বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফিনল্যান্ডের মৃতপ্রায় শহরে আবার আশার আলো

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮:০৪

নৈরাশ্যবাদের মাধ্যমে ভালো কিছু করে দেখানো কি সম্ভব? ফিনল্যান্ডের এক শহরের কিছু মানুষ নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নৈরাশ্যবাদ ও হাস্যরসের মাধ্যমে গোটা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন।

ফিনল্যান্ডের মাঝের অংশেমৃতপ্রায় ছোট শহর পুয়োলাংকা। এখনো প্রায় ২,৪০০ মানুষ সেখানে টিকে আছেন। বেশিরভাগের বয়স ষাটের উপরে। তরুণরা সব চলে যাচ্ছে। বেশ কিছুকাল আগে শহরের একটি পানশালা বন্ধ হয়ে গেছে। একটি দোকানের শুধু দুটি চেয়ার অবশিষ্ট রয়েছে। তার উপর শহরের বাইরে সতর্কতাবাণী জারি করা হয়েছে। বোর্ডে লেখা আছে, ‘‘আপনারা এবার পুয়োলাংকায় পৌঁছাচ্ছেন। চাইলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে পারেন।''

শুধু এই দুজন ভিটেমাটির প্রতি আনুগত্য ত্যাগকরতে প্রস্তুত নন। ওস্কারি ও সান্তেরি স্থানীয় নৈরাশ্যবাদী সংঘের সদস্য। কারণ তাদের মতে, নৈরাশ্যের মধ্যেই নাকি নতুন সূচনার সুযোগ লুকিয়ে থাকে। পুয়োলাংকা পেসিমিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সান্তেরি রাকামা বলেন, ‘‘পুয়োলংকার পুনর্জাগরণ যে আর ঘটবে না, আমরা সেই বাস্তব মেনে নিয়েছি। কিন্তু মৃতপ্রায় শহর নিয়ে আমাদের মনে মোটেই দুঃখ নেই। আমরা হাস্যরসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেটা দেখছি। আমরা চাই মানুষ সেটা নিয়ে হাসুক।''

সংঘের আর এক সদস্য ওস্কারি হাপালাইনেন মনে করেন, ‘‘কে বলেছে, নৈরাশ্যবাদীদের সব সময়ে এমন দেখতে হবে! কোনো নৈরাশ্যবাদীর মুখে কেন হাসি ফুটবে না?''

এই নৈরাশ্যবাদীরাই কিন্তু পুয়োলাংকায় কিছুটা আশা ফিরিয়ে এনেছেন। শুধু তাঁদের ‘পেসিমিস্ট ক্যাফে'-তেই ভিড় হচ্ছে না, পাশের দোকানেও পর্যটকরা নৈরাশ্যবাদী বার্তা লেখা টি-শার্ট ও পিন কিনছেন।

ওস্কারি ও তার বন্ধুরা আত্মপরিহাস ভরা মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমেও নিজেদের শহরের পরিচিতি ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে পুয়োলাংকা ফিনল্যান্ডে যাকে বলে ‘কাল্ট স্ট্যাটাস' অর্জন করেছে। ফিনল্যান্ডের নিজস্ব হাস্যরস সম্পর্কে অনেকেই সন্তুষ্ট। এক ব্যক্তি দোকানের একটি  টিশার্ট দেখিয়ে বলেন, ‘‘এই টিশার্টের উপর লেখা আছে – আজ আমি রেগে আছি। সেটাই স্বাভাবিক। পেনশন দপ্তর আমাকে জানিয়েছে যে আমার অবসর ভাতা তিন শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ মাসে পুরো দুই ইউরো বেশি পাবো।''

ফিনল্যান্ডের পুয়োলাংকা শহর

বাস্তব পরিস্থিতি শহরের ভবিষ্যতের জন্য একেবারেই ইতিবাচক নয়। ১৯৮০-র দশক থেকে জনসংখ্যা কমে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর আরও মানুষ চলে যাচ্ছেন। এখনো স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও এক বৃদ্ধাবাস টিকে রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে ফিনল্যান্ডের জঙ্গলের গভীরে এমন এক জায়গায় বাস করতে প্রস্তুত?

শহরের মেয়র হারি পেলটোলা অবশ্য মনে করেন, যে আশেপাশের প্রকৃতি সত্যি খুব সুন্দর। নৈরাশ্যবাদীদের প্রচার অভিযান তাঁর শহরের পরিচিতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে শহরের জনসংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করবে বলে তিনি নিশ্চিত। হারি বলেন, ‘‘আরও বেশি মানুষ নির্মল প্রকৃতির টানে এমন এলাকায় বাস করতে চাইবেন, যেখানে জায়গারও অভাব নেই বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের এখানে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। ব্যক্তি প্রতি এক বর্গ কিলোমিটার। প্রতিবেশী নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই।''

ওস্কারি ও সান্তেরির মতে, পুয়োলংকাবাসীরা সবচেয়ে সন্তুষ্ট মানুষদের অন্যতম। মনে রাখতে হবে, ফিনল্যান্ড কিন্তু পর পর পাঁচবার বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। সান্তেরি মনে করেন, ‘‘নৈরাশ্যবাদের সঙ্গে দিব্যি খাপ খেয়ে যায়। এখানকার মানুষের বেশি প্রত্যাশা নেই, অল্পেই খুশি।''

পুয়োলংকা পেসিমিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ওস্কারি হাপালাইনেন বলেন, ‘‘সত্যি যদি আমাদের গুরুতর সমস্যা থাকতো, তাহলে আমরা নিশ্চয় নৈরাশ্যবাদ নিয়ে মস্করা করতাম না। তখন অন্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো।''

নৈরাশ্যবাদই শহরের ট্রেডমার্ক হয়ে উঠেছে। এভাবে পুয়োলাংকা শহরকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করা যাবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে আশাবাদ ও হাস্যরস সম্বল করে বাসিন্দারা সেই চেষ্টা করে দেখিয়েছেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি