মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত। অর্থাৎ, সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু মানুষ কি তাহার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখিয়া এই বিশ্বকে গড়িয়া তুলিয়াছে? শ্রেষ্ঠত্ব মানে তো কেবল পেশিশক্তি দেখানো নহে। বরং শ্রেষ্ঠত্ব মানে পেশিশক্তির পরিমিতিবোধ, অন্যকে রক্ষার দায়িত্ববোধ। কিন্তু বাস্তবতা হইল, মানুষের ইতিহাস যুদ্ধের ও সংঘাতের। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ হইতেই মানুষ ভয়ঙ্কর যুদ্ধবাজ। এইজন্য পৌরাণিক যুগেই আমরা যুধিষ্ঠিরের মুখে শুনিয়াছি, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।’ অর্থাৎ একটি সুচের অগ্রভাগ যতটুকু মাটি দখল করিয়া থাকে, ততটুকু মাটিও বিনা যুদ্ধে ছাড়া হইবে না। প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধ করিতে করিতেই তথাকথিত সভ্য হইয়াছে মানুষ এবং ইহা সবচাইতে দুঃখজনক যে, যুদ্ধ ছাড়া মানুষের ইতিহাসের পাতা একরকম সাদা থাকিয়া যাইবে। ‘ওয়ার্ল্ড বিয়ন্ড ওয়ার’ সংস্থা হইতে আমরা জানিতে পারি, ৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব হইতে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সহস্রাধিক প্রধান প্রধান যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে, যাহা ইতিহাসে নথিভুক্ত। কেবল বিংশ শতাব্দীতেই আনুমানিক ১৬৫টি যুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়াছে।
যুদ্ধের ভিতর দিয়াই মানবসভ্যতার সকল প্রকার বাঁকবদল হইয়াছে। যখন মানুষের হাতে যেমন যেমন অস্ত্র আসিয়াছি, তখন তাহারা তেমনিভাবেই সাম্রাজ্য বিস্তার করিয়াছে। মূলত যেই পক্ষ তাহাদের সময়ের তুলনায় অস্ত্রে ও কৌশলে যত বেশি অগ্রসর ছিল, তাহারাই যুদ্ধ ও সংঘাতে জয়লাভ করিয়াছিল। যুদ্ধ ও সংঘাত যেন ছায়ার মতো মানুষের বিধিলিপি লইয়া গিয়াছে। এই জন্য ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন সংঘাতে এই বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রের বারংবার বদল, পরিবর্তন, পরিমার্জন ঘটিয়াছে। নূতন কোনো পরাশক্তি যখন দেখে, পূর্বের পরাশক্তি নিজের সুবিধামতো সীমারেখা আঁকিয়াছে, তখন সেই পরাশক্তি চেষ্টা করে তাহার আয়ত্তে আসা ইরেজার ও পেনসিল দিয়া নূতন করিয়া ভূরাজনৈতিক সীমানা মুছিয়া পুনরায় আঁকিতে। সেই অঙ্কন ও মোছামুছির মধ্যে পিষ্ট হইয়া সংশ্লিষ্ট জনপদগুলির কত অযুত-লক্ষ নিরীহ মানুষ নিহত হইল, তাহাতে পরাশক্তিদের কিছুই যায়-আসে না। তবে এই সকল মৃত্যুর ভিতর দিয়া সকল সময়ই যে অস্থিরতার সমাধান ঘটে, তাহা নহে। কোথাও কোথাও এই বিষয়টি অমীমাংসিত থাকিয়া যায়। আর সেই ‘আনফিনিশড রেভল্যুশন’ তথা অসমাপ্ত বিপ্লবের রেশ বহু বত্সর ধরিয়া চলিতে পারে।
সুতরাং যেই বিপ্লব অসমাপ্ত, যেই আকাশে যেই কৃষ্ণমেঘ জমা রহিয়াছে, তাহা হইতে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি তো হইবেই। যতদিন না সেই মেঘের পুরোপুরি ক্ষয় হইতেছে, ততদিন বৃষ্টির ধমক থামিবে না, ততদিন প্রকৃতিও থমথমে থাকিবে। কিন্তু দেখা যায় যে, এই মৌলিক প্রশ্ন বুঝিয়া বা না-বুঝিয়া অনেকেই উলটাপালটা কথার ফুলঝুরি ছুটান। ইহা অজ্ঞতার সমতুল্য। অসমাপ্ত বিপ্লব যেইখানে ঘটিয়াছে, সেইখানে সহিংসতা, হানাহানি, বড় বড় হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান, পালটা অভ্যুত্থানসহ সকল কিছু মিলাইয়া একটি কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতা তৈরি হইয়া থাকে। ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনো বিশ্বের নানান রাষ্ট্রে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে।
শুরুতে আমরা বলিয়াছিলাম, সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে মানুষের ইতিহাস অন্যরকমও হইতে পারিত! ‘অসভ্য’ হইতে ‘সভ্য’ হওয়া পর্যন্ত মানবজাতি প্রতিটি মানুষের জীবনরক্ষা তথা উপকার করিবার জন্যই তো অধিক মনোযোগী হইতে পারিত। কিন্তু উপকারের পরিবর্তে মানুষ নিজের ক্ষমতা দেখাইতেই অধিক অস্থির হইয়া উঠিল। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে—মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী—যাহাই হউক না কেন, তাহা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষের জীবনের অপরিসীম গুরুত্ব ও মূল্যের কথা মহান সৃষ্টিকর্তা এইভাবে বলিয়াছেন যে, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করিবার জন্য কেহ কাহাকে হত্যা করিল—সে যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হত্যা করিল। আর কেহ কাহারো প্রাণ রক্ষা করিল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করিল।’ সুতরাং প্রতিটি মানুষের প্রাণের এই মূল্য আমাদের বুঝিতে হইবে। নচেৎ পৃথিবীতে শান্তি আসিবে না।
