রাজশাহীতে এক রাতে ১৫ কৃষকের ৪০০ আমগাছ কেটে ফেলার নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাগানের মালিক ও বাঘা থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এ তথ্য। তবে কাটা আমগাছের মালিকরা কেউ নিজেরা গাছ কাটার সত্যতা স্বীকার করেননি।
সংশ্লিষ্ট মনিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ‘লোকমুখে অনুমান ৪০০টি আমগাছ কাটার কথা শুনে তিনি সোমবারই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক মনে হলেও নেপথ্যে ঘটনাস্থলের তিন ফসলি জমি উদ্ধারের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ঐ জমিতে বছরে তিনটি ফসল হয়। বর্তমানে বাজারে সব ধরনের ফসলের চাহিদা এবং দাম বেশি। পক্ষান্তরে জমিতে আমগাছের ছায়া থাকার কারণে তেমন ফসলই হচ্ছিল না। আবার আমও পুরোপুরি আসছিল না। এতে করে জমির মালিক কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।
স্থানীয় কৃষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরো বলেন, সংশ্লিষ্ট বাগান মালিকদের অনেকের মধ্যে আলোচনা ছিল, যার যার আমগাছ নিজেরাই কেটে ফসলের আবাদ করবেন। ইতিমধ্যে অনেকে নিজেদের বাগানের আমগাছ কেটে জমি ফসলি করেও ফেলেছেন। তবে অনেকেই নানা অজুহাতে গাছ কাটতে বিলম্ব করছিলেন। এরই মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষ রাতের আঁধারে আমগাছগুলো কেটে ফেলতে পারেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটা দুই-চার জন অথবা কয়েক জনের কাজ নয়। গাছকাটার সঙ্গে অনেকগুলো মানুষ জড়িত বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রতিবেদকের কথা হয় বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন সাজুর সঙ্গে। তিনি জানান, একই এলাকায় রাতের আঁধারে প্রায় ৪০০ আমগাছ কেটে ফেলার খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, কেটে ফেলা আমগাছের মালিক অন্তত ১২-১৩ জন। কিন্তু থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন একমাত্র সাধন কুমার প্রামাণিক। মঙ্গলবার পর্যন্ত আর কেউ আর কোনো অভিযোগ দেননি। এমনকি কোনো গাছের মালিক পুলিশের সঙ্গে কথাও বলেননি। বরং সাধন কুমার প্রামাণিকের অভিযোগের সূত্রধরে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশই আমগাছের মালিকসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিপুলসংখ্যক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। পুলিশের সঙ্গে কথা বলা মানুষেরাও তিন ফসলি জমি উদ্ধারের জন্য আমগাছ কাটার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন।
ওসি বলেন, আমগাছগুলো কাটার সঙ্গে কারা জড়িত তদন্তের মাধ্যমে অবশ্যই তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে সেটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক পুলিশীতদন্তে তিন ফসলি জমির ‘অলাভজনক’ বাগান উচ্ছেদই রাতের আঁধারে এতগুলো গাছকাটার কারণ বলে মনে হতেই পারে। কারণ বিপুলসংখ্যক গাছকাটায় জড়িতরা হয়তো ‘পরিবেশ আইন’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, গত বছরও আলোচিত হাবাসপুর এলাকার আমবাগান ‘অলাভজনক’ ছিল। গাছগুলোর অধিকাংশই প্রায় আমশূন্য বাজে অবস্থার মধ্যে ছিল। সবমিলিয়ে ৩০ শতাংশ গাছে আম ছিল। এছাড়া বাজারে ধান, গম, সরিষা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষি ফসলের চাহিদা এবং দাম উভয়ই বর্তমানে আকাশচুম্বী। এসব কারণে গত বছর থেকে সংশ্লিষ্ট বাগান মালিকদের মধ্যে আমগাছগুলো অপসারণ ও কৃষি আবাদ জোরদারের আলোচনা হচ্ছিল। অনেকেই তাদের জমির আমগাছ কেটেও ফেলেছেন। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া একযোগে বিপুলসংখ্যক গাছকাটার বিষয়ে আইনগত ঝামেলার কথাও ভাবা হচ্ছিল। এসব নানা অজুহাতে অনেকেই তাদের বাগান অপসারণ করতে বিলম্ব করছিলেন। এই সুযোগে সংঘবদ্ধ গ্রুপ রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে থাকতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, বাঘা উপজেলার হাবাসপুর একটি আমবাগান সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই গ্রামের অধিকাংশ জমিতে বর্তমানে আমগাছ আছে। মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায়ও রয়েছে আমগাছ। যে গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেগুলো অপেক্ষাকৃত নিচু ও ফসলি জমিতে লাগানো হয়েছিল। আগে ঐ জমিতে শুধু ধান চাষ হতো। বর্তমানে সেখানে বছরে তিনটি ফসল উত্পাদন করা যাচ্ছে। যা আম বিক্রয়লব্ধ অর্থের চেয়ে বেশি লাভজনক বলে অনেকেই স্বীকার করেছেন।
উল্লেখ্য, ১১ ডিসেম্বর রাতে হাবাসপুর গ্রামের ঐ নিচু এলাকার প্রায় ৪০০ আমগাছ কে বা কারা করাত দিয়ে কেটে ফেলে। এ ঘটনায় গাছের মালিকরা শোকে কাতরতা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় কৃষক সাধন কুমার প্রামাণিক ১২ ডিসেম্বর সকালে বাঘা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তবে এজাহারে তিনি কারো নামোল্লেখ করেননি।

