প্রকাশ পেয়েছে যুক্তরাজ্যের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানককের বহুল আলোচিত-সমালোচিত বই ‘প্যান্ডেমিক ডায়ারিস : দ্য ইনসাইড স্টোরি অব ব্রিটেনস ব্যাটল এগেইনস্ট কোভিড’। বইয়ে তিনি কী কী লিখতে পারেন, তা নিয়ে অনুমান করাটা কঠিন কিছু নয়। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে বাজারে এসেছে বইটি। পত্রিকার পাতা জুড়ে ধারাবাহিকভাবে বইটির বিষয়ে প্রকাশ পেতে থাকে বিস্ফোরক ও দাঁত কটমট করা সব তথ্য। বিশেষ করে, এনএইচএস প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ডাক্তারদের নিয়ে বইটিতে যা বলা হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনার বন্যা বয়ে যায়। যেসব কথাবার্তা বলা হয়েছে এনএইচএসকে নিয়ে, তাতে আমি নিজেও বিব্রত। এনএইচএসের চিকিৎসক হিসেবে আমার বক্তব্যকে পক্ষপাতমূলক মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার আলোয় দেখলে বিষয়গুলো পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। মহামারির সময়কালে আমার মতো যেসব স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড ওয়ার্ডে দিনরাত সেবা-শুশ্রূষা দিয়েছেন, আক্রান্ত রোগীদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রেখেছেন, তাদের পক্ষে হ্যানককের ৫৯২ পৃষ্ঠার বিশাল বইয়ের বক্তব্য হজম করা একটু কঠিনই।
টেলিভিশনে প্রচারিত রিয়েলিটি শোতে হ্যানককের সংবেদনশীলতার অভাব স্পষ্টত দৃশ্যমান। তাকে যে ভঙ্গিমায় দেখা গেছে তাতে এটা প্রমাণিত, স্বাস্থ্যসচিবের পদ থেকে বহিষ্কার হয়ে মাথা নিচু করে বিদায় নেওয়ার ঘটনাকে ঢাকতে ব্যর্থ চেষ্টা করছেন তিনি। তিনি যেভাবে বক্তব্য উপস্থপান করেছেন, তাতে কৃত্রিমতার এক অদ্ভুত গন্ধ আছে। বাক্পটুতার সজ্জিত শৈল্পিকতায় নিজের কপটতা ঢাকতে তাকে নিজের মতো করে বলে যেতে দেখা যায়—যা অবাক করেছে সবাইকে। হ্যানকককে সেলিব্রেটি বললেও কম বলা হবে।
বই লেখার কারণ হিসেবে হ্যানকক উল্লেখ করেছেন, ‘আগামী দিনে যারা হট সিটে বসবে তাদের সাহায্য করার জন্যই আমি এই বইটি লিখেছি।’ বই লেখার কাজকে তিনি সুনির্ধারিত লক্ষ্যের অংশ, সৎ কাজ, সময়োপযোগী বিষয় তুলে ধরা ইত্যাদি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বইটি মূলত একটি ডায়ারি হিসেবে লেখা হয়েছে। দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টার ফসল এই বইটি।’ লক্ষণীয় বিষয়, বইটি লিখতে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখককেও সহলেখক হিসেবে যুক্ত করেছেন, যাতে নিজের যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখানো সহজ হয়!
