এখনও শরীরে তার যুদ্ধের ক্ষত

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২১:১৭

একাত্তরের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া লাখো মুক্তি সেনাদের মধ্যে নওগাঁর ধামইরহাটের আফজাল হোসেন একজন। তিনি উপজেলার কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামের এক কৃষকের সন্তান। বর্তমানে আফজাল হোসেন উপজেলা পৌর শহরের দক্ষিণ চকযদু টিঅ্যান্ডটি মহল্লার বসবাস করছেন।

প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মুক্তিবাহিনীর ৭ নাম্বার সেক্টরে যোগদান করেন। তিনি সেক্টর কমান্ডার রউফের অধীনে যুদ্ধ করেন। বিভিন্ন রণাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানোর কারণে তাকে নওগাঁর ধামইরহাট, রাঙ্গামাটি, র্ফাশিপাড়া, হিলি, চৌঘাট ডাঙ্গি এলাকার পাকহানার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৭১-এর উত্তাল মার্চের কথা। ঢাকা শহরের মতো সারা দেশেই পাক সেনাদের তাণ্ডব চলছে। নওগাঁর সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলা ধামইরহাট তখন এমনই এক তাণ্ডবময় এলাকা। এলাকার মানুষগুলোর অধিকাংশই তখন সীমান্ত পেড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। সদ্য পাশ করা গ্রাজুয়েট আফজাল হোসেন দাঁড়িয়ে দেখছেন সে দৃশ্য। সীমান্তের ওপাড়ে যদি যেতেই হয়, তবে ফিরে আসব ট্রেনিং নিয়ে। রুখব পাক সেনাদের। কিন্তু ভাবনাটা বাস্তবে রূপ পাবার আগেই ছোট্ট বাজারটাতে হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধ আফজাল হোসেন জানান, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের দিকে প্রথমে পাকিস্তানি সেনাদের তাড়া খেয়ে বাড়ি হতে কমপক্ষে পাঁচ মাইল দূরে আত্রাই নদীতে পানির নিচে মাথা বের করে ডুবে থাকেন। পরদিন বাড়ি ফিরে ধামইরহাট উপজেলার শেষ সীমানা আলতাদিঘীর পূর্ব পাড়ে পালিয়ে যান। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বাবা-মাকে না বলে বাঙ্গালিপুর ইয়থ ক্যাম্পে ভর্তি হন। সেখানে ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবুল আজাদ। সেখানে এক মাসের ট্রেনিং দেওয়ার পর ১০০ জনের একটি টিমকে আর্মি ভ্যানে জলপাইগুড়ি অর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং সেখানে মেজর রেড্ডীর অধীনে ট্রেনিং করেন। ১৫ দিন পর সবাইকে বিমানে করে দার্জিলিং বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যায় এবং পরদিন উত্তর প্রদেশের টান্ডুয়া দেরাদুন নামক স্থানে মেজর মালহুতরা ও মেজর চোয়ানের অধীনে এক মাস ট্রেনিং নেন।

যুদ্ধের দুঃসাহসী অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে আবার তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। ফিরে যান সেই অগ্নিঝরা দিনে। একের পর এক বলে যান অগ্নিঝরা দিনের স্মৃতির গৌরবময় অধ্যায়। যা আজও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় একাত্তুরের রণাঙ্গনে।

তিনি বলেন, ১০ ডিসেম্বর চৌঘাট ডাঙ্গী নামক স্থানে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৪ ডিসেম্বর ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আত্রাই নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটু একটু করে শত্রুর অবস্থানের দিকে এগোতে থাকেন। এমন সময় তার মাথার ওপর দিয়ে গুলি হচ্ছিল ঠিক তখন তিনি লাফ দিয়ে মাটিতে পড়ার সময় বাম হাতটি ভেঙে যায় এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচে গুলির ছটা লাগে। এখন সেই হাতটি ভালো হলেও আজও বাঁকাই আছে এবং পায়ের গুলির দাগটি এখনও চিহ্ন বহন করে।

যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া দেওয়া হয়নি কোনো খেতাবপ্রাপ্ত পদবি। আফজাল হোসেন এখনও বেঁচে আছেন শরীরে যুদ্ধদিনের সেই ক্ষত নিয়ে। বেঁচে আছেন শহীদ লড়াকু সব মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি নিয়ে।                                                                                                

ইত্তেফাক/আরএজে