বাংলায় একটি বহুল প্রচারিত শব্দ অনুপ্রবেশকারী। বিবাহের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত না হইয়াও ভিড়ের মধ্যে সকলের অলক্ষ্যে একপেট পোলাও-মাংসে উদর পূর্তি করিয়া যাওয়া ব্যক্তি যেমন অনুপ্রবেশকারী, আবার ঘরে সকলের অজান্তে চৌর্যবৃত্তির জন্য ঢুকিয়া পড়া ব্যক্তিও অনুপ্রবেশকারী। আবার গুপ্তচরবৃত্তিতেও অনুপ্রবেশ টার্মটি ব্যবহূত হইতে দেখা যায়। গুপ্তচরদিগকেও অনুপ্রবেশকারী বলা হইয়া থাকে; কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশের যে ব্যাপক ব্যবহার তাহা ভিন্ন বিষয়কে নির্দেশ করে।
অনুপ্রবেশকারী বলিতে এখন আমরা বুঝি রাজনৈতিক দলে মাথা গুঁজিয়া ঢুকিয়া পড়া। ইহা এক ভয়ানক রাজনৈতিক চিত্র তৈরি করিতেছে। এক পেট খাইয়া চলিয়া যাওয়া, অথবা ঘরে ঢুকিয়া কিছু চুরি করিয়া লইয়া যাওয়া অনুপ্রবেশকারী যে সমস্যা তৈরি করে, তাহা সাময়িক; কিন্তু রাজনীতিতে অনুপ্রবেশকারী শুধু সরকার, প্রশাসন কিংবা দল নহে, গোটা জাতির পতাকাই অদৃশ্যে খামচাইয়া ধরে। বর্তমান বাংলাদেশে এই অনুপ্রবেশ একটি মহামারিতে পরিণত হইয়াছে। অনুপ্রবেশকারী প্রায় সকল দলেই রহিয়াছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই উহারা আস্তানা গাড়িয়াছে। কিন্তু যেইহেতু আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনায় রহিয়াছে, তাই এই দলে অনুপ্রবেশের মাত্রা সর্বাধিক। এই অনুপ্রবেশকারীরা স্থানীয় পর্যায়ে, ক্ষেত্রবিশেষ কেন্দ্রের কোনো কোনো স্থলে আওয়ামী লীগার হিসাবে নিজেদের পরিচিত করাইতে সক্ষম হইয়া উঠিতেছে; কিন্তু আদতে কি তাই? তাহারা কি সত্যিই আওয়ামী লীগের কেউ? দেশের সচেতন মানুষের ইহা গ্রহণ করিতে কষ্ট হয়। ইহাদের জাতি চিনে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিকটও ইহারা অপরিচিত নহে। অথচ কোনো এক রহস্যজনক কারণে এই সকল অনুপ্রবেশকারীকে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ বন্ধ করিতে পারিতেছে না। ইহারা দিনে দিনে তাহাদের জাল প্রসারিত করিয়া চলিয়াছে। তাহারা দিনে দিনে ক্ষমতাসীন দলের পদ-পদবি দখল করিয়া লইতেছে। কাহারো ব্যক্তিগত সান্নিধ্য এমনকি উেকাচ ব্যবহারের মাধ্যমেও এই প্রবেশ বলিয়া জনমনে ধারণা রহিয়াছে। ফলে সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মী, দলের প্রতি সহানুভূতিশীলরা একটা অস্থির অবস্থা ঠাহর করিতেছেন। দার্শনিক প্লেটো বলিয়াছিলেন, সেই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কষ্টদায়ক, যেই রাজনীতি নিম্নবর্গের মানুষের হাতে চলিয়া যায়। অবস্থাদৃষ্টে এই অনুভূতি বাংলাদেশের সচেতন মহলে সৃষ্টি হওয়া দোষের কিছু নহে। তাহাদের এই অর্থে নিম্নবর্গের বলা যায় যে, এই দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাহাদের ভূমিকা ছিল অসুস্থ চিন্তাপ্রসূত, স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ। অথচ স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগে তাহাদের অবাধ প্রবেশ দেখিয়া কষ্ট হইবারই কথা। এমনো তো আমরা দেখিতে পাই যে, আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গের কেহ অনুপ্রবেশকারী সম্পর্কে মঞ্চে দাঁড়াইয়া জাতিকে সচেতন করিতেছেন, অথচ তাহার পাশেই অনুপ্রবেশকারী দাঁড়াইয়া হাতে তালি দিয়া চলিয়াছেন!
কীভাবে তাহারা প্রবেশ করিতেছে, কীভাবে তাহারা পদ-পদবি পাইতেছে, তাহা দলেরই জানিবার কথা সবচাইতে অধিক; কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদর এবং তাহাদের পরবর্তী প্রজন্মের এহেন ‘ক্ষমতায়ন’-এর ফলে দলের রাজনীতি যে কলুষিত হইতেছে, দেশের আদর্শিক রাজনীতি যে ভেজালযুক্ত হইয়া পড়িতেছে তাহার দায় এবং পরিণাম ক্ষমতাসীন দলকেই সর্বাধিক ভোগ করিতে হইবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। মনে রাখা অতীব জরুরি যে, অসময়ে দেশের প্রতি অথবা দলের প্রতি ইহাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকিবে না অথবা ইহারা দায় বোধ করিবেও না। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইহাদের কারণেই দলকে নানা ধরনের দুর্নাম কাঁধে তুলিয়া লইতে হইতেছে। সুতরাং জেলা-উপজেলা হইতে শুরু করিয়া ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়েও ক্ষমতাসীন দলটির পরিচর্যা করা আশু প্রয়োজন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। শৃঙ্খলা ফিরাইতে হইবে, শুদ্ধাচার ফিরাইতে হইবে। আমরা আবারও স্মরণ করাইয়া দিতে চাই, দল কেহ পরিবর্তন করিতে পারিবে না, বাংলাদেশে এমন কোনো বিধিবিধান নাই; কিন্তু বাস্তবতা হইল, ফ্যাংকেনস্টাইন হইয়া উঠা ফিরাইতে হইবেই দলের বৃহত্তর স্বার্থে। ফরাসি বিপ্লব বহু কারণেই বিশ্বের কাছে উদাহরণ হইয়া আছে। অনুপ্রবেশ করিয়া, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাইয়া সকল কিছু তছনছ করিয়া ফেলিবার ইতিহাস বিপ্লব-পরবর্তী ফ্রান্সে আমরা দেখিতে পাই। উহাও শিক্ষণীয় বলিয়া স্মরণে রাখিতে হইবে।