হ্যানকক তার বইয়ে সতর্কতার সঙ্গে সমসাময়িক বিষয়ের বহু কথা তুলে ধরেছেন। তিনি আসলে সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে লিখতে চেষ্টা করেছেন, যা দেখে তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার বোঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ, চীনে প্রথম বারের মতো একটি রহস্যময় নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে হ্যানকক খবরটি সম্পর্কে অবগত হন এবং একে ব্রিটেনের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন—লিখেছেন হ্যানকক। বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি সহকর্মীদের নিয়ে মিটিংয়ে বসে করণীয় নির্ধারণে কাজ শুরু করেন বলেও তার দাবি। এর সপ্তাহ তিনেক পর তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাসকে ফোন করে এই প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার আহ্বান জানান বলেও বইয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি। এসব নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হ্যানকককে বেশ প্রশংসা করেন বলেও লিখেছেন হ্যানকক। সবকিছু ঠিক আছে, তবে নিজেকে বড় করে দেখাতে গিয়ে কোভিড যোদ্ধাদের খাটো করে দেখিয়েছেন তিনি—যা আশা করা যায় না আদৌ।
হ্যানকক তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, কোভিড মহামারিকালে যেন তাকে একাই লড়াই চালাতে হয়েছে! এ সংক্রান্ত বহু কথা খোলাখুলিভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। কোভিড যুদ্ধে প্রতিনিয়ত তাকে দৃঢ়-প্রত্যয়ী সেনার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে, বইয়ে এসবের বিবরণ তুলে ধরেছেন তিনি—প্রকাশের ভাবটা এমন, তিনি একাই ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা! মূলত নিজের অপরিহার্য বীরত্বের পরিচয় তুলে ধরতে চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি একে সাহসী উচ্চরাণের অনন্য নজির হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কোভিড মহামারির দিনগুলোতে ক্লান্তিকর সময় পার করতে হয়েছে হ্যানকককে, উল্লেখ করেছেন হ্যানকক। গোলটেবিল বৈঠক, ইমেইলে যোগাযোগ রক্ষা, ফোনে কথা বলা—মহামারিকালে এগুলো তার প্রতিদিনকার রুটিন ছিল বলে লিখেছেন তিনি। তার নিত্যদিনের কার্যতালিকায় ওপরের দিকে থাকত অনলাইন-অফলাইনে সাক্ষাৎকার—যাকে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে অবিহিত করছেন। মোটকথা, তিনি নিজেকে সম্মুখসারির কোভিড যোদ্ধার থেকেও বেশি কিছু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অবশ্য এসবের জন্য কোনো ধরনের প্রশংসার ধার ধারেন না বলেও বলেছেন তিনি—যা তিনি তার বইয়ে বড় বড় হরফে উল্লেখ করেছেন। হ্যানকক লিখেছেন, ‘আমি সহানুভূতি পাওয়ার আশায় কিছু করিনি, কিছু বলিও নি। এসবের কোনোটিরই যোগ্য নই আমি। নিষ্ঠার সঙ্গে স্বাস্থ্য সচিবের ভূমিকা পালনই ছিল আমার ব্রত।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘মহামারির সময় পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ মহামারিকে মোকাবিলা করা যুদ্ধের থেকে কম কিছু নয়। আর এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করা সবাই এক একজন সৈনিকের মতো।’ এই কথাগুলোর শেষ লাইনে হ্যানকক লিখেছেন, ‘তেমন কিছুই করিনি আমি; যতটুকু করার সুযোগ পেয়েছি, তা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।’
হ্যানককের মুখ থেকে এ জাতীয় ন্যাকামিপনা শোনার পর তার বই ছুড়ে মারি আমি। তার এ ধরনের কথা আমাকে এমনকি আমার মতো চিকিৎসকদের ব্যথিত করবে বলেই আমার মনে হয়। এর পেছনে অকাট্য যুক্তিও আছে। এনএইচএস ট্রাস্টে আমার একজন অত্যন্ত প্রিয় নার্সসহ আরো দুই জন স্বাস্থ্যকর্মী কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এমনকি আমরা বহু কর্মী সম্মুখসারির কোভিডযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছি কোভিডের দিনগুলোতে। এতে আমাদের জীবনের ঝুঁকি ছিল যদিও, কিন্তু এতে পিছপা হইনি আমরা। কখনো কখনো এমনও হয়েছে, পিপিইর অভাবে জরি কাগজকে পিপিই হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যারা এখনো কাজ করছি এবং যারা কোভিডে মারা গেছেন, কোভিডের সময়কার তাদের করুণ চিত্রগুলো নিয়ে কি কিছুই লেখা হবে না?
বলা বাহুল্য, প্রায়শই অন্যকে হেনস্তা করে কথা বলার সময় বেশ বাগাড়ম্বর করেন হ্যানকক। স্বগৌরবে ফেটে পড়েন। বিশেষ করে, যুক্তরাজ্যের কোভিড মোকাবিলার বিষয়গুলো নিয়ে যা-তা মন্তব্য করেন তিনি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি এমন সব ঘৃণ্য দাবি করেন, যা মেনে নেওয়া কষ্টকর। এনএইচএসের কর্মীরা প্রতিটি টিকা দেওয়া বাবাদ সাড়ে ১২ ইউরো পকেটে ঢোকানোর জন্য ভ্যাকসিন কেন্দ্রগুলো থেকে জনসাধারণকে ব্যক্তিগত পরিষেবা কেন্দ্রে নিতে প্ররোচিত করে—হ্যানকক এ ধরনের কথা কীসের ভিত্তিতে বলেছেন, তা কেবল তিনিই বলতে পারবেন। এনএইচএস সিইও সাইমন স্টিভেনসকেও দোষারোপের বৃথা চেষ্টা চালান তিনি। পুরোপুরি সেরে ওঠার আগেই কোভিড রোগীকে স্থানান্তর করা হচ্ছে—তিনি এমন অভিযোগ আনেন এনএইচএস সিইও সাইমন স্টিভেনসের বিরুদ্ধে। এমনকি এহেন দোষারোপের পর স্টিভেনসকে পাকাপাকিভাবে দোষী সাব্যস্ত করতে গঠিত তদন্তকে প্রভাবিত করেন তিনি। তদন্তের সময়কে মার্চ থেকে টেনে নিয়ে যান এপ্রিল পর্যন্ত, যাতে এই লম্বা সময় ধরে খুঁজে খুঁজে স্টিভেনসের বিরুদ্ধে প্রমাণ দাঁড় করানো যায়! কী অদ্ভুত কথা!
ভয়ংকর কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াই করার মাসখানেক পর ২০২০ সালের ১৮ এপ্রিল লন্ডনের নর্থউইক পার্ক হাসপাতালে বিছানা, ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয়। আশ্চর্যজনভাবে এ সময় হ্যানকক উদ্ভট সব দাবি করে বসেন। এমনকি কেয়ার হোমে ভয়ানকভাবে কোভিড রোগীর মৃত্যুর জন্য কেয়ার কর্মীদের ওপর দোষ চাপিয়ে বসেন তিনি। তার এসব প্রচেষ্টা ছিল চরম ঘৃণ্য বিষয়।
যাহোক, এত কিছুর পরও ঘাড়ত্যাড়া হ্যানকক বইটি শেষ করেছেন কিছু নরম কথা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে আমার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে আমি মানুষের মহান, উদার, দয়ালু চেতনায় বিশ্বাসী।’ তার এই কথা প্রসঙ্গে বলতে হয়—আপনি কি সত্যিই এটা মনে করেন, ম্যাট? রিয়েলিটি টিভিতে আপনি যা বলেছেন তা ক্ষমার অযোগ্য। অথচ আপনি ক্ষমাভিক্ষা করে তিন সপ্তাহ সময় অতিবাহিত করেছেন। উপরন্তু, মহামারি মোকাবিলায় যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করে কাজ করেছেন, মানুষকে সেবা দিয়েছেন, তাদেরও সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ছাড়েননি আপনি। কাজ করতে গেলে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি তো থাকবেই; তাই বলে নিজের ব্যর্থতা সম্মুখসারীর যোদ্ধাদের গায়ে চাপাবেন আপনি? এটা কী ঠিক? বাস্তবিক অর্থেই, হ্যানককের বই পড়ে আমি ভয় পাচ্ছি এই ভেবে যে, বইটি জিনা কোলাডেঞ্জেলোর সঙ্গে হ্যানককের সিসিটিভি ফুটেজকে আড়াল করে দেয় কি না! সত্যি বলতে, এই বিষয়কে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলার উদ্দেশ্যে বইটি লেখা হয়ে থাকলেও অবাক হব না একটুও। কোভিড মহামারি চলাকালে সহকর্মীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে যে অন্যায় হ্যানকক করেছিলেন, সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা কী এতটাই সহজ?
এসব আলোচনার পর একটি কথা কিন্তু স্মরণে রাখতে হবে যে, কোভিড এখনো পৃথিবী ছেড়ে যায়নি। সুতরাং আত্মতুষ্টির সময় এখনো আসেনি।
লেখক : প্যালিয়েটিভ কেয়ার চিকিৎসক ও ব্রিদটেকিং :ইনসাইড দ্য এনএইচএস ইন অ্যা টাইম অব প্যান্ডেমিকের লেখক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন
