আমাদের বিশ্বকাপ হুজুগ!

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৪০

ডলারের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে ঘাটতি, লাফিয়ে লাফিয়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া, বেকারত্ব, রাজনৈতিক সংঘাত ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত দেশের মানুষ। এর মধ্যেই গণমাধ্যমগুলো বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছে। বিশ্বকাপের নেশায় সবাইকে বুঁদ বানাতে গণমাধ্যমগুলোর কোনো জুড়ি নেই। 

ফুটবল বিশ্বকাপের নেশায় মেতে উঠেছে গোটা দুনিয়া, বাদ নেই বাংলাদেশও। বাঙালির কাছে তো বিশ্বকাপ মানে আবেগের ঝড়। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে খেলার মানে পিছিয়ে থাকলেও আবেগ ও ভালোবাসায় যে বাঙালি কোনো অংশে কম নয়। এখানে দলের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়া, মারামারি এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত হয়। ফিফার সর্বশেষ র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় তলানিতে। তবে খেলার মান নিয়ে করা এই তালিকার পাশাপাশি যদি খেলা সমর্থন নিয়ে একটি তালিকা করা যেত, তাহলে বোধ হয় বাংলাদেশের নাম ওপরের দিকেই থাকত। চ্যাম্পিয়ন হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। সেই বিবেচনায় বিশ্বকাপ আসলে আমাদের!

বিশ্বকাপের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তার আগমনীর সুর শোনা গিয়েছিল ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়, বাড়ির ছাদে, গলির মোড়ে প্রিয় দলের পতাকা টাঙানোর হিড়িক দেখে। দোকানে দোকানে সাজানো নানা দেশের পতাকা, জার্সি থেকে এই বিশ্বকাপের জন্য নির্দিষ্ট বলও। খুদে থেকে প্রৌঢ় সবাই ভিড় জমাচ্ছে তাদের পছন্দের দেশের পতাকা বা জার্সি কিনতে। যদিও এই জার্সি বা পতাকার চাহিদা সীমিত থাকে ৩২টার মধ্যে পাঁচ-ছয়টা দেশের মধ্যেই। বাঙালি ফুটবলপ্রেমী প্রতি চার বছর অন্তর তাদের প্রিয় আওয়ামী লীগ-বিএনপি ভুলে বিভক্ত হয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালিতে। 

যদিও দুঃখের বিষয় এই যে ইতালি ২০২২ বিশ্বকাপের মূল পর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তাই এইবারের বিশ্বকাপে বাঙালির সেরা পাঁচ বাজি হলো ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনে।

আজও যেমন ফুটবলপ্রেমীদের চিরকালীন তর্কের বিষয় ‘পেলে বনাম ম্যারাডোনা’, সে রকম বেশ কিছু বছর ধরে আরো এক তর্কের সৃষ্টি হয়েছে ‘মেসি বনাম রোনালদো’ অথবা ‘মেসি বনাম নেইমার’। কিন্তু এ দুই তর্কের অনেক পার্থক্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান হলো পেলে ও ম্যারাডোনা দুজন দুই সময়ের খেলোয়াড়। এদিকে মেসি, রোনালদো বা নেইমার একই সময়ের খেলোয়াড়। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। গত তিন বারের বিশ্বকাপের মতো এবারও সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে শুরু হয়ে গেছে যুক্তিতর্কের খেলা।

বাঙালির যাবতীয় হুজুগ আপাতত বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে। ডিজিটাল যুগে এসে যাবতীয় উত্তেজনা সবাই ঢেলে দিচ্ছে ফেসবুকে কিংবা ব্লগে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। নিজেকে আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি মনে করি। আপাতত আমিও ফুটবল নিয়েই আছি। কারণ ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আছে গোটা দেশ। যেখানেই যাই, সেখানেই ফুটবল নিয়ে আলাপ কিংবা বিলাপ। বিশ্বকাপ ফুটবলের একটা মজার দিক আছে। সেটা হলো সবাই এই খেলাটা বোঝে। সবাই কোনো কোনো না দলের সমর্থক।

আমাদের দেশের মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে একটু বেশিই মাতামাতি করে। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে অনেক মানুষেরই ধ্যান-জ্ঞানে পরিণত হয় বিশ্বকাপ। বিশেষ করে যুবসমাজ পুরোই মত্ত হয়ে পড়ে। তেমন একটা পুরোনো কাহিনি। তখন ব্রাজিল দলে সক্রেটিস নামে এক খেলোয়াড় ছিল। বিশ্বকাপ খেলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষক এক ছাত্রকে বললেন, 
-সক্রেটিসের নাম শুনেছ?
-জি স্যার!
-বল তো তিনি কেন বিখ্যাত ছিলেন?
-স্যার সক্রেটিস পেশায় একজন ডাক্তার এবং লিংকম্যান!
-মানে কী?
-মানে হলো, সক্রেটিস ব্রাজিল দলে খেলতেন।
-কী খেলতেন?
-সক্রেটিস ব্রাজিল দলে ফুটবল খেলতেন এবং তার পজিশন ছিল লিংকম্যান, পেশায় একজন ডাক্তার।
-এই উত্তর শুনে তো শিক্ষকের আক্কেলগুড়ুম! 

বাংলাদেশ কত সালে স্বাধীন হয়েছে, তাজউদ্দীন আহমদ কে ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর না জানলেও এখনকার তরুণ-তরুণীরা প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের নাম কী, তারা কে কোন ক্লাবে কত টাকার বিনিময়ে খেলেন, কার রেকর্ড কী—এসব প্রশ্নের জবাব গড়গড় করে বলে দিতে পারেন। ঘুমকাতুরে কিশোরটিও এখন রাত জেগে মগ্ন হয়ে খেলা দেখে। ফেসবুকে নিয়মিত স্ট্যাটাস দেয়। কোনো ক্লান্তি নেই। ঘুমও নেই। বিশ্বকাপ যেন এক টনিকের নাম! বিশ্বকাপ এসে কত আলোড়ন যে উত্পাদন করেছে! প্রথমত, সমাজে ঝাঁক-মানসিকতার জয়জয়কার চলছে। যার কোনো কালে ফুটবলের প্রতি ন্যূনতম উত্সাহ ছিল না, তাকেও মুখরক্ষার জন্য অহরহ খোঁজ নিতে হচ্ছে—আর্জেন্টিনা কী করল, ব্রাজিলেরই বা কী দশা। যিনি সিরিয়াল নিয়ে দিব্যি আহ্লাদে আছেন, তিনিও টিভিমগ্ন সন্তানকে জিজ্ঞেস করছেন, সাদা রঙের জার্সি পরা দেশটার নাম কী রে? কে জিতছে, তোর দল না অন্যরা? তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে থাকার অধিকার রয়েছে এবং নিজ ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকারও কারোর নেই, কিন্তু বাস্তব প্রায়ই তত্ত্বের ধার ধারে না। স্বতন্ত্র থেকে অধিকাংশ মানুষই স্বস্তি লাভ করে না, কোনো না কোনো স্তরে তার স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়। তাই ভান করে হলেও দলে মিশে যেতে পারলে, সবার সঙ্গে সমান চিৎকার করে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ প্রমাণ করতে পারলে মানুষ বিশেষ তৃপ্তি পায়। হয়তো তার সাধনা অনন্য নয়, নিছক অন্য হয়ে থাকা। এরপর আসে সমর্থনের প্রধান দল বেছে নেওয়ার দায়। কেউ যদি বলে, কে জিতল তা নিয়ে কী আসে যায়, খেলা কেমন হলো সেটাই আসল, তবে তাকে নিতান্ত বেরসিক ধরা হয়। আমাদের দেশে আবার ঐতিহ্য রয়েছে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার প্রবল পক্ষ নেওয়ার। এমন একটি ধারণা আমাদের দেশে প্রচলিত, ল্যাটিন আমেরিকার দলগুলোর খেলায় শিল্পের স্পর্শ সমধিক, ইউরোপীয় দলগুলো নান্দনিকতা অপেক্ষা কার্যকারিতার প্রতি মনোযোগী। তাই যে জাতি চিরকাল বিজয়ী হওয়ার পরিবর্তে সৌকর্য ঝলকে হারিয়ে যাওয়াকে মহিমান্বিত করেছে, সে ল্যাটিন আমেরিকার দলকেই সমর্থনের জন্য বাছবে, এ আর আশ্চর্য কী?

