এ কথা অনস্বীকার্য যে, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ভারতের অসম বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অংশীদার হয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে ভারত আমাদের একটা বড় উৎস ছিল। যদিও এখন চীন অবস্থানটি নিয়েছে। ভারত এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি ক্ষেত্র। ভারত থেকে আমরা যে সব পণ্য আমদানি করি গত কয়েক বছরে তার কম্পোজিশনে বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুর দিকে আমাদের অতিমাত্রায় নির্ভরতা ছিল খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ওপর। বর্তমানে কাঁচামাল ও শিল্পায়নে প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রের মতো পণ্যের দিকে আমদানিটা স্থানান্তরিত হয়েছে। তার অর্থ হলো ভারত থেকে আমরা যা আমদানি করছি তার বড় অংশ রপ্তানি খাতে কাঁচামাল হিসেবে কিংবা যন্ত্রপাতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি এবং দেশীয় শিল্পকারখানায় তার ব্যবহার দেখছি।
ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এই যে কম্পোজিশনাল শিফট সেটি ইতিবাচক। এটিকে আমরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিসরে বেশ একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখতে পারি। কারণ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করা অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এ ধরনের গাঠনিক/উপাদানগত রূপান্তরটা দেখা যাচ্ছে না। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে কিছুটা হয়েছে, নেপাল-ভুটানের ক্ষেত্রে একদমই নয়। নেপাল ও ভুটানের ভারতের ওপর একটা অতিমাত্রায় নির্ভরতা আছে একেবারে বেসিক কমোডিটিজ নিয়ে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। সক্ষমতাকে অনেকের তুলনায় যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পেরেছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে লক্ষ করছি, বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি করার আরো অনেক বেশি সক্ষমতা আছে। আরো সম্ভাবনাও আছে। এক্ষেত্রে কিছু শুল্ক ও অশুল্ক বাধা আছে, এগুলোকে যদি দূর করা যায় তাহলে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি বেশ কয়েক গুণ বাড়বে। তবে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শুল্ক বাধা অবশ্য তেমন নেই, যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ২০১১ সাল থেকে ভারত শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অশুল্ক বাধার মুখোমুখি হয়েছেন বলে রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বেশকিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে যে বাণিজ্যের ধরন এবং বাণিজ্যের যে উপায় অর্থাৎ নদী ও স্থলবন্দরের কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত অবস্থা অনেক দুর্বল। ফলে এটা বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ভালো রকম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি কিছু লেজিটেমেট নন-ট্যারিফ মেজারস আছে, যেমন টেকনিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে ফাইটো-স্যানিটারি মেজারস। কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য অথবা শিল্প পণ্য সেগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সার্টিফিকেট ইস্যু করে, সার্টিফিকেটের যে অথরিটি তাদের অনেক সার্টিফিকেট ভারত গ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে মেজর রিকগনিশন এগ্রিমেন্ট বলি অথবা আমাদের যে সার্টিফিকেট ইস্যু ইন অথরিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি এগুলো সামনের দিনগুলোতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে।
আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানিতে সাফল্যও এসেছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে ভারত থেকে কাঁচামাল আমদানির যে পণ্য সেগুলো যথাযথ ব্যবহার করে রপ্তানি করতে পেরেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ রপ্তানি হয়তো কয়েক গুণ বেড়েছে, কিন্তু এ সম্ভাবনা আরো বেশি আছে। এটা গেল বাণিজ্যের দিক। বিনিয়োগের দিকে লক্ষ করা যাক। ভারতের যে বিনিয়োগকারীরা আছেন তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করেন, এশিয়া-আফ্রিকাসহ অনেক দেশে, সে তুলনায় বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ অনেক কম। বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ এখনো করেনি ভারত। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিংসহ আনুষঙ্গিক যে খাতগুলো রয়েছে। এ সুবিধা ভারত থেকে এখন পর্যন্ত নেওয়া যায়নি। বাংলাদেশ যেহেতু শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত অথবা কানাডায় পায়। ভারতের বিনিয়োগকারীদের আমি দেখিনি যে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে ঐ দেশগুলোতে রপ্তানি করা বা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিছু কিছু ভারতের বিনিয়োগকারী হয়তো বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে আছেন, তবে বড় পরিসরে নেই।
সম্প্রতি যে উদ্যোগগুলো দেখছি, বিশেষ কোনো জোনের মাধ্যমে বিশেষ করে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডেজিগনেটেড। কিন্তু যতটুকু আমরা দেখি তথ্য-উপাত্ত সেগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এ জায়গাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। এজন্য বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকে যদি তাকাই প্রতি বছরই সেটি বাংলাদেশের বিপক্ষে যাচ্ছে। দুদেশে বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে। যদিও আমি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ছাত্র হিসেবে বলি যে বাণিজ্যিক ঘাটতি খুব বেশি উদ্বেগজনক নয়। বাংলাদেশ-ভারতের যেমন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক ঘাটতি আছে ঠিক তেমনই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইউএসের সঙ্গে। বাংলাদেশ যে পরিমাণে পণ্য ভারত থেকে আমদানি করে তার একটি বড় অংশ রপ্তানি খাতে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের বাণিজ্যিক ঘাটতি উদ্বেগের বিষয় নয়। তবে যে জায়গায় সম্ভাবনাগুলো রয়েছে সে জায়গাগুলোতে আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগটা বড় একটা চালিকাশক্তি হতে পারত ভারতের বিনিয়োগে। সে জায়গায় ভালোভাবে নজর দেওয়া দরকার। বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগের পরিবেশের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব আইন বা নীতি আছে, সেক্ষেত্রে দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে আছে। এগুলো দূর করে ভারতের বিনিয়োগ বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে অবকাঠামো, সেবা, পর্যটন, যোগাযোগ, পরিবহনে জোর দেওয়ার সুযোগ আছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে আমরা যদি একটা আন্তঃসম্পর্ক দেখতে চাই, সে আন্তঃসম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের ভেতরে যে মিথস্ক্রিয়া হয় এবং মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে যে সর্বোচ্চ লাভ করা যেতে পারে সে সুযোগটা আমরা মনে করি এখনো রয়েছে বাংলাদেশের।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.
