প্রতিবাদের ভাষা বিশ্বফুটবল

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৪১

মুসলিম বিশ্ব সম্বন্ধে মনের মধ্যে পুষে রাখা ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে বিশ্বফুটবল। বিশেষ করে পশ্চিমি দুনিয়া যেভাবে মুসলিম জগেক মনগড়া ধারণা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তুলেছে, সেই ধারণাকে গড়ে তোলা ও পশ্চিমি মনোজগেক সজোরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে এক নতুন বার্তা বয়ে আনল এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল।

ইরানের ফুটবল খেলোয়াড়রা দেখিয়েছে ফুটবল হতে পারে আশ্চর্য এক প্রতিবাদের ভাষা। ইরান প্রশাসনের ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে হিজাবপ্রথা তুলে দেওয়ার সপক্ষে ইরানের মেয়েদের প্রতিবাদের আন্দোলনকে সমর্থন জানালেন তারা। ইরানি জাতীয় সংগীত যখন ধ্বনিত হচ্ছিল ময়দানের মঞ্চ থেকে তারা দুই ঠোঁট এঁটে বোবা হয়ে রইলেন, মুখ মেলালেন না জাতীয় সংগীতের কোরাসে। পারসিক বা ইরানি খেলোয়াড়রা কত বড় ঝুঁকি নিলেন অমন এক বোবা যুদ্ধে, তা দেখে বিশ্ব স্তম্ভিত—ঐ খেলোয়াড়রা ঘরে ফিরলে কী শাস্তি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে, তারা ভাবলেন না বরং অদম্য  ফুটবল আবেগকে বুকে রেখে বুক সটান ও মাথা উন্নত রেখে তারা কাতারে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; মুসলিম দেশ কাতারও বিশ্বফুটবল আয়োজনের সমৃদ্ধ তরিকায় ও আভিজাত্যে সারা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

ফুটবল আসলে পৃথিবীরই প্রতিরূপ। মানব জীবনের এক শিল্পিত প্রতিচ্ছায়া। ফুটবল বিশ্বমানের বন্ধনের এক শ্রেষ্ঠ উপায়। ব্রাজিলের মতো দেশের কাছে, তার লোক সাধারণের কাছে ফুটবলই ধর্ম। বস্তিতেও ব্রাজিলের ছেলেমেয়েরা ফুটবল খেলে। ফুটবলকে এত ভালোবাসে ব্রাজিলের মানুষ যে তাদের এই ভালোবাসার থই নিতে গিয়ে কানো ফুটবল ভাবুক লক্ষ করেছেন, ফুটবলই ধর্মের জায়গা নিয়েছে ব্রাজিলের লোকজীবনে। ব্রাজিলের কথা এলে আর্জেন্টিনার কথাও এসে পড়ে।

বরাবরই আমি ছিলাম মারাদোনার ভক্ত। আজও তার প্রতি আমার ভক্তি এক নোকতাও কমেনি। আজও তার টেলিভিশনে দেখা খেলার স্মৃতি মনের মধ্যে ছবি হয়ে আছে। ফুটবল তার শরীরময় খেলা করে ফিরত—যেন একটি পৃথিবী ফুটবলের বিশ্ব রাজপুত্রের সর্বাঙ্গে চুম্বন করতে করতে নিজেকেই ধন্য করে চলেছে।

কে কাকে নিয়ে খেলা করত। মারাদোনা ফুটবল নিয়ে খেলতেন নাকি ফুটবলই মারাদোনাকে নিয়ে খেলা করত, আজও আমি ঠিক করে উঠতে পারিনি। ফুটবল পায়ের খেলা। কিন্তু শুধু পায়েরই খেলা নয়। হাত বাদে অন্য সব অঙ্গই ফুটবল খেলতে পারে, আবার হাত বলতে কবজির নিচের অংশ বোঝায়; হাতের ঊর্ধ্বভাগে বল লাগলে বা বাহুর ওপরের ভাগ দিয়ে বল খেললেও ফুটবল খেলায় দোষ হয় না।

মারাদোনা কী করেছিলেন মনে পড়ে? হাত দিয়ে ঠেলে গোল করেছিলেন; রেফারি মশাই তো নয়ই; জগৎসংসার কাকপক্ষী এবং দর্শকমশাইরা কেউই টের পাননি, ফুটবলের রাজপুত্র মারাদোনা তার সোনার হাত দিয়ে প্রতিপক্ষের নেটে গোলকিপারের চোখে সোহাঞ্জনের আবির ছড়িয়ে গোল করেছেন। তিনি এভাবে গোল করতে পারেন ফুটবল বিশ্বমঞ্চ সেদিন ভেবে উঠতেই পারেনি। মারাদোনা তার হাত দিয়ে ঠেলে গোল করার কথা শিশুর মতো নিজেই বলে ফেললেন দুনিয়ার সম্মুখে।

ঐ ঘটনার পর মারাদোনার হাতখানির নাম হয়ে গেল গোল্ডেন হ্যান্ড। একটি দোষকে এভাবে গুণান্বিত করা এবং মারাদোনার সততাকে অলংকৃত করা ফুটবলেরই এক কুহকময় কিসসা, সন্দেহ নেই।