সীমার মাঝে অসীমের ব্যাপারটিও গুরুত্বপূর্ণ। সবাই জানে ফুটবল দলগত খেলা। ১১ জন খেলোয়াড় মিলে মাঠে যুদ্ধ করতে হয়, রণকৌশল নির্ণয়ে ভূমিকা থাকে কোচ ও তার সহকারীদেরও। কিন্তু কৃতিত্ব বা দোষারোপের ক্ষেত্রে চিরকাল বেছে নেওয়া হয় একটি মুখকেই। সাধারণত যে কোনো বৃহৎ কাণ্ড ফলবতী বা নিষ্ফলা হয় বহু মানুষের অবদানে ও পারস্পরিক সহায়তার ব্যাকরণে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে কোনো আন্দোলন, কোনো খেলা, কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ প্রয়াসের বিশ্লেষণ ধারণায়ত্ত হয় না, যতক্ষণ না একটি বা দুটি ব্যক্তিকে সেই গতিবিধির জন্য দায়ী করতে পারছে। যদি আর্জেন্টিনা হারে, তার জন্য একা মেসি দায়ী, যদি বিপ্লব সফল হয়, তার জন্য একা লেনিন কৃতিত্বাধিকারী। নিঃসন্দেহে একটি বা দুটি ম্যাচে এক জন ফুটবলার একাই রং ঘুরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিশ্বকাপকে যখন মারাডোনা, পেলে বা রুমেনিগের বিশ্বকাপ বলে চিহ্নিত করা হয়, তার মূলে থাকে ইচ্ছাকৃত খণ্ডদর্শন। আবার, প্রতিষ্ঠিত মহানায়ককে ছেড়ে যখন কেউ অন্যদের অবদানের বিষয়ে সরব হন, তিনিও বেছে নেন এক জন বা দুই জন ‘কাব্যে উপেক্ষিত’কেই। আসলে সেতু বাঁধার কৃতিত্ব রামেরই হবে, তাজমহল গড়ার গৌরব শাহজাহানেরই থাকবে, তন্নিষ্ঠ কাঠবিড়ালি বা নকশাকার কারিগর শ্রমিকদের কথা কেউ মনে রাখবে না। এর নেপথ্যে অবশ্য কোনো চক্রান্ত নেই, এই মনোভাবের মূলে আছে নায়কপূজার প্রকাণ্ড ঈপ্সা, আর সিন্ধু দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বিন্দুর মধ্য দিয়ে তাকে বোঝানোর প্রয়াস।

তবে বিশ্বকাপের মূল উপযোগিতা হলো এই কয়েক দিন সব দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেওয়া। এ ধরনের যে কোনো হুজুগই মানুষকে বাস্তব ভুলিয়ে রাখে। তার দেশের দুরবস্থা, বন্যার প্রকোপ, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল, সবকিছুকে ছাপিয়ে বিশ্বকাপের সানন্দ কলরব কিছুদিনের জন্য আকাশ-বাতাস ভরে রাখে। ক্রীড়া ও নানা উৎসবের আরোপিত আনন্দের উদ্দেশ্যই তা :নিজের চোখ বন্ধ রেখে দৈনন্দিন গ্লানি থেকে মুক্তি। কখনো ক্রিকেট, কখনো ফুটবল, কখনো নিউ ইয়ার, কখনো ভ্যালেন্টাইন ডে—এ রকম নানা হুল্লোড় এসে বিবিধ অন্যায়দীর্ণ এই দেশে তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোকে ক্রমান্বয়ে ঢেকে দিতে থাকবে। আমরাও আনন্দে বগল বাজিয়ে যাব।

তবে আমরা এটাও জানি, ফুটবল হলো এক অসাধারণ কূটনীতি কিংবা মানূষকে ভালোবাসার নাম, যা গোটা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে নেয়। এখানে কোনো ভাষা কিংবা শিক্ষা না থাকলেও হয়। কারণ ফুটবলের রয়েছে এক নিজস্ব ভাষা। ফুটবল আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে পরাজিত হয়েও আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়!

লেখক : রম্যরচয়িতা

 

ইত্তেফাক/ইআ