ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত বেশ শক্ত

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৫০

একজন প্রাক্তন ব্যাংকার হিসেবে মাঝে মাঝেই বিচিত্র প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। পরিচিতজনদের অনেকেই প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা নাকি খুবই খারাপ? ব্যাংকে টাকা আমানত রাখলে নাকি সেই টাকা আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই? বিশেষ করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণের আবেদনের পর থেকে সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে গিয়ে তাদের দেওয়া ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কারের শর্তাদি প্রকাশিত হওয়ার পর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। 

সোশ্যাল মিডিয়া এবং কোনো কোনো মূলধারার পত্রিকায় ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের কারণে আমানতকারীদের মধ্যে একধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কিছু মানুষ অসৎ উদ্দেশ্যে এই গুজবকে উসকে দিচ্ছে যে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থায় রয়েছে। তারা চাইলেও আমানতকারীদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়েছে যে, ব্যাংকিং সেক্টরে কোনো তারল্যসংকট নেই। বরং যথেষ্ট পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। কাজেই কোনো ধরনের গুজবে কান দেওয়া ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো ব্যাংকে কিছুটা সমস্যা থাকলেও তা দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে নয়। ব্যাংকিং সেক্টরকে বলা হয় একটি দেশের ‘অর্থনীতির লাইফলাইন।’ ব্যাংক চলে সাধারণ মানুষের আমানতের ওপর নির্ভর করে। আর সাধারণ মানুষের পরিপূর্ণ আস্থা আছে বলেই ব্যাংকে তার উদ্বৃত্ত অর্থ আমানত হিসেবে জমা রাখে। ব্যাংক ব্যবসার সাফল্য নির্ভর করে মানুষের আস্থা আর বিশ্বাসের ওপর। মানুষ অর্থ ও সম্পদের শোক ভুলতে পারে না। তাই এমন স্থানে টাকা আমানত রাখতে চায় না, যেখানে সামান্যতম আস্থার ঘাটতি থাকে। উদ্বৃত্ত অর্থের মালিক মূলত কয়েকটি কারণে ব্যাংকে টাকা আমানত রাখেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো তার উপার্জিত অর্থের সর্বোত্তম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেউ যদি তার বাসায় অর্থ সঞ্চিত রাখেন, তাহলে সেই অর্থ যে কোনো সময় চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে তার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া আর একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও তাকে ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। কোনো ব্যক্তির কাছে প্রচুর নগদ অর্থ আছে—এই সংবাদ জানাজানি হয়ে গেলে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব প্রয়োজনের সময় অর্থ ধার চাইতে পারে। সেই অবস্থায় ধার দিলে অর্থের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু অর্থ ব্যাংকে রাখলে ধারপ্রার্থীদের কাছ থেকে একধরনের দায়মুক্তি পাওয়া যায়। তাদের বলে দেওয়া যায়, আমার টাকা ব্যাংকে রাখা আছে, কাজেই তা তুলে আনা যাবে না। এই শ্রেণির আমানতকারীরা তুলনামূলক কম সুদ পেলেও ব্যাংকে টাকা আমানত রাখবেন। দ্বিতীয় যে কারণটি উল্লেখ করার মতো তা হলো, ব্যাংকে টাকা আমানত রাখলে নির্ধারিত হারে সুদ পাওয়া যায়। একটি ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি অ্যাকাউন্ট হচ্ছে—(ক) সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা সঞ্চয়ী হিসাব, (খ) এফডিআর বা মেয়াদি আমানত এবং (গ) কারেন্ট অ্যাকাউন্ট বা চলতি হিসাব। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব থেকে যে কোনো দিন ইচ্ছা করলেই অর্থ উত্তোলন করা যায়। অর্থের পরিমাণ বেশি হলে এক দিন আগে টাকা উত্তোলনের নোটিশ দিতে হয়। সঞ্চয়ী হিসাবে রাখা অর্থের ওপর নির্ধারিত হারে সুদ প্রদান করা হয়। এফডিআর বা মেয়াদি হিসাব থেকে নির্ধারিত মেয়াদ পূর্তির আগে অর্থ উত্তোলন করা যায় না। কেউ যদি নির্ধারিত সময়ের আগে অর্থ উত্তোলন করতে চান, তাকে লিখিত আবেদন করতে হবে এবং কম পরিমাণ সুদ পাবেন। আর চলতি হিসাবে টাকা রাখলে ব্যাংক কোনো সুদ প্রদান করে না। কারণ এই হিসাব থেকে যখন-তখন চাইলেই অর্থ উত্তোলন করা যায়। ব্যাংক চলতি হিসাবে রাখা অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করে না। ব্যাংক সাধারণত মেয়াদি আমানতের অর্থই বিনিয়োগ করে। সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থও বিনিয়োগ করা হয় স্বল্প সময়ের জন্য। মেয়াদি হিসাবে রাখা অর্থের ওপর সবচেয়ে বেশি সুদ দেওয়া হয়। একটি ব্যাংক যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করে, তার পুরোটাই বিনিয়োগ করে না। কিছু অর্থ তার নিজের কাছে রাখতে হয় আমানতকারীর তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর জন্য। এই নগদ অর্থকে তারল্য বলা হয়। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরের মোট আমানতের পরিমাণ হচ্ছে ১৪ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের মোট আমানতের ১৭ শতাংশ উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা প্রয়োজন আড়াই লাখ কোটি টাকা। কিন্তু আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্যের হার হচ্ছে ২৮ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের লিকুউডিটি কাভারেজ রেশিও হচ্ছে ১৪৩ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ, যেখানে লিকুইডিটি রেশিও ১০০ টাকা হলেই পর্যাপ্ত বলে মনে করা হয়, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ১৪৩ দশমিক ১০ টাকা রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরে ফান্ড ম্যানেজমেন্টর একটি সাধারণ সূত্র হচ্ছে, কোনো সময়ই সব গ্রাহক একযোগে তাদের পুরো অর্থ উত্তোলন করেন না। কিছু টাকা সব সময়ই ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকে। জনগণ এই টাকা দিয়ে তাদের দৈনন্দিন লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। বর্তমানে ব্যাংকবহির্ভূত টাকার পরিমাণ হচ্ছে ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরের একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। কোনোভাবেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো যাচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরের মোট ছাড়কৃত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করছে। মাত্র আটটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ হচ্ছে ১৯ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ব্যাংকিং সেক্টরে যে ঋণ প্রদান করা হয়, তার বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। প্রত্যেক শ্রেণির ঋণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় মূলত ব্যাংকে রক্ষিত গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা বিধানের জন্য। এজন্য একে নিরাপত্তা সঞ্চিতিও বলা হয়। বর্তমানে যে নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে নিয়মিত ঋণ হিসাবের বিপরীতে ১ শতাংশ, কোনো মানে শ্রেণিকৃত হয়নি এমন ঋণ হিসাবের জন্য ৫ শতাংশ, সাব-স্ট্যান্ডার্ড বা নিম্নমানের ঋণ হিসাবের জন্য ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণ হিসাবের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ ঋণ বা লোকসান হিসেবে ঘোষিত ঋণ হিসাবের জন্য শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা হচ্ছে বহতা নদীর মতো, উত্থান-পতন যার স্বাভাবিক পরিণতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নানা সমস্যা ও জটিলতার মধ্য দিয়ে গেলেও একটি ব্যাংকও দেউলিয়া হয়নি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত বেশ শক্ত। সামান্য আঘাতেই আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসে পড়বে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে রক্ষিত জনগণের আমানত রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত। কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্র সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে জনগণের আমানতের সরাসরি গ্যারান্টর রাষ্ট্র না হলেও তাদের অর্থ যাতে খোয়া না যায়, রাষ্ট্র সে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। 

আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নানা সমস্যায় জর্জরিত ঠিকই, কিন্তু আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারবে না বা দেউলিয়া হয়ে যাবে এমনটি নয়। তাই অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমানতকারীরা ব্যাংকে গচ্ছিত তাদের আমানত সম্পর্কে নিশ্চিন্তায় থাকতে পারেন।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক

 

ইত্তেফাক/ইআ