ছে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ। আমরা যত বেশি মোবাইল ফোনের সংস্পর্শে থাকব তত বেশি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ নির্গত হবে, যা আমাদের ব্রেন ক্যানসারসহ মস্তিষ্কের অন্যান্য জটিল রোগের মূল কারণ। তাছাড়া সবসময়ের আলোচিত টপিক ‘প্ল্যাস্টিক’ও তেজস্ক্রিয়তা নিঃসারণে ভূমিকা রাখে। কাচের জিনিস সহজে ভেঙে যায়, স্টিলের জিনিসের দাম বেশি! আর এদিকে প্ল্যাস্টিকের দামও কম, টিকেও বেশিদিন। তাই আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্ল্যাস্টিককেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা এটা জানি না যে, সবচেয়ে ভালো প্ল্যাস্টিকের মেয়াদও তিন মাসের বেশি থাকে না। তিন মাস পর তারা সক্রিয় হয়ে যায় এবং পাত্রে যে খাবারই রাখা হোক না কেন তার সঙ্গে বিকিরণ শুরু করে এবং এই ভারী পদার্থগুলো আমাদের দেহে প্রবেশ করে। এসব রেডিয়েশনের ফলে আমাদের দেশে ক্যানসারের হার এত বেশি। এসব জিনিস সম্পর্কে অবগত থেকেও আমরা খুব বেশি পাত্তা দিই না যাতে করে নিজেরাই নিজেদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি।
রেডিয়েশন অর্থাৎ তেজস্ক্রিয়তার সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মেডিক্যাল। যদিও বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই (বর্তমানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়নাধীন), সেক্ষেত্রে মেডিক্যালের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনই আমাদের পরিচিত কেউ না কেউ অসুস্থ হচ্ছে, আর তাদের নিয়ে মেডিক্যালে গেলেই হাজারটা টেস্ট করাতে হয়। এসব টেস্টের জন্য তৈরি হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা কনসালট্যান্ট সেন্টার। এসব সেন্টারে টেস্টগুলো করানোর জন্য ব্যবহৃত হয় উচ্চ তরঙ্গের রেডিওঅ্যাক্টিভ রশ্মি। আমরা সাধারণ একটা এক্সরে মেশিনের কথাই বিবেচনা করি। একটি এক্সরে মেশিন থেকে প্রচুর পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত হয় যা আমাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। আর সেই জায়গায় লাখ লাখ এক্সরে মেশিন সারা দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া রেডিওথেরাপিসহ বিভিন্ন ধরনের থেরাপি দেওয়ার কাজেও প্রধান কম্পোনেন্ট হচ্ছে উচ্চ তরঙ্গের তেজস্ক্রিয় রশ্মি। এসব রশ্মি আমাদের দেহে প্রবেশ করলে ক্যানসার বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। এবার আসি সার্জারির ক্ষেত্রে, একটা সার্জারিতে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় যার বেশির ভাগই রেডিয়েশনে ভূমিকা রাখে। সার্জারি শেষে দেখা যায় ব্যবহৃত সব জিনিস একটা সাধারণ ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয় যেখানে জিনিসগুলো পুড়িয়ে ফেললেও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায়। এসব জিনিস পরবর্তী সময়ে পচে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং ভারী ধাতুগুলো পরিবেশে উন্মুক্তভাবে বিচরণ করে এবং মানবদেহে প্রবেশ করে। তাছাড়া বর্তমানে যত্রতত্র মেডিক্যাল সেন্টার গড়ে উঠছে। এসব মেডিক্যাল সেন্টারগুলোর বেশির ভাগেরই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। যাতে করে এসব মেডিক্যাল সেন্টারগুলো রেডিয়েশনের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে। কারণ, বেশির ভাগ বর্জ্যই পুড়ে ফেলার জায়গায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। যাতে করে এসব বর্জ্য থেকে নিঃসৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটির সঙ্গে মিশে মাটিকেও তেজস্ক্রিয় করে ফেলে। যার ফলস্বরূপ বিভিন্ন খাবারেও তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি শুধু মানবজীবনের জন্য ক্ষতিকর তা নয়, বরং এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদানকে বিষাক্ত করে তুলছে। আর এই বিষাক্ত প্রভাব থেকে মানবজীবন তথা পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তেজস্ক্রিয়তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে জড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই নিজেকে যতটুকু সম্ভব সচেতন থাকতে হবে এবং তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। উন্নত দেশগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সিস্টেমগুলো প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাছাড়াও রয়েছে ‘নিউক্লিয়ার সেফটি অ্যান্ড রেডিয়েশন কন্ট্রোল অ্যাক্ট, ১৯৯৩’ নামে একটি আইন যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য এবং সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশকেও রেডিয়েশনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে জোর প্রদান করা হয়েছে। আমরা যদি আইনগুলো মেনে চলি এবং একটুখানি সতর্কতা অবলম্বন করি, তাহলেই সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন কর?তে পারব। কেননা শুধু আইন থাকলেই হবে না, আইন যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। তাই সবার প্রতি আহ্বান, আসুন আমরা রেডিয়েশন প্রটেকশনের ব্যাপারে সতর্ক হই এবং সবাইকে সতর্ক করি।
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