কিন্তু ঐ ঘটনার একটি সুন্দর নাম দিতে পারি আমরা। কী নাম দেব? সোনার হাতে সোনার গোল। কিন্তু মারাদোনার সততা ফুটবল মূল্যবোধের এক আশ্চর্য ম্যাজিক রিয়েলিজম সেটি। মারাদোনা তো না বললেই পারতেন যে, তিনি হাত দিয়ে গোল করেছেন। কেননা কেউ তো জানে না, তিনি কী করে গোলটা করলেন। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় বললেন, ফাউল। মারাদোনার এই মহত্ব বিশ্বের কাছে এক দৃষ্টান্ত। সে কারণে ভাবুকরা বলে থাকেন, খেলা শুধু খেলা নয়। আসলে খেলাই জীবন।

একটা টিমের দিকে তার দেশ চেয়ে থাকে। আশা করে বিশ্বসম্মান এনে দেবে তার টিম। মারাদোনার বেলায় মারাদোনারই মুখ পানে চেয়ে থাকত আর্জেন্টিনা। টিম বা দল ছিল দুর্বল। কিন্তু মারাদোনার একার শক্তিই ছিল ফুটবলের এক মহাবিস্ময়। একাই তিনি বিশ্বফুটবলের খেলার রং বদলে দিতে পারতেন। তথাপি ফুটবল টিমেরই ঐক্যবদ্ধ খেলা। সেই ঐক্য রক্ষা করতে হলে ১১জন খেলোয়াড়ের মধ্যে অন্তরঙ্গতা চাই, প্রত্যেককে মান দিতে হয় খেলার শৃঙ্খলার প্রীতিপূর্ণ আচরণে। খেলার মাঠে এবং সর্বত্র। একটি সৎ সমাজের রূপ দেখা যায় খেলার মধ্যে। ইরানের ফুটবল দল ইরানি সমাজেরই ছবি তুলে ধরল বিশ্বের সামনে। 

ইরান হলো সংস্কৃতির দেশ। আর্য সভ্যতার পীঠস্থান। মরমিয়াবাদের তীর্থক্ষেত্র। গজলের দেশ, হাফিজের সমাধিভূমি—রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির প্রেরণাস্থল ইরান বা পারস্য। পারসিকরা রবীন্দ্রনাথকে নিজেদের কবি মনে করে। অগ্নিউপাসকের দেশ ইরান। ইরানই প্রথম হজরত মুহম্মদের কথা কান পেতে শুনেছিল। আজও ইরানের প্রধান উৎসব আগুন-উৎসব। বাংলাভাষার প্রেরণা হলো ফারসি। পারস্যের ভাষা বাংলাভাষাকে প্রকাশক্ষম করে তুলেছিল পার্শি বা ফারসি ভাষা। ফলে ইরানের প্রতি বাঙালির একটি আত্মিক টান রয়েছে। ফারসি ভাষাটি সংস্কৃতের সহোদরা। ভারত-ইরান দূর নয়। মনে রাখতে হবে ইরান আগুন জ্বালাতে পারে।

ইরানের খেলোয়াড়দের জন্যই হিজাববিরোধী নারী আন্দোলন সারা বিশ্বের নারীস্বাধীনতার এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছল। দলের অধিনায়ক এহাসান হাজসাফি গোপন রাখেননি, কেন তাদের এই প্রতিবাদ। ইরানি চলচ্চিত্র নারীমুক্তির কথা বিষয় হয়ে বিশ্বের সামনে এসেছে দশক দুই-তিন আগেই। এবার খেলায় এল সেই নারী মুক্তির জন্য মৌনপ্রতিবাদ। আয়াতুল্লাহ খোমেইনির স্বৈরাচারই ইরানের শেষ কথা নয়। ধর্মের গোড়ামিই ইরানের অন্তরাত্মা নয়, মনে রাখতে হবে ইরান একটি আধুনিক দেশ, তার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিও বহুদূর। এ বারের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রাচ্যের জন্য এক নবচেতনার হদিস বয়ে আনল ইরান। পাশ্চাত্য দেশগুলোকেও আজ তাই মুসলিম বিশ্ব সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হবে—আফগানি ধর্মমোহ ও  তালিবানি অকাট্য গোড়ামিকে চরম আঘাত হানল।  ইরান-আফগান যেন নিজেকে বদলাতে শেখে, সেই ফুটবল বার্তাই রেখে দিয়ে গেল কাতার বিশ্বকাপ।

খেলা শেষ হবে। কিন্তু বেগবান এক সংস্কৃতি চলতেই থাকবে বিশ্ব জুড়ে। মুক্তি স্বাধীনতা মুক্তি।  সরিয়ে দাও নারীর মুখের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আবরণ। নারীর চোখ দুটি স্পষ্ট হয়ে উঠুক, তার সৌন্দর্য চাঁদের মাধবী পূর্ণিমার মতো পুরো আকাশ ভরিয়ে তুলুক। কেননা নারীই আসলে এই পৃথিবীর অর্ধেক আকাশ। পৃথিবীটা সত্যিই ফুটবলের মতো গোল। অন্তত ভূগোলের গ্লোবের মতো গোল, সেটি ঘুরেই চলেছে। 

লেখক : ভারতের সাহিত্যিক ও ভাষ্যকার 

 

ইত্তেফাক/ইআ