সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিহাস অন্বেষণ করলে ব্যক্তিজীবনের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। আবার ব্যক্তিজীবনের ইতিহাস অনুসন্ধানে সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিহাসের অঙ্গ ও অনুষঙ্গ উদ্ঘটিত হয়। অর্থাৎ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের ইতিহাস আন্তঃসম্পর্কিত, অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য। কেননা, ইতিহাসই জীবন, জীবনই ইতিহাস। তবে বিশেষ কোনো ব্যক্তি অনিবার্যভাবেই ইতিহাসের নির্মাতা ও পথপরিদর্শক হন। যেমন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা, স্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা বা জনক। আর কিছু ব্যক্তি থাকেন এসব ইতিহাস নির্মাণ-বিনির্মাণের অঙ্গ-অনুষঙ্গ হয়ে, ইতিহাস নির্মাতার সহচর-সহযাত্রী হয়ে বা ইতিহাসের দ্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হন। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ডা. এস এ মালেক এমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণে বঙ্গবন্ধুর সহচর ছিলেন, সহযাত্রী ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন প্রচারের প্রধান কান্ডারি ছিলেন। তিনি গত ৬ নভেম্বর এ ধরাধম থেকে ৮৮ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন।
আমি প্রায় এক যুগ ধরে ডা. এস এ মালেককে খুব কাছ থেকে দেখেছি ও জেনেছি। এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিবিদ খুব বেশিসংখ্যক দেখা মেলে না রাজনীতির অঙ্গনে। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর ১ নম্বর সদস্য, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সবশেষ সভাপতি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। এরপর বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তাকে বিশেষ কিছু দায়িত্ব দেন। রাজবাড়ীতে ৬-দফা বাস্তবায়ন কমিটির কনভেনার হিসেবে জনমত গঠন করতেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রচারাভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে গোপনে তিনি অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে মুজিবনগর সরকার তাকে ফরিদপুর জেলার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি ২১ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর ঐ অঞ্চল মুক্ত করেন এবং জেলা প্রশাসক হিসেবে গোপালগঞ্জ সাবডিভিশন সদরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। মুজিবনগর সরকারের পূর্ণ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন সেখানে।
মুজিবনগর সরকার ডা. এস এ মালেককে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় ‘ক্যাপ্টেন হালিম’ নামে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ৮ থিয়েটার রোড, কলকাতায় সাক্ষাৎ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরও। তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অনুরোধ করেন তার অন্ততপক্ষে দুটি পরামর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য। এক নম্বর হচ্ছে ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা এবং অন্যটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবনগর সরকারের প্রশাসন পুনর্গঠন করা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার উভয় পরামর্শ গ্রহণ করেন।
মানুষ হিসেবে তাকে দেখেছি একজন প্রচারবিমুখ হিসেবে। নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু লেখেননি, যদিও লেখক হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। শুধু বঙ্গবন্ধুর দর্শন প্রচারই নয়, তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলেন লেখনীর মাধ্যমে। ইংরেজি ও বাংলায় তার কয়েক হাজার লেখা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনাও করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিষয় তার লেখনীর মূল উপজীব্য।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করলে ডা. এস এ মালেক দেশে-বিদেশে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সামরিক শাসক এই কারণে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। ১৯৮০ সালে দেশে ফিরে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ পুনর্গঠন করেন। নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। আড়াই দশক ডা. এস এ মালেক বঙ্গবন্ধু পরিষদের মাধ্যমে দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করেন। তিনি জাতিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করতে নেতৃত্ব দেন।
টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণকারী ডা. এস এ মালেক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। কর্মজীবনের প্রথমেই ডাক্তার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮০ সালে দেশে ফেরত এসে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন। কারণ তিনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর যখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তখন সেখানে একজন ভারতীয় হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক তার বুকে অস্বস্তির জন্য জন্য জিহ্বায় দুই ফোঁটা ওষুধ খেতে দিয়েছিলেন। সেই দুই ফোঁটা ওষুধে নিমেষেই তার বহু বছরের বুকে অস্বস্তির ভাব দূর হয়। তাকে তখন থেকেই ঐ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসা আকৃষ্ট করে। ঐ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকের কাছে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন তখন ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা।’ তাকে অত্যন্ত মানবিক চিকিৎসক হিসেবে দিখেছি। তার চেম্বারে দেখেছি রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও গরিব-দুঃখীদের তিনি বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিতেন। এমনকি, ওষুধও দিতেন বিনা মূল্যে। অনেক গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয় বহন করতেন তিনি।
রাজনীতি তাকে গ্রাস করেছে কিন্তু রাজনীতিকে তিনি গ্রাস করেননি, রাজনীতিকে ব্যবহার করে অর্থ-সম্পদ অর্জন করেননি। সাধারণ জীবন যাপন করতেন তিনি। তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করেছেন বটে কিন্তু তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে বেঁচে থাকবেন।
লেখক : শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর এবং সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি
