ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইডের পৃথিবী

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:৫৭

স্কটিশ লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসন ১৮৮৬ সালে প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহার জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইড’। একই মানুষের দুইটি রূপ ছিল—ভালো সত্তাটি হইল ‘ডক্টর জেকিল’ এবং খারাপ সত্তাটি মিস্টার হাইড। গ্রন্থটির মূল বক্তব্য এক কথায় : মানুষ একই সঙ্গে দেবতা ও দানব। এই চিত্র আমরা সমগ্র মানব জাতির ক্ষেত্রেই দেখিতে পাই। সম্প্রতি নূতন ও বৈপ্লবিক ধরনের এক চিকিৎসার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের ডাক্তাররা প্রথম বারের মতো নিরাময়ের অযোগ্য রক্তের ক্যানসার বা লিউকেমিয়া রোগ সারাইয়া তুলিতে সক্ষম হইয়াছেন। এই জন্য তাহারা ব্যবহার করিয়াছেন অত্যাধুনিক সেল ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোষের জিনগত পরিবর্তন ঘটাইয়া সেইগুলি রোগীর দেহের ক্যানসার কোষগুলিকে ধ্বংস করিবার কাজে ব্যবহার করা হইয়াছে। এলিসা নামের এক কিশোরীর দেহে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা চালাইয়া তাহার শরীর হইতে ক্যানসার দূর করা সম্ভব হইয়াছে। বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এই পদ্ধতির নাম ‘বেস এডিটিং’। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা জেনেটিক কোডের একটি বিশেষ অংশকে আকারে বড় করেন এবং পরে ইহার মলিকুলার বা আণবিক গঠনে পরিবর্তন আনেন। এইভাবে ইহার জেনেটিক নির্দেশনা বদলাইয়া দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানাইয়াছেন—একজন দাতার নিকট হইতে সুস্থ টি-সেল লইয়া তাহাতে জিনগত পরিবর্তন ঘটাইয়া সেইগুলি এলিসার শরীরে ঢুকাইয়া দেওয়া হয়—যাহা তাহার দেহের ক্যানসার সেলগুলিকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া ধ্বংস করিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছে! 

প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় চিকিৎসাবিজ্ঞান তুলনামূলক কম অগ্রগামী। তবে জেনেটিক মেনিপুলেশন বিজ্ঞানে খুব দ্রুত অগ্রগতি ঘটাইতেছে এবং নানা ধরনের রোগ সারাইয়া তুলিবার ক্ষেত্রে ইহার অপরিসীম সম্ভাবনা রহিয়াছে। এমন দিনও আসিবে মানুষ হয়তো সহসা বার্ধক্যে বা স্বাভাবিক রোগভোগে খুব কম মৃত্যুবরণ করিবে। এখনই তো বলা হয় বার্ধক্য আমাদের শরীরের কোনো অপরিহার্য দশা নহে, উহাও এক ধরনের রোগ। সুতরাং বিজ্ঞানের হাত ধরিয়া শুভ সত্তাসম্পন্ন ডক্টর জেকিলদের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষের পরমায়ু বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে; কিন্তু ইহা মুদ্রার একটি পিঠ। অপর পিঠে রহিয়াছে অশুভসত্তার ‘মিস্টার হাইড’। মিস্টার হাইডদের মাধ্যমে পৃথিবী অগ্রসর হইতে থাকিবে ধ্বংসের দিকে। ইহা যেন শুভ-অশুভের লড়াই। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বৈজ্ঞানিক অ্যাভি লোয়েব বলিয়াছেন, যেই দিন মানুষ প্রযুক্তির শীর্ষে পৌঁছাইয়া যাইবে, সবচাইতে উন্নত প্রযুক্তিগত ব্যবহারে অভ্যস্ত হইয়া উঠিবে, সেই দিন মানবজাতি ধ্বংসের মুখে পৌঁছাইয়া যাইবে। তিনি মনে করেন—‘মানুষের লোভের কারণে যেইভাবে পৃথিবীর অবস্থা দিনদিন খারাপ হইতেছে, তাহাতে মনে হয় না মানুষ আর খুব বেশি দিন পৃথিবীতে থাকিতে পারিবে। তিনি বলেন, ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ তো রহিয়াছেই, তাহার সহিত মানুষের তৈরি দুইটি আরো ভয়ংকর সমস্যার সম্মুখীন হইবে পৃথিবী। প্রথমটি মহামারি। দ্বিতীয়টি যুদ্ধ। ইতিমধ্যে জলবায়ুর লাগাতার পরিবর্তনে হিমবাহ দ্রুত গলিয়া যাইতেছে। সমুদ্রের উচ্চতা প্রতিনিয়ত বাড়িতেছে। কয়েক শত বৎসর ধরিয়া ঘুমাইয়া থাকা আগ্নেয়গিরিগুলি পুনরায় জাগিয়া উঠিতেছে। দাবানলের সংখ্যা বাড়িতেছে দিনকে দিন। অন্যদিকে বিভিন্ন শক্তিধর দেশে শত শত পারমাণবিক বোমা বসানো-ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা আছে। অন্তত ১ হাজার ৮০০ পরমাণু বোমা রহিয়াছে যেইগুলি খুব স্বল্প সময়ের নোটিশে নিক্ষেপ করা যাইবে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইতিপূর্বে বলিয়াছে, বর্তমানে বিশ্বে যেই পরিমাণ পরমাণু বোমা মজুত রহিয়াছে তাহা দিয়া সমগ্র বিশ্বকে ৩৮ বার পুরাপুরি ধ্বংস করিয়া ফেলা যাইবে। 

সুতরাং পৃথিবীতে চলিতেছে শুভ-অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব। মানুষই দেবতা, মানুষই দানব। উভয় শক্তিরই দড়ি টানাটানি হইতেছে। যাহার জোর অধিক তাহারই জয় হইবে। সুতরাং শক্তি বৃদ্ধি করিতে হইবে শুভসত্তার, যাহাতে বিনাশ ঘটানো সম্ভব হয় দানবসত্তার। কবির মতো আমরা কেবল আশাবাদ ব্যক্ত করেত পারি—এই পৃথিবী মানবের তরে, দানবের তরে নহে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন